রিনুর মা হয়ে ওঠা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

তখন রিনু সদ্য ‘মা’ হয়েছে… সবটুকু সময়  আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকে সে ছানার সঙ্গে! সবাই বেশ অবাক হয় দেখে যে রিনু আর কারুর সাহায্য ছাড়াই তার পুত্রকে দিব্যি ম্যানেজ করতে পারে! ম্যানেজ করাই তো! তার স্নান-খাওয়া-পটি-সু সু- ঘুম পাড়ানো-ঢেঁকুর তোলানো-হঠাৎ কেঁদে উঠলে বুকে জড়িয়ে নেওয়া- নিজের মনখারাপেও তাকে জোরসে জাপটে থাকা! সবটাই রিনু দিব্যি পারে! যখন সে হল, তখন তো ঠিক এইটুকুনি! রোগা-সরু সরু হাত-পা আর পুঁচকে একটা মাথা; সেই মাথা ভর্তি অঢেল কুচকুচে কালো চুল! জন্মের সময় তো এত চুল ছিল যে ভদ্রলোকের চোখ অবধি ঢাকা পড়ে যাওয়ার জোগার! তবে চোখদুটো যে কথা বলবে ভবিষ্যতে, তা সেই তখন থেকেই টের পাওয়া গিয়েছিলো! অপারেশন থিয়েটারে রিনুকে নিয়ে গেছে সকাল আটটায়; প্রায় এগারোটা বাজে, অথচ কোন খবর নেই! রিনুর বাবা মায়ের মুখ শুকনো! হবু বাবা অস্থির পায়চারি করে পা ব্যথা করে ফেলেছে! বাকি যারা যারা এসেছিল হাসপাতালে, সবারই ভয় পাওয়া মুখ! ঠিক তখন এক সিস্টার ‘অমুকের বাড়ির কারা আছেন’ বলে যাকে দেখালো-তিনিই ‘শ্রীমান পাবলো’! বাড়ি ফিরে মা দুঃখ করে রিনুর বাবাকে বলেছিল ‘এমন পচা দেখতে হল কি করে রিনুর ছেলে!!!’ হুম্, মায়ের তাই মনে হয়েছিল! শুধু চুল আর লোম! গায়ের রঙ রীতিমত লাল- (তার মানে কালোই হবে! যেন তাদের মেয়ের গায়ের রঙ দুধে আলতা!!!) বাবা বেশ জোর বকুনি দিয়েছিল! বেশ ক’বছর পরে গল্পটা রিনু শুনেছে! এখন রিনুর মায়ের ‘মহারাজ’ একথা ব’লে তার ‘দিয়া’কে ক্ষেপায়! মাসখানেক সত্যিই ওই রকমই ছিলেন তিনি! রিনু বলে “মানুষ কম, ‘কেমন যেন পোকা পোকা”… তারপরই তিনি বদলে গেলেন! একটু একটু করে স্পষ্ট হল তাঁর চোখ নাক মুখ.. বেশ গোল্লা মতন এক মিষ্টি ছানা হয়ে গেলেন তিনি! মা বেশ ভয় পেয়েছিল, কি করে নাতিবাবুকে বড় করবে! বলেছিল ‘কতবছর আগে বাচ্চা বড় করেছি! এখন কি আর পারবো!!’ রিনু কিন্তু ভয় পেলোনা, বরং হাসপাতালে-নার্সারির মেট্রনের কাছে গিয়ে-দাঁড়িয়ে থেকে শিখে নিলো কি করে ওইটুকু পুতুলকে একটুও ব্যথা না দিয়ে ধরতে হয়; প্রতিবার খাওয়ার পর ঢেঁকুর তোলানো, তাকে গরম জল দিয়ে গা মোছানো (তখনও তো তিনি স্নান করেন না), নখ কাটা, কান পরিস্কার-নাক পরিস্কার, জামা পরানো এমন আরো কত কি!!! তারপর পাঁচদিনের দিন বাড়ি ফিরে থেকে শুরু হল রিনুর ‘প্র্যাকটিকাল ক্লাস’! পুত্রের এসবকিছু করা ছাড়াও তার কাঁথা কাপড় কাচা, বোতল ফোটানো-সবটুকুই রিনু করতে লাগলো নিজেই! কেউ তাকে বাধ্য করেনি, সে নিজেই চাইলো যতটা বেশি ছেলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা যায়, তা করতে… রিনুর শুধু ভয় করতো এটা ভেবে যে ঘুমের মধ্যে যদি ছেলেকে সে চাপা দিয়ে ফেলে! ওইটুকু তো মানুষ! টেরও পাওয়া যায়না এমনই তার অস্তিত্ব! কি আশ্চর্য্যভাবে এমন কোনদিন ঘটলোনা (ভাগ্যিস)! ছানাকে পাশে নিয়ে, বলা ভালো প্রায় বুকের মধ্যে নিয়ে রিনু প্রতি রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে লাগলো… হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসার দিন তিনেক পরে মাঝরাতে একদিন জোর বৃষ্টি! বিদ্যুত চমকাচ্ছে, মেঘ ডাকছে! রিনু ছেলেকে বুকে নিয়ে বসে! তিনি কাঁদেন না বললেই চলে! তবে বৃষ্টিতে থেকে থেকেই কাঁথা ভেজাচ্ছেন! ঠান্ডা জল লাগলে একটু উঁ উঁ করেই আবার চুপ! পরদিন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে রিনু শুরু করলো তাকে ডায়পার পরানো! ডায়পার পরে এরপর থেকে বাবু ঠিক রাত সাড়ে ন’টায় নিদ্রা যান; তাঁর ঘুম ভাঙে সকাল হলে! মাঝখানে ঘুমের মধ্যেই খেয়ে নেন অল্প! তখন রিনু থাকে মা-বাবার বাড়িতে; ঘুমোয় রিনুরই ঘরে; মা থাকে মায়ের ঘরে; ভাই – ভাইয়ের; একা ঘরে বাচ্চা নিয়ে কি করে থাকবে রাতে- বলেছিল সবাই, রিনুই জোর দিয়ে বলেছিল সে পারবে… মা-ভাই দুজনেই একটু পর পর উঁকি দেয় রিনুর ঘরে এসে! বাবা তখন নন্দীগ্রাম ব্রাঞ্চে পোস্টেড; সপ্তাহান্তে বাড়ি আসেন আর ঠায় বসে থাকেন তাঁর বাড়ির নতুন অতিথির পাশে! মা অফিস থেকে এক মাসের ছুটিতে; মহারাজ এসেছে যে! মেয়ের তখন ঠিকসময়ে খাওয়া বিশ্রাম দরকার; তিনি সব দেখভাল করেন! মেয়ে ব্যস্ত তার নতুন খেলনা নিয়ে; সোনা বাচ্চা তার; কোন কান্নাকাটি নেই; শুধু খাওয়া আর ঘুম.. মাকে চিনতে পারে বলেই মনে হয়.. কেমন পিট্ পিট্ করে তাকায়!! অনেকে দেখতে আসে রিনুর ছেলেকে; শ্বশুরবাড়ির লোকজন-বাপেরবাড়ির লোকজন-পাড়ার-কাজের জগতের-অনেকে.. রিনু খুব পিট পিটে মা! বাচ্চার বিছানায় বাইরের জামা কাপড় পরে কাউকে বসতে দেয়না! বসতে হয় ঘরে রাখা সোফায়; বেশি লোকজন এলে, চেয়ার এনে দেওয়া হয় বসার জন্য! ডাক্তার বলে দিয়েছেন-প্রথম ছ’মাস বাইরের ধুলো ময়লা-জার্ম থেকে বাচ্চা দূরে রাখতে! বাইরে থেকে এলে বাচ্চাকে কোলে নেবার আগে কি কি করতে হবে, সেসবও তিনি বলে দিয়েছেন! রিনু অক্ষরে অক্ষরে তা মেনে চলে! প্রায় সবাই এজন্য রিনুকে পাঁচ কথা বলেন! রিনু অনড়! ছেলের ব্যাপারে সে কোন কম্প্রোমাইজ করতে নারাজ! কাচা পোশাক রাখা থাকে; যাঁরা আসেন, হাত পা সাবান দিয়ে ধুয়ে সেই কাচা জামা পরে কোলে নেন ‘মহারাজ’কে! রিনুর মা বাবা কিন্তু একদিনের জন্যও মেয়ের এহেন আচরণে রাগ বা বিরক্তি প্রকাশ করেননি। পরে অন্যদের বলেছেন রিনু এটা করেছিল বলে পাবলোর কোনরকম কোন অসুখ তখন হয়নি! সত্যিই তাই! ভ্যাক্সিন দিয়ে আনলে সামান্য জ্বর বাদে, রিনুর ছেলের প্রথম শরীর খারাপ হল মুখেভাতের পর! রিনুর তখন সিঁড়ি ভাঙা বারণ তাই ঘর লাগোয়া ‘ওপেন টেরাসে’ সাময়িক দড়ি লাগিয়ে কুট্টি কুট্টি কাচা জামাকাপড় তাতে শুকোতে দেওয়া হয়.. সেসব জামায়, রিনুর ঘরে, সারাবাড়িতে তখন বাচ্চা বাচ্চা গন্ধ! একটু একটু করে তিনি বড় হন! হাসতে শেখেন, হাত পা ছুঁড়তে শেখেন, কথা বললে তাঁর ভাষায় উত্তর দিতে শেখেন… ঘুমের মধ্যে উল্টিয়ে কিভাবে যেন তিনি চলে আসেন তাঁর মায়ের বুকের উপর… অসীম নির্ভরতায় ঘুমিয়ে থাকেন মাকে আঁকড়ে.. মা সকালে উঠে টয়লেট গেলেও তিনি টের পান; তাঁরও তৎক্ষণাৎ ঘুম ভেঙে যায়, অসম্ভব সুন্দর দু চোখ মেলে মাকে খোঁজেন তিনি… বছর বারো আগের এসব দিনগুলো রিনু কেমন অনায়াসে মনে করতে পারে..সে সব স-ব,এখনও নতুন, আনকোরা! কখন সে উপুড় হতে শিখলো, কবে প্রথম বসতে পারলো, দাঁত উঠলো কবে, কোন শব্দ বললো এক্কেবারে প্রথম…… ছেলের সঙ্গেই রিনুও এসব শিখলো নতুন করে… গত বারো বছর রিনু রোজ নতুন করে বাঁচতে শিখছে; রিনু বিশ্বাস করে ‘মা’ হতে শিখতে হয়… শুধুমাত্র জন্ম দিলেই মা হওয়া হয়না, প্রতিদিন ‘প্র্যাকটিকাল’ ক্লাস করতে করতে মা হতে হয়…. এতদিন রিনু শুনেছে ‘মা হওয়া মুখের কথা না’, এখন রিনু তা বিশ্বাসও করে … তাই ‘মা’ হয়ে ওঠার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে রিনু- চেষ্টা করে একজন ভালো মা হবার…

ছবি: রিনি

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com