রিনুর ভয় নেই.. কিসের ভয়?

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

খবরটা সত্যি; মানে সত্যি সত্যিই এমনটা হতে চলেছে, এটা জানার পর থেকেই শুরু বুক ঢিপঢিপ! লাল রঙের একটা পিংপং বল রিপোর্ট জানার পর থেকেই বুকের মধ্যে অনবরত লাফিয়ে চলেছে! রিনুকেই তো কেউ এখনও বড় বলে তেমন পাত্তা দেয়না! তার আবার হবে ‘ছানা’, এহেন খবরে ওইটুকু উত্তেজনা তো স্বাভাবিক!!! কিভাবে মা-বাবাকে বলবে, তা নিয়ে বিস্তর জল্পনার পরে-আকাশবানীর অনুষ্ঠান সেরে বেরিয়ে রিনু মাকে ফোন করলো ‘তোমাদের প্রোমোশন হতে চলেছে মা’… তিনি অফিসে! ‘প্রোমোশন?’ কিসের কেন কোথায় প্রোমোশন!! কথাটার মাথামুন্ডু কিস্যু না বুঝে তিনি যারপরনাই অবাক! ‘হ্যাঁ মা, সামনের বছর এইসময়ে তুমি তো দিম্মা হয়ে যাবে!’ এবার রিনুর মায়ের গলাতেও উত্তেজনা! ‘তাই??? বাহ্… দারুণ খবর.. ডাক্তারের কাছে কবে যাবি বল’… কোন ডাক্তারের কাছে যাওয়া হবে-এ নিয়ে রিনুর মনে কোন সংশয় ছিলনা.. কাজের সুবাদে অনেক ডাক্তারবাবুদের সঙ্গেও তখন তার পরিচয়; তবে এক্ষেত্রে যে ইলোরাদির কাছেই রিনু যাবে তা সে বহুদিন ধরেই ঠিক করে রেখেছে… ইলোরাদি মানে ইলোরাশ্রী চক্রবর্তী-স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ; ইন্টারভিউ নিতে গিয়েই আলাপ; কি খোলামেলা-মিষ্টিমত একজন মানুষ.. কি সুন্দর করে হেসে সব প্রশ্নের উত্তর দেন; বিন্দুমাত্র বিরক্ত হননা কখনও! অতএব ইলোরাদি! কোথায় দেখেন ইলোরাদি?! এবার সুমাদি ভরসা… প্রোগ্রাম কো অর্ডিনেটর-রিসার্চর সুমা বন্দ্যোপাধ্যায় সেকেন্ডের মধ্যে সব বাতলে দিল.. মা মেয়ে এবার সটান ইলোরাদির চেম্বারে… খবরটা শুনে জিগ্যেস করলেন ‘চাও তো?’ মা মেয়ে মুখ চাওয়াচায়ি করছে দেখে বললেন ‘এই জগতের অনেকে তো এত কম বয়সে মা হতে চায়না, তাই জানতে চাইলাম…’ কি কি করণীয় তার রীতিমত লম্বা ‘লিস্ট’ তৈরি হল! রিনুর চিরকাল খাবার ব্যাপারে অনীহা; কড়া গলায় বললেন ‘সুস্থ বাচ্চা চাস তো?’ রিনুর ঢক করে মাথা হেলানো দেখে বললেন ‘যা বলবো সব শুনতে হবে’… ব্যস, সারাজীবনের মত খাওয়া নিয়ে বায়না করা-রিনুর বন্ধ হয়ে গেল… ন’টা মাস গর্ভস্থ সন্তানের কথা ভেবে, তারপরও তারই কথা ভেবে কখন যেন রিনু খাওয়া নিয়ে কিচিরমিচির ভুলেই গেল! এখনো ‘সে’ই প্রথম-কি খাবে-কি ভালোবাসে, কোনটা ‘তার’ পুষ্টির জন্য দরকার ইত্যাদি ইত্যাদি ভাবনাই চলছে, চলবে… দুধ নামক বস্তুটি রিনু দুচোক্ষে দেখতে পারেনা! মা তাকে জোর করে এম এ ক্লাস অবধি দুধ খাইয়েছে-ভাই ছাড় পেয়েছে ক্লাস সেভেনেই! দুধ খেতে হবে শুনলেই রিনু পোঁ পাঁ দৌড় মারে! ইলোরাদি দিনে হাফ লিটার দুধ বরাদ্দ করে দিলেন! নাক সিঁটকোচ্ছে দেখে বললেন ‘ফ্রিজে রেখে দিস; সেটা খাস.. খারাপ লাগবেনা!’ অগত্যা! নাক চোখ টিপে কোনরকমে ন’টা মাস দুধও খেল রিনু! ‘কোন সব্জি ভালোবাসে? যে সময়ের যা, সেসব সব্জি দেবেন মেয়েকে; তরকারি হোক, ভাজা হোক, সেদ্ধ হোক’… রিনুকে মনে করিয়ে দিলেন সুস্থ সন্তান প্রসব করতে হলে মায়ের ওজন গর্ভাবস্থার শেষে ১০-১২ কেজি বাড়া উচিত.. ওটিতে যাবার আগে রিনুর ১৩ কেজি ওজন বেড়েছিল… এই মানুষটিকে রিনু ঈশ্বর বলে মানে… ইলোরাদি যদি বিষ এনেও বলেন ‘খেয়ে নে, ভালো হবে’, রিনু বোধহয় এখনও তা করতে দু’বার ভাববেনা! মাসে একবার করে যেতে হয় ইলোরাদির কাছে, চেক আপ করাতে.. প্রতিবারই দিদি নর্মাল ডেলিভারির উপকারিতার কথা বলেন.. রিনু মাথা নাড়ে, তারপরেই বলে ‘কিন্তু তুমি আমার সিজারই কোরো!’ প্রতিবারই বকুনি জোটে একথার পর! তবু এর অন্যথা হয়না!

ইলোরাদি রিনুর নর্মাল ডেলিভারিই করাবেন, রিনুও ভয়ে এইটুকু হয়ে সিজারিয়ানের জন্য লড়ে যাবে! প্রথম ইউ এস জি। ইলোরাদি আছেন। বাইরে মা; জানতে চাইলেন ‘কি রে কি চাস?’ একগাল হাসিমুখে রিনুর উত্তর ‘রাজকন্যা’… ‘আর তোর শাশুড়ি মা?’ ‘নাতি হলেই বোধহয় বেশি খুশি হন!’ ‘এবার নাহয় শাশুড়ি মাকেই খুশি করে দে , তোর জন্য পরেরবার’ ব্যাজার মুখে ইউ এস জি করিয়ে মেয়েকে বেরোতে দেখেই মায়ের প্রশ্ন ‘ছেলে হবে বললো, না রে রিনু?!’ হবু বাবা রীতিমত কাউন্সেলিং করলেন কিছুদিন, হবু মায়ের মন ঠিক করতে! ‘ছেলে হোক বা মেয়ে, কি এসে যায়.. আমরা তো সুস্থ সন্তান চাই, তাইনা’… তা তো ঠিকই.. মেনে নিলো রিনুও… হবু মা-বাবা আর দিদিমা ছাড়া কাকপক্ষীতেও এখবর টের পেলনা! এদিকে রিনু তো নাম বাছতে বসলো! পাবলো যে তার ডাকনাম হবেই, এটা নিয়ে মতবিরোধ নেই! ভালো নাম? বহু ভাবনাচিন্তার পরে হবু মা-বাবা নাম ঠিক করলেন ঋক রৌণক… এ কথাও অবশ্য তখন আর কেউই জানলোনা.. দিন গড়ায়, রিনুর লো প্রেশার.. বাইরের কাজ বন্ধ করে সে বাড়িতেই থাকে.. বই পড়ে, গান শোনে, রান্না করে…

সেটা রিনুর শেষ চেক আপ; যথারীতি ইলোরাদি নর্মাল ডেলিভারিই করবেন বলছেন আর রিনু কাঁচুমাচু মুখে বসে! ইন্টারনাল পরীক্ষা করে অবশ্য দিদিকেই নিরস্ত হতে হল… বললেন ‘এমার্জেন্সি হতে পারে; মনে হচ্ছে ওর কথাই মেনে নিতে হবে শেষমেশ!’ পাঁজি দেখে দিন ঠিক করতে বললেন.. ১১ই এপ্রিল ছিল সম্ভাব্য দিন, তার সাতদিন আগে দিন পছন্দ করা হল, তবে পাঁজি দেখে নয়-তারিখ দেখেই..০৩/০৪/০৫ হোক সন্তানের জন্ম! রবিবারও আছে, হবু দাদু থাকবেন কলকাতায়; এমনিতে তিনি সারা সপ্তাহ নন্দীগ্রামে ব্রাঞ্চ সামলান!! ও বাবা! দিদি শুনেই নাকচ করে দিলেন! ‘রবিবার হবেনা, সেরকম কোন পরিস্থিতি হলে সামলানোর ডাক্তার পাওয়া যাবেনা, অন্যদিন ভাব!’ যাহ্, এত সুন্দর একটা তারিখ মিস্! তাহলে তার পরদিন? তাই হল… ০৪/০৪/০৫ হল তার জন্ম.. আগেরদিন সন্ধ্যেবেলা পছন্দের স্কার্ট টপ পরে হেলতে দুলতে গিয়ে রিনু ভর্তি হল হাসপাতালে; ভিজিটিং আওয়ার শেষ হবার পরেই শুরু হয়ে গেল কিসব পরীক্ষা নিরীক্ষা! এটা মাপে, ওটা মাপে! ঘুরে গেলেন ইলোরাদি! ‘ঠিক আছিস তো? ভয় পাচ্ছিস না?’ রিনুর ভয় নেই.. কিসের ভয়?! বরং এক অদ্ভুত আনন্দে সে ডগমগ! ঘুমের ওষুধ দিল সিস্টার! দিব্যি সেটা হজম করে, ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকলো রিনু! শেষরাতে বোধহয় হল একটু ঘুম! ভোর ভোর রিনুকে স্নান করতে বলা হল.. এরপরে সপ্তাহ দুই এভাবে শান্তির স্নান জুটবেনা! ও টি-র ড্রেস পরে রিনু তৈরি। তার কেবিনে দাঁড়ানোর জায়গা নেই আর… দু তরফের প্রায় সবাই হাজির! সবার শুভেচ্ছা আশীর্বাদ নিয়ে এবার রিনু পা বাড়ালো তার ভবিষ্যতে….

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com