রিনুও মায়ের মতই বলে ‘যেদিকে দুচোখ যায়, চলে যাবো

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

সব কিছু ছেড়েছুড়ে হাঁটা দিতে ইচ্ছে করে মাঝেমধ্যেই! গন্তব্য থাকবেনা কোন; যেদিকে দুচোখ যায়; যখন রিনুরা ছোট,মা রেগে গেলেই বলতো, “তোদের জ্বালায় একদিন চলেই যাবো-যেদিকে দুচোখ যায়!” রিনু ভাবতেও খুব ভয় পেতো! মা-ই যে ওদের সব! মা ছাড়া যে রিনু আর ভাই এক্কেবারে অচল! মা চলে যাবে মানে! শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা অনুভূতি! শিরশিরানি ভয় একটা! অতিকষ্টে গিলে ফেলা ঢোঁক! কাঁচুমাচু মুখে মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ানো দু’ভাইবোন! ‘আর করবোনা, মা’… মাকে আটকানোর প্রাণপণ চেষ্টা! এখন আর মা এমন বলেনা! এখন রিনু বলে! প্রচন্ড রাগ-অভিমানে, যখন কিচ্ছু ভাল্লাগেনা, যখন মনে হয় ছেলেটাও দিনদিন কেমন যেন পর হয়ে যাচ্ছে-তখন রিনুর মনে হয় একদিন সত্যিসত্যিই হাঁটা দিতে হবে….ছেলেকে জোর বকুনি দেবার সময়- শেষমুহূর্তে পৌঁছে , রিনুও তার মায়ের মতই বলে ‘যেদিকে দুচোখ যায়, চলে যাবো’… নিমেষে পাবলোর চোখ ছলছল! বরের গম্ভীর গলা ‘রাই, এটা কি কথা!’ রিনু সরে যায় সামনে থেকে…. তবে শুধু রাগ করেই নয়, প্রায়শই রিনুর এই ইচ্ছেটা চাগাড় দেয়; ‘যেদিকে দুচোখ যায়’ সেদিকেই যেতে মন চায়… বারবার… আসলে যাকে ভয় পাই আমরা, যাকে ঠিকমত জানিনা, যার পরতে পরতে রহস্য-অনিশ্চয়তা, তার প্রতি বোধহয় আমাদের অবচেতনে তৈরি হয় এক অন্য আকর্ষণ! ‘যেদিকে দুচোখ যায়’-এর মধ্যে তাই যেমন আছে গন্তব্যহীন, উদ্দেশ্যহীন ভাবে পাড়ি দেওয়া, রাজ্যের না-জানা, না-চেনার অনিশ্চয়তা, তেমনি আছে এক ব্যাখ্যাতীত অমোঘ টান; অনেক টানাপোড়েন শেষে রিনু তার ছানা নিয়ে একদিন বেরিয়েই পড়লো; টানাপোড়েন কেন? বর তার কাজের জন্য আসতে পারলোনা, অতএব মা আর ছায়ের ‘যাবো কি যাবোনা’ টানাপোড়েন! অনেক দ্বিধার পরেও দিকশূন্যপুরের হাতছানি আর রোজকার একঘেয়ে জীবন থেকে ছোট্ট ছুটির জন্য হাঁফিয়ে ওঠা মনটাই একসময়ে জিতে যায়! বয়সে বড় বন্ধু-দিদির নিমন্ত্রণে রিনু আর তার ছানা, তাদের সঙ্গী হয় জল আর জঙ্গলের যাত্রায়.. যে দিকেই দুচোখ যায়, শুধুই জল… ইতিউতি নৌকো, কখনও সখনও লঞ্চেরও দেখা মেলে… এছাড়া চরাচর জুড়ে কেবল জল… অনেক দূরে সবুজের রেখা… গাঢ় হালকা হলদেটে সবুজ… কাছ দিয়ে গেলে দেখা যায় সেই সবুজের শিকড়.. জল ধুয়ে দিচ্ছে তাদের… ঝুরি নেমেছে গাছ থেকে, সটান চলে গেছে জলের মধ্যে… নোনা জল, রঙটা মেটে… সুন্দর-হেতাল, গরান-গেঁও আরো কত কত শত শত গাছ… খানিক পর পর পাড়ের কাছে জলের মধ্যে হঠাৎ জেগে ওঠা নারকেল গাছের গুঁড়ি জানান দেয় বসতি ছিল.. জল গ্রাস করেছে সেসব… বাড়িঘর ভেসে গেছে… ঘরের মানুষগুলো ভেসে যাওয়ার আভাস পেয়ে আগেই চলে গেছে অন্য কোথাও..পরে একসময় এসে হয়ত নারকেল গাছ কেটে নিয়ে গেছে তারা… থেকে গেছে গোড়াটুকু.. কোথাও ঘরের মাত্র একটা দেয়াল আছে দাঁড়িয়ে.. একলা.. নিঃসঙ্গ… তাকেও একা করে দিয়েছে নদী… বান টেনে নিয়েছে সব… বেশ খানিক চলার পর এলো এক গির্জা.. পোড়ো গির্জা! এখন সেও সঙ্গীহীন.. আগে নিশ্চয় লোকালয়ের রবে গমগম করতো, এখন নিশ্চুপ.. উপরের সিঁড়ি অবধি জলে ঢেকে গেছে.. জানলা খোলা… দরজাও.. কিসের অপেক্ষায়… কে জানে… একদিকে জল টেনে নেয়, গ্রাস করে লোকালয়, জনবসতি, অন্যদিকে চরা পড়ে… নতুন সবুজ দেখা দেয়.. জঙ্গল বাড়ে… একই সঙ্গে ভাঙা আর গড়া দেখতে দেখতে আবারো চোখ যায় আদিগন্ত বিস্তৃত জলের দিকে… হাওয়া লেগে জলে অল্প আঁকিবুঁকি… ঝকঝকে আকাশের মেঘগুলো একটু পরেপরেই সেই জলে মুখ দেখতে আসে… ক’টা পাখি ডানা মেলে দিয়ে নিশ্চিন্তে ভেসে থাকে আকাশে… মাঝেমধ্যে ডানা ঝাপটায়…কখনও আবার ভুলেও যায় যেন, একবারও ডানা ঝাপটায় না, কেবল ভেসে থাকে….. পরিপাটি সাজানো লঞ্চ.. এসি কেবিন, ডাইনিং হল থেকে আধুনিক টয়লেট.. ডেকের উপর সার দিয়ে পাতা চেয়ার.. টানটান বিছানা… গা এলিয়ে দিয়ে দুটো চোখ মেলে দিলেই হল… সময় যেন কেমন থমকে যায় সেখানে; কোন তাড়া নেই.. কাজ নেই.. যেন কোথাও যাওয়ার নেই… এদিক থেকে ওদিক ছুঁয়ে সেদিকে এগোনো কেবল.. রিনুর চোখে যতটা মুগ্ধতা, তার ছেলের চোখেও প্রায় তাই… সে যখন এক্কেবারে কুট্টি, তখন থেকেই বৃষ্টি পড়লে জানালায় গিয়ে বসতো.. অপলক তাকিয়ে থাকতো.. রিনু বলে ‘ছেলে আমার প্রকৃতিপ্রেমী’.. এত জল সে কোনদিন দেখেনি! তাই পলক ফেলতে তারও অনীহা… রিনু অবশ্য বারদুয়েক খুব কাছ থেকে জল দেখেছে.. যখন আন্দামানের পোর্ট ব্লেয়ার থেকে তারা গেছিল হ্যাভলকের দিকে, তখন চারপাশে কোথাও কোন সবুজ ছিলনা, বহুক্ষণ… চতুর্দিকে তখন বঙ্গোপসাগরের নীল… বছর দুই আগে, আপার মিশিগান বেড়াতে গিয়েও এমন নীলের মাঝামাঝি বেশ খানিকটা সময় রিনু কাটিয়েছিল… এক জলের এক নীল..কোথাও হালকা কোথাও গাঢ়, ; কখনও ঝকঝকে, কখনও ফ্যাকাশে… একেক নীলের একেক গল্প… জলের মাঝামাঝি চলতে চলতে একেক সময় পাড়ের কাছে চলে আসতেই হয়… তখনই কাছাকাছি দেখা হয় ‘ম্যানগ্রোভ’-এর সঙ্গে… রিনুর ছেলে আর তার বন্ধু ভূগোলের পড়া আওড়ায়.. মায়েরা তখন শ্রোতা… বেশ খানিক পরে পরে ইতিউতি গ্রাম চোখে পড়ে! রোদ থেকে মাথা বাঁচিয়ে হনহন হেঁটে যাচ্ছে কারা যেন! হুস্ করে সাইকেল চালিয়ে যায় শাড়িপরা কিশোরী.. দুই বিনুনী আর পিঠে বইয়ের ব্যাগ বলে যায় ‘দেরি হয়ে গেছে আজ, এবার স্কুল বসে যাবে যে!’ এই গ্রামে ক’ঘর ? গোনার আগেই পিছিয়ে পড়ে গ্রাম.. লঞ্চ তখন ‘কদম কদম বাঢ়ায়ে যা’ সুর ধরেছে… সূর্য্যও জানিয়ে যায়, বেলা বাড়ছে… তাত লাগে চোখে মুখে… নোঙর করা হয় মাঝনদীতে… ডাইনিং হলে ডাক পড়ে সকলের.. থরে থরে সাজানো লোভনীয় সব পদ! জলের মাঝখানে এলাহি আয়োজন… ডানহাতের কাজ সারতে সারতেই ডাঙার ডাক.. রাত কাটানো হবে যেই রিসর্টে, এবার সেদিকেই যাওয়া… সপ্তাহের শুরু, তায় সময়টা গরমের; তাই রিসর্ট মোটামুটিভাবে জনমানবশূন্য! দলবলের গলার আওয়াজে সেখানে প্রাণ আসে… আড্ডা আর আড্ডায় কেটে যায় আরো একটা দিন… জলের নেশায় বুঁদ রিনু আর তার ছানার এই অন্য ছুটি একসময়ে ফুরিয়ে আসে… জল পেরিয়ে তখন ডাঙায় পৌঁছনোর তাড়া… হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছেপূরণ হওয়ার আগেই, মনটা যেন নোঙর করতে চায়… অল্প ঘর ছাড়তে না ছাড়তেই, ফেরার জন্য আকুলিবিকুলি করে ওঠে… ঝোলা নিয়ে তাই আর ‘যেদিকে দুচোখ যায়’, যাওয়া হয়না… চেনা ঘেরাটোপে ফিরতে পেরে তখন স্বস্তি মেলে…

ছবিঃ রিনি বিশ্বাস

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com