যাবোই যাবো সেন্টমার্টিন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নাজনীন হাসান চুমকি

মূলত বছরের শুরুতে ক্যালেন্ডার হাতে পাবার সঙ্গে সঙ্গে টানা ছুটির দিনগুলো মার্কিং হয়ে যায় ঘুরতে যাবার জন্যে। প্রতিবারই সেন্টমার্টিন ঘুরতে যাই এবার শুনতে হয় আর আমি মুখ কালো করে বলি “দেশের মধ্যে তো যে কোন সময় যেতে পারবো, বুড়ো বয়সেও যেতে পারবো, দেশের বাইরে যেতে চাই” একটু মনক্ষুণ্ন হয়ে নিয়ে যান বাইরের দেশে কোথাও।

একবার সে বেঁকে বসলো “এবার যাবোই যাবো সেন্টমার্টিন, তুমি না গেলেও যাবো” কথার সুর শুনে একটু ভড়কে গেলাম সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ প্যাক করে ফেললাম, ছুটি নষ্ট করা যাবে না।
বলে রাখা ভালো, মোট ৬ জনের একটা টিম আমরা রওনা হলাম। টিম মেম্বার বেশী হলে একটু কিন্তু সমস্যা হয়..

নাইট কোচে যাত্রা শুরু করলাম কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। ভোরে পৌঁছে এক রাত কক্সবাজার থাকলাম আর বিরক্ত হলাম। অদ্ভুত এক হৈ চৈ সমুদ্রের পাড়ে, নীরবে বসে থাকার আনন্দ সেই কবে শেষ হয়ে গেছে কক্সবাজারে। তারপরও বিরতি নাকি একটা লাগবে, তাই থাকা। নোংরা, বেশ রাতেও গিয়ে দেখেছি তখনও হরেক রকম বায়ানাক্কা। ভাগ্যিস বন্ধুরা ছিলো, ননস্টপ হাসি। একজন তো সাগরের ঢেউকে শরীর আর হাত নাচিয়ে আজব এক স্টাইল করে ডাকে “আসো.. আসো.. আসো..” ঢেউ এলেই, ডলফিন কায়দায় জাম্প করে বড় বড় ঢেউ পার হয়। আমাদের এই বন্ধু যেমন মুগ্ধ করলো তেমন হাসির ঝড়ও উঠলো..

পরদিন সকালে মাইক্রো নিয়ে যাত্রা শুরু হলো। টেকনাফ আমার আগেই যাওয়া একটা স্থান, কাজে গিয়েছিলাম। সেই পুরোনো স্মৃতি আঁকড়ে ধরলো বেশ। নাফ নদী, অন্যতম সুন্দর একটা নদী। শান্ত হয়ে নাফ নদীর দিকে তাকিয়ে থাকার সুযোগ হয়েছিলো আমার। এমন অনেক অনেক স্মৃতি রোমান্থন করতে করতে জেটিতে পৌঁছে হতবাক আমি। ওরে ভিড়..!! এমনকি এতটা পথ জার্নি করে এসে ওয়াশরুমে যাবো, সেই ব্যবস্থাও ভয়াবহ, অগত্যা অটো সবরকম চাপ অফ হয়ে গেলো, নারীদের এ এক আজব ক্ষমতা, তবে চরম দুর্দশা। বাংলাদেশ এই একটা বিষয়ে কেন যেন চরম পিছিয়ে আছে মোটামুটি পরিচ্ছন্ন টয়লেটের সুব্যবস্থা নেই, আর যাবার মতো একটা থাকলেও টয়লেট ব্যবহারটা জানি খুব কম মানুষই। ফলে, মেয়েদের জন্যে জার্ণিটা বেশ ভয়াবহ একটা ব্যাপার।

থাক, হতাশার কথা আর না বলি, ধ্বাক্কাধ্বাক্কি করে জেটিতে উঠার পর মিনিট পাঁচেক সময় পার হতেই হতবাক হতে থাকলাম। অসম্ভব সুন্দর, অসম্ভব। যতপ্রকার বিরক্তি ছিলো, সব যেন নিমিষে উধাও হয়ে গেলো..!! যথারীতি আমার বর “কী তোমার বকবক বন্ধ কেন..!!??” কৃতজ্ঞতা নিয়ে তাকালাম ভদ্রলোকের দিকে। কারণ উনি, আমাকে নিয়ে যাবার আগে আরও কয়েকবার গিয়েছেন। যখন ট্রলারে করে সেন্টমার্টিন যেতে হতো, একটা স্কুল ঘরে থাকতে হতো সেই সময় থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়া মানুষ, তার প্রিয় স্থানের একটি সেন্টমার্টিন।

পাখিদের দল আমাদের সঙ্গে উড়লো অনেকটা পথ.. মুগ্ধতা নিয়ে সেন্টমার্টিন পৌঁছে আবারও ধ্বাক্কা খেলাম, যেন ইঁদুর বেড়াল খেলা শুরু হয়ে গেলো। আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে সেই ছোটাছুটি দেখলাম, মুহূর্তের মধ্যে গিজগিজ করতে লাগলো খাবারের হোটেলগুলো যেন সবাই খাওয়ার জন্যে সেন্টমার্টিন এসেছে..!!! আমার কথায় কেউ কষ্ট পেলে দুঃখিত, কিন্তু বিশ্বাস করেন ঠিক এমনটাই মনে হয়েছিলো আমাদের।

সবার নামার পর আমাদের টিমটা ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে হোটেলে ঢুকলাম, চেক ইন করে ফ্রেশ হয়ে সবাই খাওয়া শেষ করে যখন পানিতে দাপাদাপি শুরু করলো তখন আমরা খাওয়ার হোটেলে ঢুকলাম, যা পেলাম তাই দিয়ে খেলাম। তারপর আবার রুমে ফিরলাম। বিকেলে যখন ফিরতি জাহাজে দশনার্থীদের বড় একটা অংশ ফিরে গেলে আমরা কয়েক ঘন্টার ঘুম দিয়ে বের হলাম।

কেন যেন বড় একা হতে ইচ্ছে করলো, পিছনে দলের সবাই আছেন, হাসছেন, উফ আমরা হাসতেও পারি। তবুও একটু এগিয়ে গিয়ে চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে একটা জায়গায় বসলাম, একসময় সন্ধ্যা হয়ে এলো, কেমন যেন শুনশান নীরবতা..!! আলোর অপ্রতুলতা..!! তারা ভরা আকাশ পরিস্কার..!! বাতাসে কেবলই মৃদু সাগরের ঢেউয়ের শব্দ..!! দূরে হোটেলগুলোতে হারিকেনের আলো..!! বর্ণনাতীত এক ভাললাগায় শরীর কেঁপে উঠলো..!! বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো আমি কক্সবাজার ছিলাম আগের দিন..!! (চলবে)

ছবি: লেখক ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com