যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লিওনিড দত্ত

(বর্ধমান থেকে): বীরহাটার ঘড়িটা তখন জানান দিচ্ছে রাত এগারোটা। শহরটা ঘুমানোর তোড়জোড়ে ব্যাস্ত। দোকানের দেখানো শাড়ি গুছিয়ে নিতে ব্যাস্ত দত্তসেন্টার। জেগে আছে মহাজনটুলির ঘরগুলো, আর ঘুম নেই কুমোর পাড়ায়। ঘুম চোখে চকচকে কাপড়গুলো পাট করে হিসাব মেলাচ্ছে বাচ্চা ছেলেটা। রাতের শুকনো রুটি ঢাকা পড়ে আছে। বাঁ হাতে রঙ, ডান হাতে তুলি। হাত চলে যাচ্ছে অভ্যাসের বশে- নিখুঁত। ‘মায়ের মূর্তি, খুঁত থাকলে হয়?’
পুজোর সাজের ধুতি, কার্ত্তিক গণেশের উত্তরীয়, নতুন কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে স্মৃতি কুমোরের। ‘এখন তো বাবু চাকচিক্যের বহর বেশি। খাঁটি শিল্পের কদর কে করে? ওই যে কী যেন বলে- মার্কেটিং। শুধু পঞ্চমীর দিন যখন সব নিয়ে চলে যায়, বুকটা বড় হুহু করে। যেন নিজের মেয়েটাকে এতদিন ধরে বড় করে সাজিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠাচ্ছি।’
খড়িমাটির উপর পড়তে থাকে রঙের প্রলেপ। কাজ শেষ করতে হবে। বৃষ্টি হলে রঙ শুকাবে না। অভ্যস্ত হাত তাই ঘুম চোখে বুলিয়ে যায় রঙ।
“শুনেছিস? চৌরঙ্গী নাকি পঁয়ষট্টি ফুট! ”
“হুঁহ, বেশি উঁচু করলে আবার দেশপ্রিয় হয়ে যাবি। বড় করলেই হয়? পুজো দেখবি ঝাঁপানতলায়! রাজার পাড়ার পুজো।” 
চায়ের দোকানে তর্জা তুঙ্গে। সকালে উঠে হাফ ইয়ারলির শেষ পরীক্ষার পড়া দেখে নিচ্ছে ছাত্র। কপালে দই-হলুদ, মায়েদের ‘দুগ্গা দুগ্গা’ – ‘আজ পরীক্ষা শেষ, আজ কিন্তু আইসক্রিম খাব’- গেটের এপার থেকে ‘বানানগুলো ঠিক করে দেখবি কিন্তু, এদিক ওদিক তাকাবি না’ – সব কিছুতে যেন পুজোর গন্ধ! পুরানো কোন সোনার কাঠির ছোঁয়ায় শহরটা জেগে উঠেছে। জেগে উঠেছে মিইয়ে যাওয়া বি.সি.রোডের দোকান গুলো। ছোট ছোট দোকান গুলোতেও ভিড় উপচে পড়ছে। “এবার অষ্টমীতে মা বলেছে গরদ পরে মঙ্গলাবাড়ি যেতে। নবমীতে কিন্তু আমি মায়ের কাছে যাব” জোর আলোচনা নবদম্পতির। এস পালের দোকান উপচে আসছে “দাদা, দুটো মোগলাই পার্সেল। একটু তাড়াতাড়ি”
সেই সিটি টাওয়ার থেকে শুরু করে ভিড় ছড়িয়ে বড় মসজিদের গা অবধি। ওখানে যন্ত্রের দোকানগুলো নিজেদের মত টুংটাং সুর তুলছে সমানে। যেন সারাটা বছর ধরে শহরটার বুকে সুরের স্পন্দন দেবার প্রতিজ্ঞা। তেঁতুলতলা বাজারের সিভিক পুলিশ হিমশিম খাচ্ছে ভিড় সামলাতে। ওই তো, খোসবাগান থেকে ছুটে আসা অ্যাম্বুলেন্সটা বোধ হয় আটকে গেল। আরেকটু এগোলে ঠাকুরের সাজ বিক্রি হয়।দশকর্মার দোকানে নতুন মালা সেজে উঠেছে। সারা বছর বাইরে লাঠি দিয়ে সার করে টাঙানো প্লাস্টিকের মালা যেন কোন রঙ নেই। সেখানে নতুন চকচকে মালার আমদানি হয়েছে। নতুন উদ্যোমে বিক্রি শুরু করেছে লস্যির দোকান গুলো। ফুটপাথ থেকে বাচ্ছাদের জামার দর করছে এক বাবা। মেয়েটা কোলেই ঘুমিয়ে গেছে।
স্টেশন চত্বরে মাল আনা নেওয়ার খুব ভিড়। সস্তার প্রসাদের লাড্ডু-গজা বিক্রি হচ্ছে পাইকারি রেটে। এক দল ছেলে মেয়ে স্টেশনের বাচ্চাদের জন্য নতুন জামাকাপড়ের বান্ডিল এনেছে। তারা বিলি করছে – সেখানে ভিড় জমিয়েছে অনেকে। চোখ লাল- পেটে খিদে আর ডেনড্রাইটের নেশায় ডুবে থাকা ছোট ছোট মুখ গুলো চেয়ে আছে নতুন জামার প্যাকেটের দিকে। ওই তো লোকাল থেমেছে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে ঢাকির দল। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নিচ্ছে দর নিয়ে, ‘দর যেন বেশি বাড়াস নে। নইলে সব ক্যাসেট দিয়েই ঢাক সাড়ছে এখন’।
গোলাপবাগের দিকটা যেন মূর্তির উল্টোদিক। খড়-মোছা রং- আধ লেপা মাটি, অথচ সে যেন ধারণ করে আছে সামনের শক্তিকে। ইউনিভারসিটি চত্বর সন্ধ্যে বাড়লেই যেন শুনশান। লম্বা রোডে কে যেন বাকি শহরের ব্যাস্ততার ক্লান্তিকে ঢেলে দিয়ে গেছে। দিনের বেলায় ছাত্রদের চঞ্চলতা- স্বপ্ন – প্রেম সব মিলিয়ে জীবনে এগোনোর সাক্ষী হয় যারা, সেই গাছ গুলো রাত্রি হলে যেন ক্লান্ত প্রাণের শরীক। কোন শব্দবন্ধ নেই, মাঝে মাঝে শুধু দুলে জানান দেওয়া বাঁচার প্রতীক। সেখানে শ্রীর চেয়েও নৈশন্দ যেন বাঁচে বেশি – উন্মাদনার চেয়ে গোপনীয়তা যেন বেশি করে কথা বলে। রাস্তার বন্ধ হওয়া ঝুপড়িগুলো যেন গাছ গুলোর নৈশব্দকে বাঁচানোর অঙ্গীকার নিয়ে আছে।
‘কি গো, পঞ্চমী তো এসে পড়ল। কাজ কতদূর? ‘
কুমোর হেসে উত্তর দেয়, ‘আজ তা একটু ফাঁকিই দিচ্ছি। ওই দেখো, গিন্নি রঙ দিচ্ছে আজ।’
কুমোর গিন্নি মোমবাতি নিয়ে মায়ের আঙুল ফুটিয়ে তুলছে রঙে। জ্বলজ্বলে চোখের মণিতে ভেসে উঠেছে মায়ের মুখ। স্রষ্টা ও সৃষ্টিকর্তার এক অদ্ভুত মিলবন্ধন – যেখানে মাতৃ রূপে বিরাজমান আরেক মায়ের চোখে ফুটিয়ে তোলেন নীরব তেজ।
বাইরে এক ভিখারিনী রোদে রাখা প্রতিমার পায়ের কাছে বসে বিড়ি টানছে। ওই যে শব দেহ বয়ে নিয়ে চলেছে একদল যুবক। বিকালের আজান ধ্বনি এসে পড়ছে শহরের বুক চিরে।
তা আজ কাজে হঠাৎ ফাঁকি কেন?
কুমোর হেসে জবাব দেয়, “আজ যে কিছু এডভান্স পেলুম। তাই মেয়েটাকে আজ নিয়ে আসতে যাব। ওই দামোদর পেরিয়ে বিয়ে দিছি।”
বেরোনোর আগে কুমোরগিন্নি হাঁক পাড়ে কাজের ফাঁকে-‘আলতা সিঁদুরটা কিনতে ভুলো না যেন’

কুমোরটুলি ছেড়ে বড়রাস্তা ধরে এগিয়ে চলে এক বাবা। রাস্তায় বুকে যেন ঝরে পড়ে তার স্নেহ। চোখ তুলে একবার দেখে নেয় মেঘ আছে না কি। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করে শিল্পী। দূরে কে যেন গান ধরেছে ‘যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী..

ছবিঃ গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com