যত যাই ততোই ভাল লাগে কক্সবাজার…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

কক্সবাজার। সমুদ্র পাড়ের শহর। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত এই শহরেই। কারণে-অকারণে বহুবার যাওয়া হয়েছে এই শহরে। সমুদ্র বিলাস করতে। সমুদ্রকে কাছ থেকে উপভোগ করতে। সমুদ্রের গর্জন শুনতে। সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে নিজেকে বিলিয়ে দিতে। প্রতিবারই মনে হয়েছে আরও ক’টা দিন যদি সমুদ্রের কাছে থাকা যেতো। আরও কিছুদিন যদি সমুদ্রের নোনা জলে পা ভেজাতাম। বালুকাময় সমুদ্র তীরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতাম। কিন্তু তা আর হয়ে উঠে না। বাস্তবতা খুবই ভিন্ন। তবে যতবারই সমুদ্রের কাছে যাই না কেন, ফিরে এসে মন চায় আবারও ছুটে যেতে।
সর্বশেষ সমুদ্র দর্শনে কক্সবাজার গিয়েছিলাম গত মার্চ মাসের শেষ দিনে। একা নয়, ছিলাম আমরা অন্তত জনা পনেরো তরুণ-যুবক। পেশায় সবাই সংবাদকর্মী। উপলক্ষ একটু চুটিয়ে আড্ডা মারা, আপন মনে ছুটে বেড়ানো, কিংবা কিছুটা সময়ের জন্য হারিয়ে যাওয়া আনন্দধারায়। সেই কাজটুকু আমরা করতে পেরেছিলাম। এ কারণে যে, অন্য যেকোন বারের তুলনায় এবার কাজের চাপ ছিল কম।
৩০ মার্চ রাতে ঢাকা থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে করে যাত্রা শুরু কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। কোন রকম বিড়ম্বনা ছাড়াই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সমুদ্র কন্যার কাছে পৌঁছলাম সকাল আটটায়। মধ্যে একবার যাত্রা বিরতী কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে। তারপর সাত সকালে যখন সমুদ্র পাড়ে পা রাখি। কক্সবাজার শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। সবেই শহরে প্রবেশ করছে পর্যটকবাহী একের পর এক যানবাহন। বাস থেকে নেমে আমরা ছুটে গেলাম আমাদের জন্য আগে থেকেই বুকিং দেয়া একটি আবাসিক হোটেলে। ঠিক হোটেল নয়, স্টুডিও ফ্ল্যাট। কিন্তু সেখানে গিয়ে টিমের সবাই বিরক্ত। হোটেলটি বাসযোগ্য নয়। নানারকম সমস্যায় জর্জরিত। অতপর সিদ্ধান্ত হল, লাগেজ রেখে আপাতত সকালের নাস্তা পর্ব শেষ করে আমরা নতুন একটি হোটেলে উঠবো। বেরিয়ে পড়লাম নাস্তার উদ্দেশ্যে। সঙ্গে থাকা সহকর্মী ছোট ভাই সাব্বির আহমদ বললো আমরা পউশী রেস্টুরেন্টে নাস্তা করতে পারি। এই রেস্টুরেন্টের খাবারের মান ভাল। যথারীতি পউশী’তেই সকালের নাস্তা পর্ব শেষ করলাম। কেউ খেলেন পরোটা, কেউবা খিচুড়ি আবার কেউ খেলেন নান রুটি, সঙ্গে গরুর মাংস, সব্জি আর বুটের ডাল। তবে স্পেশাল হচ্ছে পউশী’র নিজস্ব তৈরি আচার। এখনও জিভ্ এ লেগে আছে। সকালের নাস্ত খেয়ে রান্নার মান নিয়ে সবাই মুগ্ধ। সিদ্ধান্ত হল আমরা এখানেই দুপুরের খাবার সারবো।
নাস্তা পর্ব শেষ করে আবারো আবাসিক হোটেলের খুঁজে বের হলাম। সুগন্ধা পয়েন্টের কাছাকাছি কক্সবাজার শহরের প্রধান সড়কের উপরেই হোটেল ‘মেরিন’ এ ঠিকানা হল। লাগেজ রেখে আমরা যার যার মত বেরিয়ে পড়লাম। আমি সাব্বির, সোহেল মামুন আর মাহফুজ কামাল বাবু বের হয়ে পড়লাম হিমছড়ি ব্লক এলাকার দিকে। আর আসাদুজ্জামান বিকু, রতন বালো, মাহমুদ আকাশ, রায়হান, শরীফুল ইসলাম, মশিউর রহমান সহ অন্যরা চলে গেলেন সুগন্ধা বীচের দিকে।
আগেই বলেছি, কক্সবাজারে সমুদ্র দর্শনে বহুবার যাওয়া হয়েছে। প্রতিবারই চেষ্টা করেছি নতুন কিছু দেখার। নতুন কিছু আবিস্কারের। নতুনের নেশায় ছুটে চলা হচ্ছে আমার অন্যতম একটা শখ। সকালের নাস্তা পর্ব শেষ করার পর সাব্বির বললো ভাই হিমছড়ি এলাকায় সাগরে প্যারাসেইলিং হয়। যারা এটা পরিচালনা করেন তারা আমার পূর্ব পরিচিত। চলেন আমি আর আপনি ওইখানে যাই। তার এই প্রস্তাবে মুহুর্তেই রাজি হয়ে গেলাম। বললাম আমাদের সঙ্গে সোহেল মামুন ও মাহফুজ কামালকেও নিয়ে যাই। যেহেতু অন্যরা সাগরের পানিতে হাবুডুবু খেতে গেছে, তাই আমরা চার জন চলে গেলাম হিমছড়ি ব্লক এলাকায়।
সেখানে আগে থেকেই ফান ফেস্ট এর ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন নয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল সাব্বির। আমরা আধা ঘণ্টার মধ্যে চলে গেলাম হিমছড়ি ব্লকে। সেখানে অপেক্ষমান আনোয়ার হোসেন নয়ন আমাদেরকে স্বাগত জানিয়ে প্রথমেই কচি ডাবের পানিতে আতিথেয়তা করলেন। তারপর আমরা ছুটে গেলাম সাগরের দিকে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও আমরা প্রথম দিনে প্যারাসেইলিং করতে পারলাম না বিরূপ আবহাওয়ার কারণে। ফিরে আসলাম কক্সবাজার শহরে। দুপুরের খাবার শেষ করে একটু বিশ্রাম, অতপর সুগন্ধা বীচ এ সাগরের সঙ্গে মিতালী।
দ্বিতীয় দিনে পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী সকালেই আমরা রওয়ানা হলাম চকোরিয়ার দিকে। কক্সবাজার থেকে চকোরিয়া যেতে যেতে বেশ কয়েকটি পয়েন্ট পাওয়া যায় যেখান দিয়ে বন্য হাতি পারাপার হয়। আমরা সেরকম দু’টি স্থানে নেমে বনের গভীরে গেলাম। সবুজ ঘন বন, বনের সরু পথ ধরে আমরা দল বেঁধে হাঁটতে থাকলাম বেশ কিছুক্ষণ। পাহাড়ি বাতাস, ঘন বন, সবুজের সমারোহ নিমিষেই মন ভাল করে দেয়। স্থানীয় লোকজন জানালেন, দিনের বেলা বন্য হাতি দেখা যায় না। প্রায় রাতেই হাতিরা নেমে আসে লোকালয়ে। বসতিতে ঢুকে অনিষ্ট করে জান মালের। কিন্তু দিনের বেলা বন্য হাতির চলাচল না থাকায় আমরা নির্বিঘ্নেই ঘুরে এলাম বন্য হাতির অভয়ারণ্য এবং চলাচলের পথ ধরে।
বন্য হাতি’র পথ ঘুরে ঘুরে দেখার পর আমাদের গন্তব্য ছিল রামু বৌদ্ধ মন্দির। কক্সবাজার-রামু সড়ক থেকে মাত্র এক কিলোমিটার সরু গলি ধরে ঢুকলেই দেখা মিলে রামু বৌদ্ধ মন্দিরের। সেখানে ঢুকতেই দেখা গেল দর্শনার্থীদের ভিড়। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে দর্শনার্থীরা বৌদ্ধ মুর্তিটিকে এক নজর দেখতে আর ক্যামেরাবন্দী করতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন রামুতে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে যারা সাগরের নোনা জলে গা ভাসাতে আসেন তারাও এক বারের জন্য হলেও ঢু মারেন রামু বৌদ্ধ মন্দিরে। ফটো সেশন শেষ করে আমরা দুপুরেই ফিরে আসি কক্সবাজার শহরে।
বিকেলে আমি, সাব্বির আর সোহেল মামুন আবারো ছুটে গেলাম হিমছড়ি ব্লকে। উদ্দেশ্য প্যারাসেইলিং। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এই বিকেলটিও বিফলে গেল। আমরা যখন প্যারাসেইলিং করার প্রস্তুতি নিয়ে সাগরের নোনা জলের একেবারে কাছে তখনই আবহাওয়া মত পাল্টালো। আমাদের আর নামা হলো না। তবে আমাদের আগে থেকে সিরিয়ালে থাকা এক দম্পতি ঠিকই প্যারাসেইলিং করে আসলেন। রাকিব-রাহা দম্পতি ঢাকায় একটি মোবাইল কোম্পানিতে চাকরি করেন। নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করে জানালেন,এই প্যারাসেইলিং এর জন্য তিন দিন ধরে ঘুরছেন। কিন্তু আবহাওয়া সায় দিচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত আজ তারা সফল হয়েছেন।
অবশ্য দ্বিতীয় দিনে প্যারাসেইলিং করতে না পারলেও দ্বিতীয় দিনটি চমৎকার কেটেছে। সাগরের তীরে সী বাইক চালিয়ে কয়েক কিলোমিটার ঘুরে বেড়ানোর মজাই আলাদা। একদিকে উত্তাল সাগর, অন্যদিকে সুউচ্চ সবুজ পাহাড়। মধ্য দিয়ে চলে গেছে মেরিন ড্রাইভ (সমুদ্রের গা ঘেষে নির্মিত পাকা সড়ক)। মন জুড়ানো নয়নাভিরাম সব দৃশ্য। বিশ্বের বৃহৎ এই সমুদ্র সৈকতে পর্যটকরা ঘুরে বেড়ানোর সময়টা দারুণ উপভোগ করেন।
দ্বিতীয় দিনে ব্যর্থ হয়ে ফিরলেও আমরা প্যারাসেইলিং এর সিদ্ধান্ত থেকে এক চুল পরিমানও সড়ে দাঁড়াইনি। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তৃতীয় দিন খুব ভোরে আমরা দল বেঁধে বের হয়ে পড়লাম মহেশখালীর উদ্দেশ্য। দ্বীপ জনপদ মহেশখালীতে যেতে হয় স্প্রিডবোটে। কক্সবাজার শহরের ছয় নম্বর ঘাট থেকে সবাই মিলে রওয়ানা হলাম মহেশখালীর পথে। প্রায় ১৫/২০ মিনিটের বোট যাত্রা শেষে মহেশখালী ঘাটে গিয়ে মনে হল তীব্র গরমের মধ্যে আর না যাই। দলের সবাই গেলেও আমি এবং সোহেল মামুন ফিরে আসলাম মহেশখালী ঘাট থেকেই। মাথা থেকে কোনভাবেই নামছে না প্যারসেইলিং এর বিষয়টি। তাই কক্সবাজার শহরে ফিরে আমরা সাব্বিরকে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় ছুটে গেলাম হিমছড়ি ব্লকে। মাথার উপর খাড়া রোদ। উত্তপ্ত সাগর তীরের বালু। এরমধ্যে আমাদেরকে নিয়ে ফান ফেস্টে’র আনোয়ার হোসেন নয়ন শেষ বারের মত প্যারাসেইলিং এর চেষ্টায় নামলেন। এবার যদি না হয় তাহলে এ যাত্রায় আর প্যারাসেইলিং হবে না। আবার এটি আমরা মিসও করতে চাই না।
এবারও সাগর অনুকূলে নয়। উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে কোনভাবেই নামা যাচ্ছে না সাগরে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও যখন আবহাওয়া তার মত পাল্টাচ্ছিল না তখন আমরা সাগর তীরেই প্যারাসেইলিং এর সিদ্ধান্ত নিলাম। একে একে আমি, সোহেল মামুন এবং সাব্বির মাটি থেকে শূন্যে উঠে গেলাম। প্রায় পাঁচ শত ফুট উপরে। কি যে দারুণ এক অভিজ্ঞতা। একবার প্যারাসেইলিং না করলে সেটা বুঝা যাবে না।
বাংলাদেশে আগে কখনও প্যারাসেইলিং হয়নি। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্যারাসেইলিং একটা জনপ্রিয় রাইড। কিন্তু কক্সবাজারে এই প্রথম বারের মত চালু হয়েছে এই রাইডটি। ফান ফেস্ট কর্তৃপক্ষ এই রাইডটি গত বছর থেকে চালু করেছেন। প্যারাসেইলিং শেষে নয়নের আতিথেয়তায় দুপুরের খাবার পর্ব শেষ করলাম। আলু ভর্তা, ডাল আর মুরগীর মাংস। সু-স্বাদু রান্না। খেয়ে আমরা মুগ্ধ।
কক্সবাজারে এর আগে অনেকবার যাওয়া হয়েছে। যাওয়া হয়েছে হিমছড়ি এবং ইনানী বীচেও। কিন্তু লাল কাঁকড়ার সাথে এর আগে কখনও সাক্ষাৎ হয়নি। এবারের যাত্রায় লাল কাঁকড়াই ছিল সবচেয়ে দর্শনীয়। হিমছড়ি ব্লক এলাকায় যেখানে প্যারসেইলিং হয় সেই এলাকাতে বিস্তৃীর্ণ সাগরপাড় জুড়ে দেখা মিললো লক্ষ লক্ষ লাল কাঁকড়ার। কিন্তু বিস্ময়কর হচ্ছে, সেই লাল কাঁকড়ার কাছে গেলে মুহুর্তেই হাওয়া হয়ে যায় হাজার হাজার কাঁকড়া। তারা ভয়ে গর্তে ঢুকে পড়ে। আমরা অনেক চেষ্টা করে দূর থেকে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার ছবি ক্যামেরাবন্দি করলাম। উপভোগ করলাম প্রাণীকূলের এমন সৌন্দর্য্য। পুরো সাগর তীর যেন লালে লাল হয়ে গিয়েছিল লাল কাঁকড়ার রঙে।
এবারের যাত্রায় কক্সবাজার ছেড়ে আসার আগের রাতটি ছিল আমাদের জন্য দারুণ উপভোগ্য। সুগন্ধা বীচে সারি সারি মাছের দোকান। যেখানে সাগর থেকে ধরে আনা মাছ সী ফিশ বিক্রি হচ্ছে ফ্রাই করে। দেশী-বিদেশী পর্যটকরা দল বেঁধে এসব দোকানে ঢুকে মাছের ফ্রাই খাচ্ছেন। আমি আর সোহেল মামুন ঢুকে পড়লাম একটি দোকানে। পছন্দের কোরাল মাছ ফ্রাই খেলাম। তারপর বড় আকারের আস্ত একটা মাছ ফ্রাই করে নিয়ে গেলাম হোটেল রুমে। সেখানে আমি, সোহেল মামুন, সাব্বির, মাহফুজ মিলে তুমুল আড্ডার সাথে সেই মাছ ভক্ষণ করলাম। আর আগের রাতে ঢাকা থেকে যাওয়া সহকর্মী শরীফুল ইসলাম সুমন, রিয়াজ চৌধুরী, অভিজিৎ চৌধুরী এবং সিদ্দিকুর রহমানের আমন্ত্রণে তাদের হোটেল রুমে মেতে ছিলাম আরেক আড্ডায়। মধ্য রাত পর্যন্ত চলে সেই আড্ডা। নানান গল্পের সঙ্গে ছিল হালকা খাবার আর পানীয়। এ যাত্রায় বিদায় জানালাম কক্সবাজারকে।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com