যত বয়স বাড়ছে, ততই কিসের যেন ভয় দানা বাঁধছে রিনুর মনে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

রাস্তার একধার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছো, মনে হল ওধারে যাওয়া খুবই দরকার, ভাবনা মত পা বাড়ানো মাত্রই- কথা নেই বার্তা নেই-কোথা থেকে বেআক্কেলে একটা রিক্সা এসে দিল ধাক্কা! ব্যস্ পড়ে গিয়ে হাতের কনুই আর হাঁটু গেল ছড়ে! একে তো ব্যথা, দু চার ফোঁটা রক্ত, জামাকাপড় ধুলোয় মাখামাখি-তার সঙ্গে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে ‘আহা! খুকু, পড়ে গেলে কি করে?!’ ইত্যাদি ইত্যাদি!!! কি লজ্জা! ছি ছি!!! ওহ্ হো, আরেকটা তো বাদই গেল! মা আর বাবাইয়ের বকুনি!!! রিনু তখন এই মাটি থেকে হাত তিনেক না কি আরেকটু কম- বড়! বড়ই তো! দিব্যি কুট্ কুট্ করে কথা বলতে পারে, মা-বাবার হাত ধরে টুক্ টুক্ করে হাঁটতেও পারে! নয় নয় করে বছর দুই বয়সও হল! বড় নয়?! তখন প্রায়ই এমনটা ঘটতো! রাস্তার একদিক দিয়ে হয়ত বাবার বা মায়ের হাত ধরে রিনু যাচ্ছে কোথাও, ওদিকে চেনা কাউকে দেখতে পেয়ে (বা এমনি এমনিই) রিনু হাত ছাড়িয়ে পা বাড়ায়! মূলত: রিক্সার সহিত অবধারিত সংঘর্ষ এবং পতন! অল্পস্বল্প কেটে যাওয়া আর অনেকটা ঠোঁট ফোলানোর সঙ্গেই বকুনিও জুটতো এই এত্তখানি! রিনুর থুতনির নিচে বেশ গভীর একটা দাগ আছে! বহুদিন রিনু মনে করতো সবারই অমন থাকে! আসলে ওটা যে কোন দুর্ঘটনাজনিত তা তো মনেই প

ভাইয়ের সঙ্গে রিনু

ড়ে না! হ্যাঁ, মনেও পড়েনা, এমন বয়সে রিনু একবার চৌবাচ্চায় পড়ে গিয়ে থুতনি ফাটিয়েছিল! ফলস্বরূপ ওই দাগ! রিনু মোটেই নিজে নিজে গিয়ে জলভরা চৌবাচ্চায় পড়ে যায়নি! কেউ ধাক্কাও দেয়নি! হল কি, রাশিদিদি ছিল রিনুর কেমন এক দিদি! রিনুর মা তো যান অফিস, বাবাও তাই! ঠাকুমা আছেন, তবে তাঁর একার উপর বাচ্চার সব ভার দেওয়া একরকম অসম্ভব, তাই রাশিদিদি! তার সঙ্গে দিনের অনেকটা সময় কাটে, কুট্টি রিনুর!
পাড়ায় বাঁদর খেলা দেখাতে এসেছে একজন! এক বাড়ির উঠোনে চলছে সেই মজার কেরামতি! ডুগডুগি বাজছে আর দুটো বাঁদরের সে কি লম্ফঝম্প! তাদের ঘিরে পাড়ার ছোট বড় মাঝারির ভিড়। রাশিদিদিও আছে সেখানে। কোলে রিনু; পাশেই চৌবাচ্চা! কিভাবে যেন রাশিদিদির হাত ফসকে সেটাতেই ঝপাং রিনু! গলগল করে রক্ত! তারস্বরে মেয়ের কান্না! সবাই পড়লো রিনুকে নিয়ে!বাঁদরখেলা পালানোর পথ পায়না! স্টিচ হবে না, দরকার নেই-এর তর্কে ‘না’ জেতে! মেয়ে কিছুদিন তার পিতৃদেবের দেওয়া হোমিওপ্যাথি খেয়ে আবার রাশিদিদির কোলে চড়ে ঘুরতে শুরু করে! বলে রাখা ভালো যে কেবল থুতনির দাগ ছাড়া বাকি গল্পর প্রমাণ রিনুর কাছে নেই! এসবই ‘প্রাচীন অরণ্যপ্রবাদ’ থুড়ি শোনা কথা! দেখার এবং মনে রাখা কয়েকটা অ্যাক্সিডেন্টের গল্পও রিনুর কাছে আছে! রিনু ক্লাস সিক্স। ভাইয়ের তখনও নার্সারি স্কুল চলছে! গোয়া বেড়াতে যাওয়া হচ্ছে! হাওড়া যাবার ট্যাক্সিতে উঠতে গিয়ে কিভাবে যেন ট্যাক্সির দরজায় ভাইয়ের হাত গেল চিপে! গুরুতর কিছু না হলেও পুঁচকের ফ্যাচফ্যাচ কান্না সহযোগে সেবার ট্রেনে উঠলো রিনুরা! অজন্তা-ইলোরা দেখা হল। পুনে ঘোরা হল। পরের গন্তব্য গোয়া! রাতের বাস। সিটের উপরে মালপত্র রাখার ব্যবস্থা। বাসের ভেতরে টিমটিম করে নাইট ল্যাম্প জ্বলছে! সকলেই আধো ঘুমে! হঠাৎই ‘ও মা, ও বাবা’ চিৎকারে ঝটপট বাসের আলো জ্বলে উঠলো! উপরে রাখা সুটকেস কি করে যেন এসে পড়েছে রিনুর ছোট্ট ভাইয়ের উপর! মায়ের পাশে সে বসা! আধশোয়া বলাই ভালো! কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইয়া এক সুটকেস আচমকা ওইটুকু বাচ্চার উপর ধপাস! বাচ্চার কান্না থামানোর সঙ্গে সঙ্গে চলে আর্ণিকার খোঁজ আর সব যাত্রী মিলে বাসের হেল্পারকে জোর বকুনি! ‘ক্যায়সা বাস হ্যায় তুমহারা! সবকিছু দুম দাম গিরতা কিঁউ!’ গোয়ার আঞ্জুমা বিচে একটা গোটা দিন কাটাচ্ছে রিনুরা! ভাই আশেপাশেই ছিল! মায়ের সঙ্গে বিচ লাগোয়া দোকানে কেনাকাটা দেখছিল। ওমা! একটু পরে কিসের সোরগোল! একটা গরু লেজ উঁচিয়ে দৌড়োচ্ছে! খানিক পরে টের পাওয়া গেল গরুটার সামনে একটা বাচ্চা ছেলেও দৌড়োচ্ছে! আজ্ঞে, ঠিকই ভাবছেন। সে রিনুর ভাই-ই। কোনমতে ভাইকে উদ্ধার করার অনেক পরে যা জানা গেল, তা হল- দোকানে মা ব্যস্ত, সে বেচারা কি করবে না বুঝতে পেরে পাশে বসা গরুটার লেজ ধরে কয়েকবার নাচিয়েছিল! গরু আর কি করে! সাধের জাবর কাটা বাদ দিয়ে অগত্যা রিনুর ভাইকে তাড়া করতে সে বাধ্য হয়!
সেবারের বেড়ানো শেষ হবে বোম্বে এসে। তখনও ওটি বোম্বেই! কোথায় যেন যাওয়া হয়েছিল! কোন এক স্টেশন থেকে হোটেল ফেরার ট্রেন! মা নেই! কই মা? প্রবল নিম্নচাপ অনুভব করায় তিনি তখন

ভাইয়ের সঙ্গে রিনু

স্টেশনের টয়লেটের হালহকিকত দেখতে গেছিলেন! বোম্বের স্টিলের বাসনপত্রের জগতজোড়া নাম-(তখনও ছিল).. সেবার কলকাতার সবার জন্য উপহারে বেশকিছু বাসন কেনা হল! সার দিয়ে বাসনের দোকান! একটা দোকানে রিনুরা- ‘এটা না, উয়ো দিখাইয়ে না দাদা’ .. আবার চিৎকার! রিনুর ভাইয়ের গলা মনে হচ্ছে! ঠিক তাই! তিনি দোকানে ঢোকার সিঁড়ির সঙ্গে লাগানো স্লোপে(ঢালু জায়গা) স্লিপ স্লিপ খেলছিলেন! বারবার নামছিলেন এবং উঠছিলেন! একবার টাল সামলাতে না পেরে পৌঁছে গেছেন সটান মাঝরাস্তায় – যেখানে তাঁর সামনে বাবা বিশ্বনাথের বাহন-ষাঁড়! ‘কোথা থেকে এলি রে তুই’-ভাব করে যিনি প্রায় গুঁতিয়ে দিচ্ছিলেন এই কচি ছেলেটিকে! একে তো ষাঁড়ের গুঁতিয়ে দেবার ভয় তার উপর মা আর বাবার বকুনিতে রিনুর ভাইয়ের মুখ শুকিয়ে এইটুকু। সে যাত্রাতেও কমের উপর দিয়েই ভাই রক্ষা পেয়েছিল! রিনুর ভাই কিন্তু বেশ সুবোধ বালকই ছিল। অবাধ্য নয় একটুও। হাতেপায়ে সামান্য চঞ্চলতা তো ও বয়সে সবারই থাকে!
আজও রিনু মনে করে, বেচারার সেবার ‘ব্যাড লাক’টাই খারাপ ছিল! দক্ষিণীতে গানের ক্লাস। রবিবার সকাল। ভাই তখন ফোর, রিনু ক্লাস টেন। বাবাইয়ের স্কুটারের পিছনে দুভাইবোনে বসা! বাড়ি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় পড়ার আগে, গন্ধেশ্বরী মন্দিরের কাছে ভাইয়ের জোর চিৎকার! পাশ দিয়ে যাওয়া ভ্যান রিক্সার চাকা থেকে বেরিয়ে থাকা লোহার আঙটা ভাইয়ের ডান পায়ের পাতায় গেঁথে গেছে! মাংস খুবলে সে একাকার কান্ড! কোনমতে ট্যাক্সি ডেকে, রিপোস্ নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হল ভাইকে! গোটা ছয়-সাত স্টিচ্ পড়লো ভাইয়ের পায়ে! রিনু তো কেঁদে আকুল! বাড়ি ফিরে দেখে মা কাঁদো কাঁদো মুখে ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়ানো। অ্যাক্সিডেন্ট হবার পর পাড়ার একজনকে পেয়ে রিনুর বাবা স্কুটারের চাবি তাকে দিয়ে বলেছিল গাড়ি গ্যারেজে তুলে দিতে! সে স্কুটার গ্যারেজ করার পর বুদ্ধিমানের মত, রিনুদের ফ্ল্যাটের বেল বাজিয়ে ‘শুভর তো পায়ে বড় অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে; ওকে নিয়ে তো হাসপাতাল গেল সবাই’ ও জানিয়ে গেছে! এখনকার মত তখন মোবাইলের যুগ নয়! ছেলের কি হয়েছে, কতটা সিরিয়াস, কোন হাসপাতালে তাকে নিয়ে গেছে-কিছুই না বুঝতে পেরে মা তখন অসহায়ের মত দরজা খুলে রাস্তার দিকে তাকানো! ট্যাক্সি থেকে পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা ছেলেকে নামতে দেখে ডুকরে উঠেছিলেন তিনি! বড় হতে হতে রিনু আরো বেশকিছু অ্যাক্সিডেন্ট দেখে ফেললো… যার সব ক’টাই রিনুর জীবনের গতিপথকে ঘুরিয়ে দিল নতুন দিকে… যার হয়তো বা কলেজে পড়ানোই ছিল ভবিতব্য, সে যখন সতেরো বছর মিডিয়ায় টিঁকে যায়, তখন তাকে ‘অ্যাক্সিডেন্ট’ ছাড়া কিইবা বলা যেতে পারে!!! কেউ হয়তো বলবেন এ তো ‘মধুর’ সমাপতন! হয়তো তাই! আবার হয়তো নয়! অ্যাক্সিডেন্টের অনেক রকমফের থাকলেও, ইদানীংকালে কোথাও কোন অ্যাক্সিডেন্টের কথা শুনলেই রিনুর বুক ধড়াস করে ওঠে! যত বয়স বাড়ছে, ততই কিসের যেন ভয় দানা বাঁধছে রিনুর মনে! একেকটা ফিকে হওয়া ভয় মাঝেমধ্যেই চাগাড় দিচ্ছে কারণে-অকারণে! ছেলে বড় হচ্ছে, আর সব মায়ের মতই, তাকে এসবকিছুর থেকে বাঁচিয়ে রাখতে চায় রিনুও… মনে মনে সেও ভাবে যেন সব অঘটন, দুর্ঘটনা, তার উপর দিয়েই যায়; ছেলের গায়ে যেন এসবের বিন্দুমাত্র আঁচ না লাগে…’ভাবীকাল’ যেন সমস্তরকমের অ্যাক্সিডেন্টের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে নিজেকে তৈরি করতে পারে ভবিষ্যতের জন্য… সেই ভবিষ্যতও যেন হয় মসৃণ.. মনমতো…

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com