মেয়েটি আলোর নদীতে নেমেছিল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
কবি, গল্পকার,

নিয়ামত বলেছিলো, মেয়েটাকে তুলে আনা হয়েছিলো। কারা এনেছিলো নিয়ামত বলতে চায় নি। বার বার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো আমাদের পূর্বপাড়ার রমিজ আলী। বলতো নিয়ামত মেয়েটাকে কোথা থেকে তুলে আনা হয়েছিল। রমিজ আলীর প্রশ্ন শুনে প্রথমে একটু হাসবার চেষ্টা করেছিলো নিয়ামত। শেষে গ্রামের মরা খালের ওপর কালভার্টের রেলিংটার মাঝে ধরে বলে ছিলো আমি কি জানি, মেয়েটাকে কোথা থেকে তুলে আনা হয়েছিলো! শালারা মেয়েটাকে নিয়ে মজা করলো। তারপর কলার খোসার মতো ফেলে রেখে চলে গেল। আমি উত্তর পাড়ায় যাচ্ছিলাম। দেখলাম আধো আলো আধো ছায়ার মাঝে একটা মেয়ে কষ্ট করে হেঁটে হেঁটে আসছে। মেয়েটা যখন কাছে আসল, দেখলাম ও কাঁদছে। আমি ভেবেছিলাম মুচি পাড়ার কোন মেয়ে হবে। প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হয়। স্বামীর স্ত্রীর ঝগড়া বিবাদ তাদের মধ্যে লেগেই থাকে। আবার অনেক সময় মদের পয়সা কড়ি নিয়েও ওদের কাষ্টমারদের সঙ্গে মারদাঙ্গা হয়। এলাকার উঠতি মস্তানরা বিনা পয়সায় জোর করে চোলাই মদের বোতল নিয়ে যেতে চায় মুচি পাড়া থেকে। মস্তানদের কাছে পয়সা চাইলে মস্তানরা ওদেরকে গালাগালি ও মারধর করে। নিয়ামত ভেবেছিলো তেমন কিছুই একটা হবে। মেয়েটা যখন তার সামনে কাঁদতে কাঁদতে আসে, তখন নিয়ামতের কেন জানি মনে হয়েছিলো, মেয়েটা এই এলাকার নয়। শেষ বিকেলের আলোতে যেন মেয়েটার মুখ স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছিলো না। সে দেখেছিল মেয়েটা চোখের আর নাকের জল একাকার হয়ে আছে। তার পরিধানের জামাখানা ছেঁড়া এবং মুখখানা একেবারেই মলিন। নিয়ামত মেয়েটাকে দেখে যা বুঝবার বুঝে নিয়েছিল। তার অন্যকিছু বোঝার কারণও ছিল। মেয়েটার পায়জামায় চাপ চাপ কাঁচা রক্ত লেগে আছে। নিয়ামত প্রথমে অবাক হয়েছিল এই ভেবে যে, এতোটা অত্যাচারের চিহ্ন নিয়ে মেয়েটা তাকে কোন প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে বলেছিলো, পুরুষ গুলো সব কুকুর হয়ে গেছে।
নিয়ামত মেয়েটার কথা শুনে কি ভেবে যেন সন্ধ্যার আকাশের পানে তাকালো। তখন সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে। সে জানে একটু পরে পৌষের গোল চাঁদ আকাশে উঁকি দেবে। একসময় চাঁদের নরম আলো তরুণী রাত্রির অন্ধকারকে সমস্ত ভালবাসা দিয়ে মুছে দেবে। কিন্তু চাঁদের নরম আলো কি জগৎ সংসারের সকল অন্ধকারকে মুছে দিতে পারবে?
রমিজ আলী নিয়ামতকে থেমে যেতে দেখে বলল, তুমি কি মেয়েটাকে সেখানেই ফেলে রেখে এসেছিলে? তুমি ওকে ভাল মন্দ কিছুই জিজ্ঞেস কর নাই? নাকি বোবা হয়ে গিয়েছিলে!
রমিজ আলীর কথা শুনে নিয়ামত কেমন যেন হয়ে যায়। তারপরও সে রমিজ আলীর চোখের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিলের হাসি দিয়ে বলে, জিজ্ঞেস করেছি। ওর সব কথা জানার জন্য চেষ্টা করেছি। কোথায় থাকে। তার বাপ-মা’র নাম কি? কিভাবে সে এখানে এলো। মেয়েটা আমাকে কিছুই বলতে চায় নি। এক ধরণের ঘৃনা আর রাগ মিশ্রিত কন্ঠে আমাকে বলেছে, এখানে কোথাও গিয়ে কি হাত মুখ ধোঁয়ে একটু ফ্রেস হওয়া যাবে।
আমি তাকে বললাম আগে বলো তোমার নাম কি? তোমার এমন অবস্থা হলো কি করে?
আমার কথা শুনে মেয়েটা সমস্ত চরাচরকে কাঁপিয়ে যেন হেসে উঠে। তারপর বলে আমার ওপর কত গুলো বন কুকুর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। কুকুরগুলো কলেজে যাবার পথে আমাকে একটি সিএনজিতে পিস্তলের ভয় দেখিয়ে তুলে এনেছিলো। তারপর ওরা আমাকে নানা জায়গায় নিয়ে তাদের যা ইচ্ছা তাই করেছে। নিয়ামত বললো মেয়েটার কথা শুনে বুঝলাম, সে আমাদের এলাকার নয়। তারপর তার সঙ্গে অনেক কথা হলো। নিয়ামত ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে আরো বলেছিলো, মেয়েটাকে যারা তুলে এনেছিলো, তারা অনেক ক্ষমতাবান। তাদেরকে সবাই ভয় পায়। শুনা যায় থানা পুলিশও ওদেরকে একটু সমীহ করে চলে।
মেয়েটাকে যেসব বনকুকুরের দল তুলে এনেছিলো, তাদেরকে সে মানুষ বলতে রাজি হয় নি। নিয়ামত যখন মেয়েটার কাছ থেকে জানতে চেয়েছিল, যারা পিস্তল দেখিয়ে তুলে এনে তার এত বড় সর্বনাশ করেছে ওদের, নাম কি। তাদের ঠিকানাইবা কোথায়।
মেয়েটা বলেছিলো,আপনি কি জানেন না বন কুকুরের কোন নাম হয় না। পালা কুকুরের নাম হয়। আমাকে যারা তুলে এনেছিল তার মধ্যে দুটি পালা কুকুরও ছিল। ওদের নাম তো মানুষের মতো হতে পারে না। মানুষ হলেইতো মানুষ মানুষের নাম রেখে থাকে। গিয়ে দেখেন দুটি পালা কুকুরের মধ্যে একটি নাম হবে টমি, আরেকটির নাম হবে হয়তোবা অন্যকিছু। আমি কি ভুল বলেছি? ভেবে দেখুন আমি একটুও ভুল বলিনি।
মেয়েটার সাথে কথা বলতে বলতে কখন যে তরুণী রাত্রির বিমূর্ত নীলাভ আকাশে শহরের সুন্দরী মীরা দত্তের মুখের মতো গোল চাঁদ উঠেছে, তা সে বুঝতেই পারেনি। এবার পৌষের শীতের দাপট কম হলেও তার সামনে থাকা মেয়েটার দুঃখের কথা শুনে নিয়ামত যেন অনুভব করল ওর শরীর ঠান্ডায় কাঁপছে। মেয়েটা এতো দুঃখের মাঝেও তার চোখে জলন্ত আগ্নেয়গিরির আগুন ধরে রেখেছিল। তাই সে ভয় পাচ্ছিল মেয়েটাকে বলতে, এখনতো রাত হয়েছে। থানা পুলিশের কাছে কি এখনই তুমি যাবে।
কথা শুনে মেয়েটা হেসে হেসে বলে, আপনি যা বলেন! আপনি কি মনে করেন আমি এখন থানা পুলিশের কাছে যাব! আপনি কোথায় বাস করেন তা জানেন না? মেয়েটার অভিমানী কথা শুনে নিয়ামত বোকার মতই বলল, তাহলে কি তুমি আগে হাসপাতালে যাবে চিকিৎসা করাতে। কোর্ট কাচারী করতে হলে তো ডাক্তারের সার্টিফিকেট লাগে। আর যদি মামলা মোকদ্দমা নাও কর চিকিৎসাতো তোমার নিতেই হবে।
নিয়ামতের কথায় মেয়েটা কি বলবে ভেবে পায়না। অনেকটা সময় নিরব হয়ে থাকে। তার চোখে মুখে যেন চরম নিরবতার মাঝেও রাশি রাশি বেদনাময় বিষাদ ঘুরে বেড়াচ্ছে। মেয়েটাকে নিরব থাকতে দেখে নিয়ামত মৃদুস্বরে বলে, তুমি যে কিছু বলছ না?
মেয়েটা এবার নিরবতা ভেঙ্গে বলে ডাক্তারের কাছে যাব বলছেন। এখানে গিয়ে কি হবে। শুনাতো যায় টাকা পয়সা পেলে ডাক্তাররাও নাকি বিক্রি হয়ে যায় খারাপ মানুষের কাছে।
তারপরও নিয়ামত বললো, সব ডাক্তার আর পুলিশের লোক কি খারাপ কিংবা ভীতু হয়ে থাকে। এদের মধ্যে তো সাহসী মানুষও থাকে। যারা নিজের জীবন বিপন্ন করে মানুষের জন্য কাজ করে।
-কি যে বলেন চাচা! কোন বোকার রাজ্যে বাস করছেন জানি না। থানার পুলিশ আর হাসপাতালের ডাক্তার আমার ওপর যে অত্যাচার হয়েছে, তা নিয়ে যদি সঠিক পদক্ষেপ নিতে চায়, তাহলে তাদের অবস্থাও আমার মতো হবে।
-বুঝলাম তোমার ওপর যা হয়েছে, তা পৃথিবীর জঘন্য নিকৃষ্ট ঘটনার মতো একটা ঘটনা। তারপরও কি মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারানো আমাদের ঠিক হবে।
-চাচা আপনি ভালো মানুষ। সহজ সরল জীবন যাপন করেন। তাই সবকিছু সরল রেখায় দেখেন।
-মা আমার বয়স হয়েছে। অনেক পথ হেঁটে আমি বয়সের এই সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছি। আমি অনেক কিছুই বুঝি। কিছু করার ক্ষমতা নেই। তাই বোকার মতো জগৎ সংসারকে দেখে থাকি।
-তাহলে কেন বলছেন মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারানো ঠিক হবে না।
-বললাম এই জন্য যে, মানুষের কাছেই মানুষ আসে।
-তাহলে শুনেন চাচা। আমি ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করা মেয়ে। আমার পরিবারের লোকজনও শিক্ষিত। মেধা ও জ্ঞানে কারও চেয়ে আমি কম নই। আমি সবকিছুই বুঝি।
-তা তোমাকে দেখেই বোঝা যায়।
-শুনেন চাচা, যে সব বন কুকুর আর পালা কুকুরের দল আমার এত বড় সর্বনাশ করল, তাদেরকে যে সব ব্যক্তিরা লালন পালন করে থাকে, সেসব ব্যক্তিদেরকেতো মানুষ ভোট দিয়ে নেতা বানিয়ে থাকে। মানুষতো এসব নেতাদের বিশ্বাস করে ভোট দিয়ে থাকে।
-জগৎ সংসার থেকে বিশ্বাস হারিয়ো না। যা হয়েছে তা হয়েছে। তোমাকে তো বাঁচতে হবে।
নিয়ামতের কথা শুনে মেয়েটা রাগে ক্ষোভে প্রচন্ড গর্জন করে বলে, যাই। তবে আমি থানায় যাব না। আবার কোন সরকারী হাসপাতালেও যাবো না। কোন প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা করাতেও যাবো না। আমাকে দেখে মানুষ বুঝতে শিখবে, আমরা কোন অন্ধকারে বাস করছি। এটাই আমার ঘৃণা এটাই আমার প্রতিবাদ।
মেয়েটার মুখ থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বের হতে দেখে নিয়ামত ভয়ে ভয়ে বলে, এই রাতে তুমি কোথায় যাবে। আজকের রাতটা না হয় আমাদের মহিলা মেম্বারের কাছে থেকে যাও। আমি বললে আমাদের মহিলা মেম্বার তোমাকে জায়গা দেবে। এমনও হতে পারে তোমার ওপর যে অন্যায় হয়েছে তার প্রতিকারের চেষ্টাও করতে পারে।
অনেক সময় নিরব থাকার পর রমিজ আলী তার নিরবতা ভেঙ্গে বলে, নিয়ামত তুমি মেয়েটাকে একা একা যেতে দিলে। তোমার বুক কি একটুও কাঁপলোনা। তুমি আমাদের ডাকলে না।
রমিজ আলীর কথার উত্তরে নিয়ামত করুন সুরে বলে, আমি আর কি করবো। মেয়েটাতো আমার কোন কথাই শুনলনা। চলে গেল পৌষের জোৎস্নায় স্নান করতে করতে। মনে হলো আলোর নদীতে সে যেন সাঁতার কাটছে। নিজের শরীরে অন্যের দেয়া সব কলঙ্কের চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য।

ছবি:গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com