মা বাবারা সন্তানের জন্য কেবলমাত্র কিছু মুহূর্ত দিয়ে যান…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

ছোটবেলায়…। হাতেগোনা মাত্র ক’টা জায়গাই ছিল, ঘুরে ফিরে বেড়াতে যাবার। দূরের বেড়ানোয় বেশ নতুন নতুন জায়গা দেখার সুযোগ হত; কিন্তু সপ্তাহান্তে বেড়াতে যাওয়া মানেই, হয় ঠাকুমা-বাড়ি, নাহলে ফার্ণ রোডে বইয়ের দোকান। ঠাকুমাবাড়ি যেতে অবশ্য রিনু-শুভ ভালোইবাসতো; আর বইয়ের দোকানে যেতে না চাওয়ার কোন কারণই ছিলনা ! তবে এই দুইয়ের বাইরেও মাঝেমধ্যে যেতে ইচ্ছে হতো বইকি!

ঠাকুমাবাড়িতে ঠাকুমা তো ছিলই, ছিল সোনাকাকা,কাকিমা আর ছোট ভাইরাও। তখন (এখনও খানিক তাই; বিশেষ করে বিজয়া করতে গেলে..) ঠাকুমাবাড়ি যাওয়া মানেই ছিল জেঠামশাইয়ের বাড়িও যাওয়া। গলির মুখের তিনতলা বাড়িটার উপরের তলাতেই তো জেঠামশাইরা থাকতো তখন । জেঠামশাই সবসময় বাড়ি থাকেনা; থাকে জেঠিমা, দিদিরা আর লাল্টুবাবু মানে ভাই।

দিদিদের প্রতি ছোট থেকেই রিনুর অপার মুগ্ধতা। তার চার দিদিই কি-ই সুন্দর! যেমন সুন্দর মুখশ্রী, তেমনই টকটকে গায়ের রঙ। লেখাপড়াতেও সব্বাই দারুণ। রিনুর মা বলে সব্বাই রত্ন; রূপে গুণে সেরা। সত্যিই তাই; রিনুর সব দিদিই বড় ভালো। ওইবাড়িতে রিনু ঘন্টার পর ঘন্টা থাকতে পারে; এমনিতে অবশ্য তার ‘ঘরকুনো’ বদনামও শোনা যায়। ‘নিজ গৃহকোণ’টির বাইরে কোন জায়গাই তাকে বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারেনা।

বড়দি, মেজদি, বিছুয়াদিদি মানে সেজদি সকলের সঙ্গেই রিনুর ভাব, তবে ছোট্ দিদির সঙ্গে রিনুর আলাদা টান।  রিনু ডাকে জোনমণি; কেন দিদি ডাকেনা, জানেনা।  জেঠিমাও তাকে ওই নামে ডাকে; অন্য দিদিরাও। রিনুও সবার মত জোনমণিই ডাকে তার সব চাইতে প্রিয় দিদিকে।  জোনমণির সঙ্গেই রিনুর অফুরান গল্প; হাসিঠাট্টা থেকে বড় হওয়ার প্রায় সব ধাপেই জোনমণিই রিনুর সবচেয়ে কাছের… দিদি হলেও তার ভালো বন্ধু। জোনমণির সঙ্গে ঝগড়া-আড়ির কথা মনে আসেনা; কখনোই হয়নি সম্ভবত।

দিদিদের বাড়ির বিকেলগুলো বড্ড মনে পড়ে।  তখন বিকেল মানে অকারণ হাসি গল্পই ছিল।  তখনও বিকেল হলেই অযথা মন কেমন হতনা।

একেক রবিবার, ট্রামে চড়ে রিনুরা যেত গড়িয়াহাট। ট্রাম থেকে নেমে টুকটুক করে হেঁটে হেমন্তকাকুর বইয়ের দোকান। হেমন্তকাকুর ফুটপাথে সাজিয়ে রাখা বইয়ের মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া মণিমুক্তো। ফিরতি পথে আবারো টুং টুং ট্রাম… বহু বছর হয়ে গেল রিনু আর ট্রামে চড়েনা। প্রায় বছর দশ আগে পুত্রকে ‘ট্রাম’ চড়ানোর দৌলতে শেষবার রিনু ট্রামে চড়েছে।

মাসে তখন একদিন নিয়ম করে বাইরে খেতে যাওয়া হত ।  বাবাই বরাবর চাইনিজের ভক্ত। তাই নানান চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ঢুঁ মারা হত সপরিবারে। একটু বড় হবার পর বাড়ির কাছেই আনোয়ার শাহ্ রোডে খুললো ‘ডিম্ সাম্’.. রিনুদের দারুণ মজা। বাড়ি থেকে যাকে বলে ঢিল ছোঁড়া দূরত্ব; পাঁচ মিনিট হেঁটে ঢুকে পড়া যায়। এখন তো পায়ে পায়ে রেস্টুরেন্ট; কথা নেই বার্তা নেই আমরা সেলিব্রেট করার কথা ভাবি। রিনুদের ছোটবেলাতে কিন্তু ঠিক এমন ছিলনা। রিনু আর শুভর কাছে মাসান্তের এই ‘খাদ্যাভিযান’ তাই ছিল আলাদা আকর্ষণের । সবসময় যে নিজেরা একলা যাওয়া হত তাই নয়; অতিথিদের নিয়েও যাওয়া হত। আর যাওয়া হত বাবাই মায়ের বন্ধুদের সঙ্গে। বাবাই, জয়কাকু, শিশিরকাকু, কাকিমারা, টুসি, তিতির আর আমরা মিলে সে এক দারুণ হইহই। বাবাই তখন দুর্গাপুরে পোস্টেড। শনিবার বাড়ি ফেরেন; তিনবন্ধু মিলে সেদিন খেতে যাবার প্ল্যান। বালীগঞ্জ ফাঁড়ির কাছের এক চাইনিজ রেস্টুরেন্টে মা রিনু-শুভকে নিয়ে পৌঁছে গেছে। জয়কাকুরা, শিশিরকাকুরাও এসে গেছে; বাবাই আর আসেনা। সবাই ছট্ ফট্ করছে; মনে আছে বেশ অনেকক্ষণ পরে পৌঁছলো বাবাই। হাওড়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে দৌড়ে আসতে গিয়ে পড়ে  বাবাইয়ের হাঁটুতে চোট লাগে সেদিন। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে বাবাই পৌঁছলো ঠিকই, আনন্দ করে খাওয়া আর সেদিন হলনা। অসহ্য যন্ত্রণায় ততক্ষণে বাবাইয়ের মুখ কালো। সবাই মিলে বাবাইকে নিয়ে যাওয়া হল ‘রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠান’। এমারজেন্সিতে ডাক্তার দেখে খুব সম্ভবত ব্যান্ডেজ করে দিয়েছিলেন।  এরপর বেশ কিছুদিন বাবাই ছিল শয্যাশায়ী। বাথরুমে যেতে লাঠিতে ভর দিতে হত। যথারীতি বাবাইয়ের কষ্টে রিনু কেঁদে ভাসিয়েছিল..

পুজোর সময় বাইরে খেতে যাওয়া রিনুদের ছিল বাধ্যতামূলক। রিনুর মনে আছে, সেই কোন ছোটবেলায় মা বলেছিল, ‘সারাবছর রান্না করবো, পুজোর চারদিনও তাই? ব্যস্, তারপর থেকে সপ্তমী অষ্টমী নবমী এবং দশমী মানেই সকাল সকাল মায়ের বানানো লুচি তরকারি মিষ্টি সহযোগে জলযোগ সেরে নিয়েই বেরিয়ে পড়া। কলকাতার এপ্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঠাকুর দেখার পর পছন্দের রেস্টুরেন্টে পেটপুজো। পিপিং, লা জিজ, এমব্যাসি আরো কত কত পছন্দের রেস্টুরেন্ট। তখনকার পুজোর দিনগুলো হতো অন্যরকমের রঙিন। সে গল্প বলবো কখনও পরে। একবার দক্ষিণ কলকাতার কিছু ঠাকুর দেখার পরে এলগিন রোডের লা জিজে ঢোকা হল। প্রচুর ভিড়; (তবে এখনকার ভিড়ের কাছে তা নস্যি) .. অপেক্ষার পরে বসার জায়গা পাওয়া গেল। সেবার সঙ্গে মামী, দিদিভাই। প্রতিবারই পুজোর দিনগুলোতে কেউ না কেউ থাকতো রিনুদের সঙ্গী। সেবার দাদামণিও ছিল কিনা মনে নেই। রিনু দিদিভাই পাশাপাশি বসে। হঠাৎ দিদিভাই ডেকে বললো ‘দেখ ওদিকের মেয়েটা ঠিক আমার মত জামা পরেছে’.. এদিক ওদিক খুঁজে রিনু খেয়াল করলো দিদিভাই দূরের আয়নায় নিজেকেই দেখেছে, বুঝতে পারেনি। তা নিয়ে খুব এক চোট হাসাহাসি হয়েছিল।

রেস্টুরেন্ট ছাড়া ছোটবেলার আরেকটা পছন্দের বেড়াতে যাবার জায়গা ছিল , মায়ের অফিস। টেলিফোন ভবন। বাবাইয়ের অফিসেও গেছে রিনু, কিন্তু মায়ের অফিসের প্রতি তার কিঞ্চিৎ দুর্বলতা।  তখন মুখে না বললেও, এখন স্বীকার করাই যায়। মা ছিল ইন্টারন্যাশনালে; বিশাল একটা ঠান্ডা ঘর। ভারি একটা দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতে হতো; ভিতরে পরপর সবাই বসে একমনে কাজ করে। লাল সবুজ হলুদ আলো আর পিঁপ পিঁপ আওয়াজ।  এখনকার ঝাঁ চকচকে কেতাদুরস্ত অফিসের মত অফিস তখন হতনা। প্রচুর ফাইলপত্র, কাগজের তাড়ার মধ্যে বসে কাজ করাই তখন দস্তুর ছিল। তারমধ্যে রিনুর মায়ের অফিস ,আলাদা সম্ভ্রম আদায় করে নিত অনায়াসে। নানা উপলক্ষ্যে মা , রিনু-শুভকে নিয়ে যেত অফিসে। এই মাসি, ওই মাসির কাছে কুটুর কুটুর গল্প করে, ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়াতো দুভাইবোনে। ক্যান্টিন থেকে এটা ওটা কিনে দিত মাসিরা। বাড়িফেরার সময় হাত উপচে পড়তো ভালোবাসায়। মঞ্জুমাসি, শিপ্রামাসি,  নন্দিতামাসি, নিবেদিতামাসি, গীতাঞ্জলীমাসি আরো কত কত মাসি; তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দেখা হত মায়ের অফিস পিকনিক বা লেডিস ক্লাবের সরস্বতী পুজোয়। কত কত অফিসতুতো ভাইবোন বন্ধু যে এভাবেই পেয়েছিল রিনু-শুভ। এমনি সময়ে বাইরের কাউকে টেলিফোন ভবনে ঢুকতে দেওয়া হতনা। কিন্তু সরস্বতী পুজোয় থাকতো অবারিত দ্বার। টেলিফোন ভবনের লেডিস ক্লাবে হত দারুণ সরস্বতী পুজো। দুপুরে সবাই মিলে ভোগ খাওয়া ছিল সবার খুব পছন্দের। মনে আছে একবার সরস্বতী পুজোয় মায়ের অফিস থেকে বেরিয়ে সারাটাদিন রিনু বাবাইয়ের হাত ধরে ঘুরে বেরিয়েছিল বইমেলায়। তখন বইমেলা হত ময়দানে…. লেডিস ক্লাবের অ্যানুয়াল প্রোগ্রামও হত দারুণ ভালো। কত ভালো ভালো নাটক, নৃত্যনাট্য, গীতিনাট্য। মা ছিলেন লেডিস ক্লাবের অ্যাক্টিভ মেম্বার। মনে আছে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে সেটা দেখতে যাওয়াও ছিল রিনুদের ছোটবেলার বেশ বড় ইভেন্ট।

কত ছোট ছোট মুহূর্ত যা ছোটবেলায় ছিল জীবনের বড় একটা অংশ জুড়ে। এখন বড্ড মনে পড়ে; রবিবারের বিকেল সন্ধ্যেয় ঠাকুমার কাছে গিয়ে, ঠাকুমার হামানদিস্তায় ছেঁচা খয়ের দেওয়া পানে ঠোঁট রাঙানোর দিনগুলো কবে যে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেল! কবে থেকে যে আর এক জোড়া চোখ রিনুর দিকে সপ্তাহ শেষের বেড়াতে যাওয়ার অপেক্ষা নিয়ে তাকাতে শুরু করলো। ভাবলেই অবাক লাগে; কিছুদিন আগে দেখা একটা সিনেমায় রিনু শুনেছিল, মা বাবারা সন্তানের জন্য কেবলমাত্র কিছু মুহূর্ত দিয়ে যান। সেটুকুই তারা সারাজীবন সঙ্গে রাখে। রিনুকে তার মা বাবাই তেমন মুহূর্ত দিয়েছেন অগুন্তি। রিনু তার ছানাকে তা দিতে পারে কিনা, এখন সেটাই দেখার।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com