মার ঘুরিয়ে এখন আমাদের সবার গান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের শততম টেস্ট ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে বিজয়ে ভাবলাম পুরানো দিনে ফিরে যাই। ২০১১ এর বিশ্বকাপ ক্রিকেট। আবেগ- থৈ থৈ সময় আর থিম সং মার ঘুরিয়ের গল্পটা বলি।

আমার প্রথম প্রকাশিত বই-আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে-তে মার ঘুরিয়ে-র গল্প করেছিলাম অনেক আনন্দ নিয়ে। বইটা ছিলো লিরিক ও লিরিকের পেছনের গল্প নিয়ে। সেখান থেকেই সম্পাদনা করে নতুন করে প্রাণের বাংলার পাঠকদের জন্য।

শেখ রানা

শেখ রানা (এডিনবরা, স্কটল্যান্ড থেকে)

কবির তখন সওদাগরী মন…

মাস ছয়েক আগে শীর্ষস্থানীয় এক বিজ্ঞাপনী সংস্থায় যোগ দিলাম দুরু দুরু বক্ষে। আমার গন্ডি খুব ছোট। সবুজ, আকাশ, বৃষ্টি , লিরিক আর আমি। এর বাইরে গত প্রায় বছর দুয়েক আক্ষরিক অর্থেই আমার কেউ ছিলো না। একটা লম্বা সময় বোহেমিয়ান এদেশ- ওদেশ কাটিয়ে শুধুমাত্র গান লেখার তাগিদে দেশে ফিরে এসে প্রথমবারের মত আমি খানিক দ্বিধাগ্রস্থও বটে।  খাস বাংলায় প্রশ্ন করি নিজেকে, ‘ কিরে ব্যাটা, ক্যামনে কি! ‘
মাথার ভেতর শব্দ নিয়ে ঘোরা মানুষ আমি, হঠাৎ ঝা চকচকে অফিসে কাজ শুরু করে ভ্যাবদা মেরে যাই খানিক। প্রথম দিন ডেস্কে বসে লিখে ফিলি, ‘ কবির তখন সওদাগরী মন, হিসেব অংকে বিকেল আততায়ী…’
লিরিকেই থেকে যাই নিজের অজান্তেই।

মজার ব্যাপার হলো,কিছুদিন যেতেই আমার ভালো লাগতে শুরু করে বিজ্ঞাপন লেখার কাজ । সবচেয়ে যে জিনিসষটা আমাকে সুখানুভুতি এনে দিলো- আমি একদম নির্ভার হয়ে লিরিকে মন দিতে পারলাম। লিরিক লিখে রেমুনারেশন এর জন্য চাতক পাখি হয়ে থাকতে হলো না আর!

২০১১ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

বিজ্ঞাপন, জিংগেল, ক্লিওপেট্রা আর…

একটু একটু করে ঢুকে যাই বিজ্ঞাপন জগতে। অফিসের সবাই খুব ভালো…বন্ধুতা গড়ে ওঠে অনেকের সঙ্গে। পুরোনো বন্ধুরা মাঝে মাঝেই খোঁজ নেয়, ‘ দোস্ত, ঘুম থেকে উঠতেছিস তো ঠিকমতো?’ , ‘ কস কি ব্যাটা! তুই চাকরিতে ঢুকছোস ‘ , ‘ রানা, টাইমটা মেইনটেইন কর ‘ …এ রকম অনেক কথার আন্তরিকতায় এক এক দিন গড়ায়। আমি আমিই থাকি, বদলাইনা। জিঙ্গেল লিখি, বিজ্ঞাপনের কপি লিখি। ভালো লেগে যায়….

আমি খেলাপাগল ছেলে। অফিসের ভিতর টিটি বোর্ড দেখে দারুন মজা পেয়ে যাই। কাজ না থাকলেই আমি টিটি বোর্ডে। খেলা, লেখালেখি, ছাদে সিগার ব্রেক আর অফিস থেকে বের হয়েই শব্দ খোঁজার সেই পুরোনো অভ্যাস- জীবন সুন্দর হয়েই ধরা দেয় আমার কাছে। একদিন দেখা হয়ে যায় ক্লিওপেট্রা-র সঙ্গেও। লিখে ফিলি, ‘ তোমার জন্য নেফারতিতি’…

গত সপ্তাহের অলস এক দুপুরে…

বসে আছি। মারুফ ভাই এর ডাক- ‘ রানা, এই কাজটা করে দে ভাই।’ কাগজ হাতে নিয়ে দেখি হিন্দি তে কি কি যে হিজিবিজি লেখা। আমি মনে মনে বলি ‘ হোলি কাউ। ‘ জানতে পারলাম এটা হলো আই সি সি-র বিশ্বকাপ থিম সং এর হিন্দি ভার্শন। সঙ্গে খুব অদ্ভুত শব্দচয়নে বাংলা ট্রান্সলেশন-ও করা। মারুফ ভাই এর কথা অনুযায়ী আমাকে এই বাংলাটা ঠিকঠাক করতে হবে। মিউজিক ট্র্যাক- টা মুম্বাই এর শঙ্কর-এহসান-লয় এর করা। আগ্রহ নিয়ে শুনলাম। খেলা বিষয়ক যে কোনো ব্যাপারে আমার আগ্রহ সীমাহীন। তো শুনলাম, ভালোই লাগলো। কিন্তু বাংলাটা দেখে আমি আবারও মনে মনে বলি,’ হোলি কাউ।’ কয়েক লাইন তুলে দেবার লোভ সামলাতে পারলাম না। কিছু ভার্স ছিলো এ রকম-

ডুব সাতারে পেড়িয়ে সাগর,

দুনিয়াকে লেটস শো আওয়ার ড্রিম
হাল্লা গুল্লার খুশীর বৃষ্টি,

ভাসিয়ে দেবে ঝম ঝমা ঝম
চল খেলোয়ার, ওয় রে ওয় রে…

আমার হাত মাথায় ! এই জবরজং ঠিক করবো কিভাবে!

২০১১ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

মন খারাপের একটা দিন…

প্রচন্ড মন খারাপ নিয়ে বাসায় ফিরি। আমাদের দেশে হবে বিশ্বকাপ, তার থিম সং করছে ইন্ডিয়া, আচ্ছা মানলাম এই থিম সং তিন ভাষায় হবে কিন্তু তাই বলে এর বাংলাটাও ওরা করবে, আর এই হবে তার বাংলা !

পরদিন অফিসে ফিরে মারুফ ভাইকে বিনয়ের সঙ্গে জানাই যে এটা আমার পক্ষে সম্ভব না কিছুতেই। আমি করতে পারবো না। মারুফ ভাই বুঝতে পারে আমার মনের অবস্থা। খানিক জোরাজুরি করে ফিরে যায় ডেস্কে। আমি চুপচাপ বসে মিনিট পাঁচেক ভাবি। উঠে দাড়াই। মারুফ ভাই এর ডেস্কে যেয়ে বলি,

 ‘একটা কাজ করতে পারি। আমি একদম আমার মত করে এই ট্র্যাক এর উপর নতুন একটা গান লিখে দিবো। কিন্তু কারেকশন! কিছুতেই না…’

মারুফ ভাই খানিক দ্বিধাগ্রস্থ। আমাকে নিয়ে যায় শাওন ভাই এর কাছে। শাওন ভাই যেহেতু বস, সেহেতু উনার ডিসিশন ফাইনাল।

‘ ধুরো, এইটা কিছু হইলো ওয় রে ওয় রে…তুই তোর মতো লেখ।’

শাওন ভাই এর কথায় আত্মবিশ্বাস পাই।

২০১১ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান করছেন সনু নিগম

এক মুহুর্ত-ও নষ্ট না করে ফিরে আসি ডেস্কে। একটানে লিখে ফেলি ‘ জিতবে এবার জিতবে ক্রিকেট’। কি যে আনন্দ নিয়ে গানটা আমি লিখেছি, এটা আসলে লিখে বা বলে বোঝানো সম্ভব না।

তারপর….

গান লেখা শেষ হলে যা হয় আর কি। লেখা আমাকে ছেড়ে চলে যায়… আমিও ডুব দেই বিজ্ঞাপনের ভাষায়। ভাবনায় আকুপাকু শুরু হয় বৃষ্টি নিয়ে একটা লিরিক লিখবো বাপ্পা ভাই এর জন্য।
দুই-তিন দিন পর ফোন। শাওন ভাই এর।
‘ তোর মোবাইলে ফোন আসবে মুম্বাই থেকে।স্টুডিও থেকে  রাঘব চ্যাটার্জি তোর সঙ্গে কথা বলবে।’

আমি সত্যি ভুলে গিয়েছিলাম পুরো ব্যাপারটা।

কথা হয়ে রাঘব এর সঙ্গে।

সেদিন বিকেলে অপার্থিব আনন্দে পাখি হয়ে যাই। অফিসের কলিগদের আন্তরিক অভিনন্দনে খুব ভালো লাগে আমার।

মনে মনে ভাবি, এটা আমাদের সবার বিজয়। আমাদের ভাষায় আমাদের গান…

গান চলে আসে ২-৩ দিন পরেই। শুনি। আমার ভালো লাগে। সবার প্রথমে জানাই বাপ্পা ভাই কে। ধীরে ধীরে বন্ধু, কাছের মানুষদের। গানটা ভালো লাগতে শুরু করে সবার।

মার ঘুরিয়ে আমাদের সবার গান হয়ে যায়।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com