মানুষ বন্ধুত্বে ভাঙ্গন ধরায়, প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্বে তা হয় না

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
শেখ রানা

শেখ রানা, গোর্গি রোড,এডিনবরা, স্কটল্যান্ড

গান লেখার গল্প। গীতিকার হবার উপাখ্যান।সে গল্পও মন্দ নয়।কেবল তাকে পেছনে ফেরানো। ফিরে তাকালে মনে হবে খুলে গেছে আস্ত এক জাদুর বাক্স।উনিশ বছর পূর্তিতে ভাবলাম গান লেখার গল্প হোক কিছু। ইদানিং অনুজ গীতিকারদের জানতে চাওয়া কিছু প্রশ্নের উত্তরও হয়তো এসে যাবে আলগোছে।এভাবেই আমাদের প্রাণে বাংলায় শুরু করলেন গীতিকার শেখ রানা তার গান লেখার গল্প

আগেও বলেছি, এখনও বলি আমি অশিক্ষিত গীতিকার। আমার জানার পরিধি অনেক কম। আমি ভাবনার কুয়াশায় এক ধরনের সুররিয়াল দৃশ্যকল্প দেখতে দেখতে লেখার বৃত্তে ঢুকেছি। আনন্দ নিয়ে ঢুকেছি, তারপর হাসিমুখে ঘুরপাক খাচ্ছি।

ধৈর্য পরম গুণ। লিরিক গান না হলে হতাশ হবার কোনো কারণ দেখি না। বরং সেই শূন্যতা-কে শব্দে ধরা যায় একান্তে। সেই শব্দগুলো ধীরে ধীরে লিরিক হয়ে ওঠে গীতিকবির অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য্যে, নতুন শব্দচয়নের সযত্ন ব্যবহারে আর দৃশ্যকল্প সাজানোর পারঙ্গমতায়।

আমার প্রথম লিরিক কিন্তু প্রায় এক বছরের মাথায় ক্যাসেট বন্দী হয়েছে। সেই লিরিকটা ছিল- বিশ্বাসেতে বস্তু মেলায়। বাপ্পা ভাই এর রাতের ট্রেন অ্যালবামে। ওই এক বছর আমি অনেক সময় কাটিয়েছি বাপ্পা ভাই এর সঙ্গে, স্টুডিওতে। সেই সময়টা খুব অন্যরকম। খানিক ছটফটে ছিলাম বটে, কিন্তু ভালো লিরিক লিখবো এই আগ্রহ ছিল অপরিসীম। সেই সময়ে বা তার আরো পরে অনেক লেখা খুব কাঁচা হাতের হয়েছে, আমি জানি…কিন্তু এও বলে রাখি অনুশীলন, ভালো লিখতে চাওয়ার অদম্য আগ্রহ একটা সময় গীতিকবিকে ব্যাক্তিত্ব দিবে লেখায়, শব্দচয়নে পরিমিতি বোধ এনে দিবে।

এ জন্যই একজন গীতিকারের ধৈর্য আর মনোযোগ ধরে রাখা- এ দুই খুব গুরুত্বপুর্ণ।আমি রাজশাহী বি আই টি-তে পড়তে যেয়ে পড়া শেষ না করে গীতিকার হবো বলে ঝোলা কাঁধে বেরিয়েছিলাম। ঘুরে বেড়াতাম নাটোর থেকে পাবনা, সিরাজগঞ্জ হয়ে শাহজাদপুর। চলে যেতাম দিনাজপুরে। সে এক বোহেমিয়ান জীবনের অদ্ভুত গল্প। সে গল্পে অনেক কষ্ট আছে। অনেক বিড়ম্বনা আছে। কিন্তু সে গল্পে মুঠি মুঠি জীবনও আছে, জীয়নকাঠি আছে। সেই জীবন থেকে লিরিক হবার প্রনোদনা আছে। লিরিকের গান হয়ে ওঠার সুর আছে অকৈতব।

আমি আকাশ দেখে কাটিয়েছি লম্বা সময়। শুনতে অবাক শোনাবে। সত্যি সত্যি আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কৈশোর থেকে বৃষ্টির সঙ্গে বন্ধুতা হয়েছে আমার নিবিড়। বৃষ্টিও পরম মমতায় আমার লিরিকে উঠে এসেছে বারবার। প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুতা গীতকবির পরম সম্পদ।

মানুষ বন্ধুত্বে ভাঙ্গন ধরায়, প্রকৃতি কখনও নয়। এই ভালোবাসা থেকেই গান হয়েছে- খোলা আকাশ, একটি গাছ/ সবুজ পাতা, একটি গাছে/ স্মৃতির বৃক্ষ, পাতারা জানে/ মেঘের চাষবাস…

নানা উত্থান,থমকে যাওয়া এবং খানিক পতনে আমি কিছুটা সময় মুষড়ে পড়েছিলাম। কিছুটা এলোমেলো হয়েছিলাম। কিন্তু সেই প্রতিকূল সময়েও শব্দ ধরতাম। এই যে গীতিকারের জীবনে নানা বাঁক- সেই বাঁকে নিজের লক্ষ্য বিচ্যুত না হওয়া যাক বরং। ধীর লয়ে সবার অলক্ষ্যে নিভৃতচারী হয়ে লেখায় থাকি বরং। লেখা আটকে গেলে, চলো বেরিয়ে পড়ি শহর থেকে শহরতলীতে। শব্দ খুঁজি আকাশ, বৃষ্টি আর সবুজের কাছে। শব্দ খুঁজি ওভার ব্রিজ, নিয়ন আলো আর ঘর ফেরা ক্লান্ত নাগরিকের কাছেও।

আমি গীতিকার। এই কথাটা আমি খুব আনন্দ নিয়ে বলি। আমার অনুজ গীতিকারদের ভেতর সেই আনন্দ সংক্রমিত হোক।

ছবি: শাহানা হুদা

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com