মানুষ চায় ফেলে আসা মাটি আর ছেড়ে যাওয়া মানুষ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আনসার উদ্দিন খান পাঠান

জেএফকে এয়ারপোর্ট নিউইয়র্কে নেমে আমার জাতিসঙ্ঘ শান্তিমিশনে কাজ করার পরিচয়পত্র তুলে ধরা সত্বেও স্রেফ পাসপোর্টের রং দেখেই অভিবাসন কর্মকর্তা আমাকে আরো পরীক্ষার জন্য লাইনের বাইরে দাঁড়াতে বললেন , বাকিরা সবাই আমাকে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখলো। বুঝলাম আমি অনাহুত । লন্ডনে অক্সফোর্ড স্ট্রীট থেকে হোয়াইট চ্যপেলে যাবার জন্য কচ্ছপ ট্যাক্সির ড্রাইভারকে বললাম , উঠার আগে সে আমার আপাদমস্তক দেখে বললো এত অনেক পাউন্ডের ব্যাপার তোমার কাছে আছে ? বুঝলাম এ শহরে থাকার মত জেল্লা আমার গাত্রবর্নে নেই ।

এঙ্গোলার লুয়ান্ডা এউএন ক্যাফেতে পার্টির সময় যখন শুকরের মাংস আর মদ ফিরিয়ে দিতাম আঁটসাঁট তরুণী ওয়েটাররা চোখ বড় করে তাকাতো । বুঝতাম আমি অচেনা প্রজাতির মানুষ । বসনিয়ার সারায়েভোর টার্কিস রেস্টোরেন্টের বাইরে মাইনাস তাপাঙ্কে ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে সবাই যখন ভদ্রতা জ্ঞানে হ্যাঙারে কোট ঝুলিয়ে টেবিলে বসতো আমি তখন অভদ্ররের মত সেটি গায়েই রেখে দিতাম আর কৃত্রিম উত্তাপের মাঝেও দিব্বি কাঁপতাম । বুঝতাম এ জলহাওয়া আমার নয়। সুদানের দক্ষিণে যুদ্ধতাড়িত প্রত্যন্ত আলজেনিনার মরুতে প্রচণ্ড তাপে গাধার পিঠে করে ছোট ছোট বাচ্চারা যখন দিব্বি চলে যেতো আমি তখন একটু ছায়ার আশায় বড় পাথরখন্ডের নীচে বসে হাঁসফাঁস করতাম , ওরা আমাকে দেখে হাসত , আমার গায়ের অদ্ভুত বাদামী রং দেখিয়ে ওরা ঠাট্টা করতো ।

বুঝতাম এই উত্তপ্ত ধূলিময় বিবর্ন মাঠ আমার নয়। কসভোর প্রিষ্টিনায় এউএন ক্লাবে আমার জার্মান কলিগ উয়ে যখন আমারই অফার করা ক্যাপাচিনোতে চুমুক দিয়ে বলতো , শুনেছি তোমার দেশে লোকজন বস্তিতে থাকে , খোলা আকাশের নিচে প্রাকৃতিক কর্ম সারে , সেটি কি সত্যি ? বুঝতাম এই ধবল চামড়ার লোকটির পছন্দের মাপে গর্ব করার মত তেমন কিছু আমার নেই। ইংল্যান্ডের নরউইচ শহরের ছোট্ট পাবে কাজ করা তৃতীয় প্রজন্মের ব্রিটিশ যুবক যার পুর্ব পুরুষ এসেছে সিলেট থেকে, যে কখনো পুর্বপুরুষের ভিটে দেখেনি ।

আমার সাথে পরিচয়ের পর তার সে কি আবেগময় হাহাকার, একবার অন্তত জীবনে সে জগন্নাথপুর যেতে চায়। তার যথেষ্ট আয় নেই , জানেও না ভাল করে ওখানে এখন আত্মীয় কারা আছে , তবু যেতে চায় । বুঝলাম প্রজন্মান্তরেও দূরদেশ কখনো নিজ দেশ হয় না। পরবাসী অপাঙতেয় এই আমি যখন চলতি হেমন্তে ব্রম্মপুত্র-পাড়ে নক্ষত্রপুঞ্জের মত ফুটে থাকা কাশবন পেরিয়ে আমার গ্রাম কাজলায় গেলাম কতজন যে আমাকে বুকে টেনে নিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। পূবপাড়ার সাত্তার মিয়া সড়কের পাশে লাগানো তার বাগান থেকে কলা পেড়ে দাওয়ায় পিড়ি টেনে আমার হাতে দিয়েছে , সাথে এক মগ গরম দুধ ।

কান্দারবাড়ির বাল্যবন্ধু অমরচন্দ্র তার গাছের একটা পাকা পেঁপে আর সাথে কটি ভাপা পিঠা দিয়ে গেছে । প্রতিবেশী কালাম ভাই জোর করে বাড়ির ভেতর নিয়ে গিয়ে ভাবির হাতের রান্না করা চালের রুটি আর কবুতরের মাংস খাইয়েছে । একসময় শীতবিকেলের নরম তেরসা আলোয় পারিবারিক গোরস্থানে গেলাম। মায়ের কবরটা ভরে আছে সাদা শিউলি ফুলে, গাছটা সেই কবে আমার হাতে লাগানো । পিতামহীর কবরের মাথায় দাঁড়ানো শেওড়া গাছের ঘন পাতায় কটি ছোট পাখি ডাকছিল , বুঝিবা আমার মত প্রার্থনা করতে এসেছে । সবুজ ঘাসের নিচে শুয়ে আছে আমার পূর্বপুরুষরা , বুকের কোনায় তাদের আদর স্পর্শ পাই। মাটির উপড়ে নিচে যাদের দেখি সব মনে হয় আমার মানুষ । এই আমার মাটি , এই আমার গ্রাম, এই আমার দেশ । পৃথিবীর সকল মানুষের একটি প্রিয় ভূখণ্ড থাকে, সেটি তার কাছে স্বর্গের কাছাকাছি । জীবিকা কিংবা ভাগ্যবদলের জন্য মানুষ শেকড়ের মাটি ছাড়ে । মরে যাবার সময় আবার সেই মানুষ ফিরে চায় ফেলে আসা মাটি আর ছেড়ে যাওয়া মানুষ। তার নিঃসাড় চোখে আঁকা হয়ে থাকে প্রিয় জন্মভূমি ।

ছবি:লেখক

 

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com