মানুষের মৃত্যুদিন হচ্ছে তাঁর সত্যিকারের জন্মদিন-সরদার ফজলুল করিম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘মানুষের মৃত্যুদিন হচ্ছে তাঁর সত্যিকারের জন্মদিন। কারণ জন্ম থেকে শুরু হওয়া সার্কিটটা সম্পূর্ণ হয় মৃত্যুতে এসে। মৃত্যুর পর একজন মানুষের পুরো পোট্রেটটা সামনে দৃশ্যমান হয়, তাই মৃত্যুই তাঁর আসল জন্মদিন’। -কথাগুলো বাংলাদেশের প্রখ্যাত দার্শনিক ও অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমের। এই মহান মানুষটি মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে হয়তো মানুষের জীবনের সেই প্রকৃত রূপের মধ্যে যাত্রা করেছেন কিন্তু আজ এই মানুষটির ৯২তম জন্মদিন। ১৯২৫ সালের পহেলা মে তিনি বরিশাল জেলায় জন্মগ্রহণ করেন।

জন্মদিনে প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে জ্ঞান পিপাসু মানুষটির স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

ভাই-বোনের মধ্যে চতুর্থ সরদার ফজলুল করিম ছোটবেলায় আক্ষরিক অর্থেই কৃষিকাজ করেছেন বাবার অনুগত সন্তান হিসেবে। লাঙল ধরেছেন বাবার সাথে, কিংবা মইতে চড়েছেন কৃষি জমির মাটি ভাঙার কাজে।

কাঠকয়লার গুড়ো পানিতে মিশিয়ে তৈরি কালি বাঁশের কাঞ্চিতে লাগিয়ে শুকনো তালপাতায় অ-আ-ক-খ’র হাতেখড়ি হয়েছিলো তাঁর এক পঙ্গু শিক্ষক লেহাজ উদ্দিন আহমদের কাছে, যিনি তাঁর দূরসম্পর্কের মামা হতেন। বড়ভাই মউজে আলী সরদার (পরবর্তীতে মঞ্জে আলী সরদার) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েও এম.এ. ডিগ্রী শেষ না করেই চাকুরী নিয়েছিলেন সাবরেজিস্ট্রার হিসেবে। তাঁর সাথে সাথে ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন স্কুল শেষে ক্লাস নাইনে এসে ভর্তি হন বরিশাল জিলা স্কুলে। থাকতেন হোস্টেলে। সন্ধ্যা রাতে হোস্টেলের আলো নিভে গেলে চুপি চুপি চলে যেতেন কীর্তনখোলার পাড়ে। বরিশাল নদী বন্দরের টিম টিমে গ্যাসের আলোয় পড়বেন বলে। সেখানে কুলি সর্দারের হাঁকডাক আর প্রতিপত্তিতে এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে ফেলেছিলেন বড় হয়ে কুলি সর্দার হবেন! তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে লাল-নীল ইস্তেহার পড়তেন। আর এই লাল নীল ইস্তেহার সাপ্লাই দিতেন Revolutionary Socialist Party of India (RSPI) এর এক সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী মোজাম্মেল হক। যার কাছ থেকে উনি পড়েছেন শরৎচন্দ্রের পথের দাবী। উজ্জীবিত হয়েছেন। এখান থেকেই রাজনীতির প্রভাব বলয়ে ঢুকে পড়েন তিনি। এভাবেই জড়িয়ে পড়েন প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে।

জ্ঞানপিপাসু বিপ্লবী এই শিক্ষাবিদের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় বৈচিত্র্যে ভরপুর৷ মনের লালিত আদর্শকে কখনো বিসর্জন দেননি তিনি৷ বরং প্রতিনিয়ত আরও দৃঢ় করেছেন৷ বৈপ্লবিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে চাকরি ছেড়েছেন, দীর্ঘ ৪ দফায় মোট ১১ বছর জেল খেটেছেন৷
সংক্ষিপ্ত জীবনী: সরদার ফজলুল করিমের জন্ম ১৯২৫ সালের মে মাসে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার আটিপাড়া গ্রামে৷ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে৷ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকায় এসে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে৷ উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনশাস্ত্রে বিএ অনার্স ও এমএতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন৷ ১৯৪৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন৷ ১৯৪৮ সালে রাজনীতির কারণে স্বেচ্ছায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় ইস্তফা দেন তিনি৷ ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমির অনুবাদ শাখায় যোগ দেন৷ মুক্তিযুদ্ধের পরে ১৯৭২ সালে তিনি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান৷

তিনি ২০১৪ সালের ১৫ জুন মৃত্যুবরণ করেন।
সরদার ফজলুল করিমের রচিত ও অনূদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে প্লেটোর সংলাপ, প্লেটোর রিপাবলিক, অ্যারিস্টটলের পলিটিক্স, রুশোর সোশ্যাল কনট্রাকট, পাঠপ্রসঙ্গ, চল্লিশের দশকের ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ, সেই সে কাল: কিছু স্মৃতি কিছু কথা, নানা কথা, নানা কথার পরের কথা এবং নূহের কিসমত ইত্যাদি৷ এ ছাড়া ‘দর্শনকোষ’ নামে দর্শনের একটি অভিধান লিখেছেন তিনি৷
সরদার ফজলুল করিম বাংলা একাডেমির পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন৷

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com