মানুষের পাগল হয়ে যাওয়াটা এক রহস্যই

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

 

রিপন ইমরান, সাংবাদিক

ভাই কি ব্যস্ত??? নাহ্…কেনো??? একটু কথা ছিলো…অফিস কলিগের এই টাইপের কথোপকথনে বরাবরই আমার অস্বস্তি হয়…বিশেষ করে মাসের শেষ দিকে…এ সময় সবার হাতই প্রায় ফাঁকা থাকে…তাই সকলেই একজন দেবদূত খুঁজতে থাকেন, যিনি খুব সামান্য কটা টাকা ধার দিতে পারেন…এটা অনেকটা বিস্কুট দৌড় প্রতিযোগিতার মতো…দৌড়ে অংশ নিয়েছে ১০ জন তবে বিস্কুট মোটে ৫টা…মধ্যবিত্ত দরিদ্র শ্রেণীর অফিসে যাদের কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তারা নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে এ ব্যাপারে একমত হবেন…

কাউকে টাকা ধার দিতে আমার আপত্তি নেই…কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমার নিজেরই হাত একেবারে খালি…তাই কেউ টাকা ধার চাইলে যখন বলি ভাই দিতে পারছি না, তখন তিনি এমনভাবে তাকান মনে হয় ‘মানুষটি মনে মনে বলছেন, ব্যাটা টাকা ধার দিবি না সরাসরি বল। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে মিথ্যে বলার কি আছে!!!’…ব্যাপারটা ভাবলেই আমার লজ্জ্বা লাগে…বিশ্বাস করুন…

তাই আগাম সতর্কতা হিসেবে মুখটা ছুঁচো করে বললাম, বলুন কি বলবেন…আসলে ভাই একটা পরামর্শ নিতাম…কি বিষয়??? ভাই রাতে ঘুমাতে পারি না…কেনো??? সারারাত ঘরের মধ্যে পাখি ডাকে…পাখির কিচির মিচিরে ঘুমাতে পারি না…আমি এবার অবাক হয়ে কলিগের দিকে তাকালাম…এরকম সমস্যাও মানুষের জীবনে হয়!!!

আমার এই কলিগের নাম জাহিদ…‌আমার বিভাগেই কাজ করে…আমার জুনিয়র….মহা ফাঁকিবাজ…ঘনঘন অফিস কামাই দেয়…একটা দিনও সময়মতো অফিসে আসে না…এর জন্যে প্রচুর বকাঝকা করেও কোন লাভ হয়নি…উল্টো বোর্ড মিটিংয়ে ওর এই দেরী করে অফিসে আসা নিয়ে আমাকে প্রচুর কথা শুনতে হয়েছে…অনেকবার ভেবেছি ওকে চাকরি থেকে বের করে দেবো কিন্তু ছেলেটার প্রতি কেমন যেনো মায়া পড়ে গেছে…চাকরি গেলে বউ বাচ্চা নিয়ে খাবে কি???

আগে ভালই ছিলো ছেলেটা…কিন্তু যখন থেকে নেশাটা ধরলো তখন থেকেই কেমন যেনো পাল্টে গেলো…মানুষের দিন যখন খারাপ যায় তখন বিপদগুলোও খুব আসকারা পায়…জাহিদের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই…ওর বউটা বলা নেই কওয়া নেই এক ভর দুপুরে দুম করে মরে গেলো…আগে থেকে অসুস্থও ছিলো না…মেয়েটার নাম ছিলো পুতুল…ছিপছিপে সুন্দরী তরুণী…আমার মায়ের নামও পুতুল, এ কারণে এ নামের মেয়েদের প্রতি আমার এমনিতেই দুর্বলতা রয়েছে…

মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগেও পুতুলের সঙ্গে ‍আমার দেখা হয়েছিলো অফিসের এক অনুষ্ঠানে…খুব হেসে জিজ্ঞেস করলো, ভাইয়া কেমনে আছেন? পুতুল যেদিন মারা যায় সেদিনও জাহিদকে সঠিক সময়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি…ওর এক প্রতিবেশী খবরটা জানিয়েছিলো অফিসে এসে…অফিস থেকে জাহিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলো, ওর মোবাইল বন্ধ…অবশেষে বিকেলবেলায় ওকে খবরটা পৌঁছানো গিয়েছিলো আরেকজনের মারফতে…এ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে…কোন লাভ হয়নি…

জাহিদকে যখনই বকাঝকা করি খুব মন দিয়ে শোনে…এরপর যেই লাউ সেই কদু…স্ত্রীর মৃত্যুর পর জাহিদের অবস্থা আরো এলোমেলো…এক মুখ দাড়ি গোঁফ…চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে…মাসখানেক অফিসেই আসেনি…এখন যাওবা আসে বিকেলবেলায় কাজকর্মে প্রচুর ভুল করে…

আমি খানিকটা বিরক্তি নিয়ে, জাহিদকে বললাম পাখির ডাকে ঘুমোতে না পারা একটা মধুর সমস্যা…আর আপনি বোধহয় ইদানীং বেশি বেশি জিনিস টানছেন…কমিয়ে দিন…ঘুম এমনিতেই আসবে…

জাহিদ একটু লাজুক হাসি হেসে বলল, রিপন ভাই বোধহয় আমার কথা বিশ্বাস করছেন না…কিন্তু সত্যি, আমি এখন আর ওসব খাই না…আমার বাসায় বোধহয় কিছু একটা আছে…কেউ এখন আর আমার বাসায় থাকতে চায় না…একটা ফ্যামিলি সাবলেট ছিলো ওরাও চলে গেছে…আমার মেয়েটাও চলে গেছে ওর নানাবাড়ি…সেদিন ‌এক বন্ধু ছিলো রাতে…ও মাঝরাতে ভয় পেয়ে এমন হাউমাউ শুরু করলো যে আমি নিজেই লজ্জ্বায় শেষ…

জাহিদের কথা শুনে আমার এবার মেজাজ খারাপ হতে শুরু করলো, একা বাসা…তার মানে দেদারসে নেশা…আর পিনিকের সময় পাখির আওয়াজ, বাঁশির আওয়াজ আরো কতো আওয়াজ শোনা যায়…আমি একটু তাচ্ছিল্যের সুরেই বললাম, আপনি দেখি খুব সাহসী…সবাই ভয় পায়…আর আপনি ভয় পান না…

জাহিদ এবার মাথা নেড়ে বলল, না ভাই…ভয় পাওয়ার কিছু নেইতো…এগুলো সবই খেলা…আর আমি সেই খেলার মাঝে পড়ে গেছি…হুট করে বারান্দার দরজা আটকে যাওয়া, কাঁচের গালাস ভেঙে যাওয়া, মাঝরাতে কথার শব্দ শুনতে পাওয়া এগুলো দেখে সবাই ভয় পায়…আসলে এগুলো সব স্বাভাবিক ঘটনা…আসল ভয় পাওয়ার কারণটা অন্যখানে…আর আমি সেই কারণটা বুঝে গেছি…আপনাকে বলবো, সময় করে একদিন…আমি হতাশ দৃষ্টিতে জাহিদের দিকে তাকিয়ে রইলাম…এতো দারুণ ছেলেটা কী হয়ে যাচ্ছে দিন দিন…

আজ চারদিন হলো জাহিদ অফিসে আসেনি…ওর মোবাইল বন্ধ…আ্যাকাউন্টস থেকে জানালো জরুরি প্রয়োজন বলে বেতনের কিছু টাকা অ্যাডভান্স নিয়েছে…আমি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলাম…বাড়তি টাকা নিয়ে নিশ্চিত ও নেশা করতে গেছে কোনখানে…এ্যাডমিনকে জানিয়ে দিলাম আসলেই যেনো ‘চাকরি নেই’ এ নোটিশ ধরিয়ে দেয়…এভাবে হবে না…

আমার গাড়িটা পুরনো হয়েছে…হেডলাইটগুলো অন্ধকারেও ঘোলাটে আলো ছড়ায়…রাতের বেলায় ড্রাইভিং সীটে টানটান হয়ে বসে গাড়ি চালাতে হয়…আর বৃষ্টির দিন হলেতো কথাই নেই…তা না হলে সামনের রিকশা মানুষ কিছুই ঠাহর করা যায় না…উত্তরায় আমার বাসার রাস্তাটায় সিটি করপোরেশন এখনো বাতি লাগায়নি…অথচ এই রাস্তাকে আড়াআড়িভাবে কেটে গেছে আরো দুটো গলিপথ…ওই গলিগুলো থেকে হুটহাট করে রিকশা বের হয়…একদিনতো আমি নিজেই এক রিকশাকে ধাক্কা দিয়েছি…বাসাটা কাছে বলে রক্ষা…অন্য জায়গা হলে নির্ঘাত গণপিটুনি…

এরপর থেকে রাস্তার ওই ক্রসিংটুকু আসলেই খুব সাবধান হয়ে যাই…আজও তাই ছিলাম…এরপরেও গলিমুখ থেকে হুট করে একটা মানুষ দৌড়ে বেরেুলো …আমি ঘ্যাচ করে ব্রেক কষলাম…কিন্তু সেদিকে ভ্রুঁক্ষেপ নেই তার…একইভাবে দৌড়ে নিমিষেই হাওয়া হয়ে গেলো…পুরো ঘটনা বুঝতে আমার মিনিটখানেক সময় লাগলো…আমার সামনে দিয়ে যা দৌড়ে গেলো, তা মানুষ বটে…তবে সুস্থ না…কারন লোকটার পরনে একটা সুতোও নেই…নগ্ন বেঁটেখাটো একটা মানুষ..মুখভর্তি দাড়িগোঁফ…

বাসার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ঘটনাটা আবারো চিন্তা করলাম…আরেকটু হলেই আজকে গাড়ি চাপা পড়তো পাগলটা…মানুষের পাগল হয়ে যাওয়াটা বিরাট এক রহস্যই বটে…আরেকটা জিনিস মাথায় এলো, পাগলটার চেহারা অনেকটা জাহিদের মতো…অবশ্য দাড়ি রাখলে গোলমুখো চেহারাগুলো একইরকম লাগে…বাসার সবাই চট্টগ্রাম গেছে বিয়ের দাওয়াত খেতে…আমিও যেতাম কিন্তু ওই জাহিদ ব্যাটা গায়েব, তাই…আহারে কতো সুন্দর সুন্দর নারীরা আসবে বিয়েবাড়িতে আর আমি তাদের দেখবো না…কোন মানে হয়…

ঘুম ভেঙে গেছে…মাথার ভেতর চিনচিন একটা যন্ত্রণা…তার চেয়েও বিরক্তিকর ব্যাপার, পুরো ঘরজুড়ে পাখিদের কিচিরমিচির…মনে হচ্ছে হাজারখানেক চড়ুই পাখি একসঙ্গে ঝগড়া করছে…আমি বিছানায় শুয়েই পুরো ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলাম…হঠাৎ করে আমার খুব ভয় লাগতে শুরু করলো…ভীষণ ভয়…

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com