মানুষটাকে আবিষ্কার করে আমি অবাক হয়েছিলাম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ রানা

এক.

আমি তখন ঢাকাতে। গান লিখব বলে পড়াশোনা ছেড়েছুড়ে শব্দ খুঁজে বেড়াই।

বাপ্পা ভাই এর সঙ্গে ততদিনে পুরোদমে কাজ শুরু হয়ে গেছে। বাসায় নিয়মিত যাওয়া-আসা হয়। সেই সুবাদে বাপ্পা ভাই এর বড় ভাই পার্থ মজুমদার এর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পার্থদা নিজেও একজন অসাধারণ গুনী কম্পোজার। এই মানুষটাকে আবিষ্কার করে আমি অবাক হয়েছিলাম পরে এই ভেবে যে পার্থদার মত এত চমৎকার কম্পোজারকে এই প্রজন্মের মানুষ সেভাবে চিনলোই না।

২০০২-০৩ এর দিকে। একদিন দুপুরবেলায় বাপ্পা ভাই এর বাসায় আমি। বাপ্পা ভাই কি এক কাজে বাইরে গেছে। আসতে দেরি হবে। আমি শুনেছিলাম পার্থদা একটা মিক্সড অ্যালবামের কাজে হাতে দিয়েছে। খুব ইচ্ছে করছিলো দাদাকে গিয়ে বলি আমার একটা লিরিক নেয়ার জন্য। কিন্তু সাহস পাচ্ছিলাম না।

সেদিন দাদা নিজেই জানালেন আমার একটা লিরিক নিবেন। খুব আনন্দ পেলাম শুনে। সাধারণত আমি লিরিক দেই সুরকারকে, সুরকার সুর করে আর কম্পোজার সঙ্গীত করে দেয়। কিন্তু দাদা আগেই একটা ট্র্যাক বানিয়ে রেখেছিলেন। আমাকে সেই ট্র্যাকের সুর ধরে কথা বসাতে হবে।

আজম খান

এ রকম কাজ আগে কখনও করিনি। খানিক দমে গেলাম মনে মনে। কার জন্য গানটা করা হচ্ছে শুনে আবার চাঙ্গা হলাম। জেমস ভাই এর কথা ভেবে গানটা হবে। লিখতে বসে গেলাম। প্রথম সুর এর উপর কথা বসাচ্ছি। কঠিন লাগছে খুব। সেদিন আর বেশিদূর আগানো হলো না।

কিছুদিন পর আবার পার্থদার সঙ্গে বসে লিরিক লিখতে লাগলাম। ততদিনে পার্থদা অ্যালবামের কাজ প্রায় গুছিয়ে এনেছেন। নামও ঠিক হয়ে গেছে। দেখা হবে দুজনে। আর এই গানটার ব্যাপারে মত পরিবর্তন হয়েছে। গানটা গাইবেন গুরু আজম খান।

আমার প্রায় চোখে পানি এসে যায় অবস্থা! তখন কি এক কঠিন জীবন যাপন করছিলাম। গীতিকার হতে চাই, অথচ মিডিয়ায় কাউকে সেভাবে চিনিনা, কারো কাছে লিরিক নিয়ে যেতে অস্বস্তি কাটে না আর সেই সময়ে গুরু গাইবে আমার লিরিকে গান?

অনেক কাটাছেড়া, অনেক শব্দ পরিবর্তনের পর অবশেষে ‘নীল আকাশে’ গানটা শেষ হয়। তারপর একদিন গুরুর গলায় সেই ‘নীল আকাশে’ গানটা ফিতাবন্দী হয়ে শ্রোতাদের হাতে এসে পৌঁছায়।

তাঁর অনেক দিন পরে পার্থদার সঙ্গে দেখা একদিন। স্মিত হেসে কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘রানা, স্টুডিয়োতে আজম ভাই নীল আকাশে গাইতে গাইতে কাঁদছিলেন। খুব পছন্দ করেছিলেন কথাগুলো।’

সেই সব দিনের কথা মনে পড়ে যায়। তখন সত্যি আমার ভালো থাকার অনিয়ম ছিল।

দুই.

এ রকম একটা ভোর এলে কেমন হতো!

আমি ধরে নিলাম শুরু আর শেষ এর রেশ ধরে আমার গান লেখারও একটা শেষ আছে। খেলোয়ার যেমন বিদায়ী ম্যাচ এ খেলতে নামেন, দুই পক্ষের সহখেলোয়াররা খেলা শেষে ফুলের মালা পড়িয়ে বিদায় জানান বিদায়ী খেলোয়ারকে। সে রকম কিছু।

আজ আমার শেষ লিরিকটা লেখা হবে। তারপর আমি অবসরে যাবো।

বাপ্পা মজুমদারর ও পার্থমজুমদার দুই ভাই

গান লেখার শুরু তো আসলে গান শুনে। শেষটাও তাহলে গান শুনে হোক। কোন গানটা চালিয়ে আমি দিনটাকে উদযাপন করবো? আমি টেপ রেকোর্ডারে সঞ্জীব চৌধুরীর গাওয়া গাছ গানটা চালিয়ে দেই। এই দিনটার জন্য আমি একটা টেপ রেকোর্ডার রেখে দিয়েছিলাম যত্ন করে।

প্রত্যেক স্বেচ্ছা অবসরের পেছনের গল্প দুঃখের। কিন্তু আমার ইচ্ছেস্বাধীন জীবনের মতই এই অবসর যাওয়া নিয়ে কোনো দুঃখের প্রলেপ নেই, ব্যাখ্যার অবকাশ নেই। আন-অর্থোডক্স! আমি, এবং আমার বোহেমিয়ান মন। ভাবতেই এক ধরণের আলস্য আরাম আমাকে পেয়ে বসে।

পেছন ফিরে তাকালে কি দেখতে পাবো? অনেক মানুষের ভালোবাসা? নাকি খুব গুটিকয়েক মানুষের ঈর্ষার চোখ? দ্বন্দ্ব নাকি এক অপরিনামদর্শী যুবকের অদৃশ্যে ঝাঁপ দেয়া? একটা ঘূর্ণিঝড় নাকি শরতের পেজা তুলো মেঘ?

নাকি এসবের কিছুই না। অনেক- অনেক শব্দ। আর শব্দপাখির দল।

আমি শেষ লিরিকটা লিখতে বসি। জানালার ওপাশে আলো প্রতিভাত হতে শুরু করে। লিখতে লিখতে আমি বুঝতে পারি খোলা আকাশ, একটি গাছ আর বৃষ্টি মানুষের আদল পেয়ে আমার দরজার ওপাশে এসে দাঁড়িয়েছে। অনেক দূরে পরীর নিষ্পাপ অবয়বটাও কল্পনা করে নেই।

আর কেউ আসে নি। আসবার কথাও ছিলো না।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com