মহীন এখন ও বন্ধুরা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিলা চৌধুরী (কলকাতা প্রতিনিধি): “শহরের উষ্ণতম দিনে ” কিংবা “পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে, স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে ড্রইংরুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দি” কালজয়ী এমনি সব বর্ণমালায় গাঁথা  গানে আপামর মানুষের  হৃদয় ছুঁতে পারা ভারতের প্রথম রক ব্যান্ড মহীনের ঘোড়াগুলি। যা ১৯৭০-এর দশকের মাঝ পর্বে কলকাতায় যাত্রা শুরু করে।লোকগান, বাউল ,আমেরিকান, লাতিন, রক, জ্যাজ,  বিভিন্ন সঙ্গীত ধারার সংমিশ্রণ থাকায় এই সঙ্গীত দলকে যে কোনো একক সঙ্গীত ঘরনায় ফেলা মুসকিল ।বাউল সঙ্গীত এবং বাংলা রক ধারায় লোক ঐতিহ্যের স্বাধীনচর্চার পাশাপাশি প্রায়ই উদ্ভাবনী উপায়ে শাস্ত্রীয় উপাদান একত্রিত করার কারণে মহীনের ঘোড়াগুলি লোক-রক সঙ্গীত ব্যান্ড  হিসেবেই পরিচিত ।

কল্লোল

গৌতম চট্টোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায়, প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জন ঘোষাল, আব্রাহাম মজুমদার, তাপস দাস ও তপেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, এই সাত জন ক্ষ্যাপা সঙ্গীতশিল্পী  মহীনের ঘোড়াগুলির প্রান স্রষ্টা ।নব্বই দশকের পর তারা ব্যাপকভাবে ভারতীয় রক যুগের কিংবদন্তী, আধুনিক চিন্তাধারা  এবং সর্বাধিক প্রভাবশালী আভা-গার্ড সঙ্গীতদল হিসেবে একের পর এক গান সৃষ্টি করে উন্মাদিত করে শ্রোতাদের ।মহীনের ঘোড়াগুলি  – হ্যাঁ  ওনারা এখন ” মহীন এখন ও বন্ধুরা ” নামেই পরিচিত ।

বুলা

ছোট ভাই ফটো সাংবাদিক সপ্তর্ষি বৈশ্য দশ সেপ্টেম্বর  থেকেই জোর করে আসছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের  ত্রিগুনা সেন অডিটোরিয়ামে কনসার্টে যাবার জন্যে  ” মহীন এখন ও বন্ধুরা ”  আসবেন বলে ।শেষ পর্যন্ত যেতে বাধ্য হলাম ওর সঙ্গে। আর না গেলে অপূর্ব সব গান  আর কিংবদন্তি গায়কদের পরিবেশন  হয়তো না দেখার আফসোস থেকেই যেতো ।

বারো সেপ্টেম্বরের টানা সাত ঘন্টার অনুষ্ঠানের দ্বিতীয়ার্ধের পুরো সময়টা জুড়েই ছিল   ” মহীন এখন ও বন্ধুরা‘ র পরিবেশনা।এক কথায় সেই সত্তরের দশক মাতানো শিল্পী ও এই দশকের শিল্পীদের  ” মহীন এখন ও বন্ধুরা ” গাওয়া গান আচ্ছন্ন করে এই প্রজন্মের  শ্রোতাদের ।একটা গান শেষ হতে না হতেই আরেকটা গানের অনুরোধে শিল্পীরা মঞ্চ ছেড়ে যেতেই পারছিলেন না ।কে না-ছিলেন  ” মহীন এখন ও বন্ধুরা ” র সেদিনের অনুষ্ঠানে ।শিলাজিত, পটা ( পটা ও মরুদ্যান ) ,সিঁধু , অনুপম রায়,  অনিন্দ্য (শহর ), রঞ্জন প্রসাদ,  ( পুরনো  সদস্য  ), আব্রাহাম মজুমদার  ( অর্কেষ্টা , পুরনো সদস্য  ) , হর্ষ দাশগুপ্ত  ,  (গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের বন্ধু ) , কল্লোল,  রাত্রি রানা থেকে শুরু করে সবাই  ।কথা হচ্ছিল অনুষ্ঠানের মাঝে মাঝে ।শুধু যে গান পরিবেশনা ছিল তাই না – সঙ্গে ছিল ব্যান্ড ” মহীনের ঘোড়াগুলির স্মৃতিচারণ ।পুরনো আর নতুনের মনোভাবের উর্ধ্বে গিয়ে “মহীন এখন ও বন্ধুরা “সফলভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের এই ব্যান্ডটি ।

সত্তরের দশকে দলটি গড়ে উঠলেও প্রাথমিকভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। সে সময়ে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের গানে আমূল নতুনত্ব থাকলেও চলচ্চিত্রের গান বাণিজ্যিকভাবে প্রভাব বিস্তার করায় বাংলা সঙ্গীত জগতে একধরণের স্থবিরতা বিরাজ করছিলো। ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত সংবিঘ্ন পাখিকূল ও কলকাতা বিষয়ক (১৯৭৭), অজানা উড়ন্ত বস্তু বা অ-উ-ব (১৯৭৮) এবং দৃশ্যমান মহীনের ঘোড়াগুলি (১৯৭৯); এই তিনটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। যদিও সে সময়ে তারা প্রায় অপরিচিত ছিল বলা যায়। নব্বইয়ের দশকের বছরগুলোতে তারা দ্য ভেলভেট আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডের মতোন পুনরায় সমালোচনামূলক মূল্যায়ন পেয়েছে। ১৯৯৫ সালে সমসাময়িক বিভিন্ন শিল্পীদের সমন্নয়ে গৌতম চট্টোপাধ্যায় আবার বছর কুড়ি পরে শিরোনামে মহীনের ঘোড়াগুলির একটি কভার সংকলন প্রকাশ করে। জীবনমুখী গান এবং নৈতিক সঙ্গীতদর্শনের কারণে বর্তমানে তাদেরকে বাংলা গানের প্রথিকৃত বিবেচনা করা হয়ে থাকে। গানরচনার শৈলী অনুযায়ী সমালোচনামূলকভাবে বলা যায় তারা জোরালোভাবে বাংলা লোক এবং আমেরিকান শহুরে লোক ধারা কর্তৃক প্রভাবিত ।আর সৃষ্টি করেছে সব কালজয়ী গান।

আশির দশকের শুরুতে ব্যান্ডটি ভেঙে যাবার পর সদস্যরা  কর্মজীবনে ঢুকে পড়েন। গৌতম চট্টোপাধ্যায় কলকাতায় চলচ্চিত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায় পাড়ি জমান সান ফ্রান্সিসকোয়, প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় তার প্রকৌশলী জীবনে মনোযোগ দেন, রঞ্জন ঘোষাল বেঙ্গালুরুতে বিঞ্জাপন আর থিয়েটারে যুক্ত হয়ে পড়েন, এব্রাহাম মজুমদার জার্মানিতে মিউজিক স্কুল চালু করেন, তাপস দাস কলকাতায় চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে কাজ শুরু করেন আর তপেশ বন্দ্যোপাধ্যায় যোগ দেন তার কর্মজীবনে।

মহীন এখন ও বন্ধুরা

কলকাতার কয়েকজন সঙ্গীতশিল্পী সহযোগে ১৯৭৪ সালের শুরুতে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই ব্যান্ডটি গঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে দলটিতে সাত জন সদস্য থাকায় তাদের নাম ছিল সপ্তর্ষি।সাত সদস্যের মধ্যে ছিলেন, গৌতম চট্টোপাধ্যায়, তপেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, রঞ্জন ঘোষাল, তাপস দাস, এব্রাহাম মজুমদার, বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায় ও প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় তীরন্দাজ এবং একটি কনসার্টে গৌতম চট্টোপাধ্যায় দলটিকে গৌতম চ্যাটার্জি বিএসসি অ্যান্ড সম্প্রদায় নতুন নামে পরিচয় করিয়ে দেন।শেষতক এই ব্যান্ডের নামকরণ করা হয় আধুনিক বাঙালি কবি জীবনানন্দ দাশ রচিত সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮) কাব্যগ্রন্থের ঘোড়া শিরোনামে কবিতাটির অনুসরণে ।

গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের তীব্র রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল। তিনি ছিলেন মূলত বামপন্থী মনোভাবের লোক। এই বামপন্থী চিন্তাধারা তার সঙ্গীতের ভেতরে প্রকাশিত হয়েছিল। মহীনের ঘোড়াগুলির একজন সদস্য এব্রাহাম মজুমদারের মতে গৌতম চট্টোপাধ্যায় হয়তো নকশাল আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।

 ব্যান্ডের একটি জনপ্রিয় গান হায় ভালোবাসিতে (১৯৭৭) বাংলার প্রকৃতির রূপময় নৈসর্গিক দিকটি তুলে ধরার মধ্য দিয়ে জীবনানন্দের প্রভাব বোঝা যায়।  আর এখন নুতন আর পুরাতনের মিশ্রণই হলো  ” মহীন এখন ও বন্ধুরা ” যারা মিলে মিশে একাকার হয়ে মাতিয়ে যাচ্ছেন আধুনিক প্রজন্ম থেকে পুরনো প্রজন্মের ভক্ত শ্রোতামহলের হৃদয়।

ছবি:সপ্তর্ষি বৈশ্য

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com