মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

একাত্তর: ঢাকার ঘটনাবহুল জীবন

আমাদের মেজ ভাই টুবুল ওরফে টাবীকে পাকিস্তানী সেনারা ধরে নিয়ে যাবার পর আমাদের দিন-রাত কিভাবে কেটেছে বলতে পারবো না। একটা যেন দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা। পাক সেনারা ওকে ধরে নিয়ে যাবার দিন গোটা বাড়ি ল-ভ- করে আর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছু পায়নি। আমরা চলে যাবো বলে আমাদের দাদুর কোরান শরীফের ভেতরে কিছু টাকা লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো, যাতে পথে সেটা আমাদের কাজে লাগে। পাক সেনারা সেটা স্পর্শ করেনি। টাবীকে ছাড়িয়ে আনার সবরকম চেষ্টায় বড় ভাইবোনরা ছুটোছুটি করছিলো। যেসব মুক্তিযোদ্ধারা ধরা পড়েছিলো, তাদের মধ্যে কেউ একজন নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বলে দিয়েছিলেন যে, চাচার বাড়িতে মর্টার আনা হয়েছিলো। তবে পরে সেটা সরিয়ে নেওয়া হয়। আর এ বাড়িতে তাঁদের যোগাযোগের সেতু ছিলো টাবী। আমরা চোখের জল ফেলা আর দোয়া-দরুদ পড়া ছাড়া কি করবো কিছু খুঁজে পাচ্ছিলম না। দিন-রাত অসহনীয় কষ্টে সময় কাটছিলো। সেই সময় একদিন খুব ভোরে, সম্ভবতঃ ভোর পাঁচটায় একটা ফোন এলো। অচেনা কণ্ঠ ‘শহুদের মা’কে খুঁজছিলেন। শহুদুর রহমান টাবীর ভাল নাম। চাচী দুরু দুরু বক্ষে ফোন ধরলেন। জানা গেলো, ফোনটা এসেছে রমনা থানা থেকে, সম্ভবতঃ থানার ইন-চার্জ ফোন করেছেন। তিনি চাচীকে বললেন, যদি তিনি ছেলেকে দেখতে চান, তাহলে তক্ষুনি থানায় যেতে হবে আর ৭টার আগেই থানা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ তারপর ওদের সবাইকে এমপি হস্টেলে নিয়ে যাওয়া হবে। নির্যাতন করে কথা বের করার জন্য। চাচী আর মা ঘরে যা খাবার ছিলো, তাই নিয়ে তড়িঘড়ি বেরিয়ে গেলেন। এই রুটিন চলেছিলো বেশ কয়েকদিন, যতদিন না টাবীকে ওরা ছেড়ে দেয়। চাচী আর মায়ের মুখে শুনেছিলাম এরকম বন্দী অনেক ছেলের মা-ই আসতেন। রমনা থানার সেই সহৃদয় অফিসারের নামটা জানা হয়নি। কিন্তু আজও সশ্রদ্ধ চিত্তে তাঁকে স্মরণ করি। অবরুদ্ধ দেশের অনেক মানুষ কাজে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের বাঙালি মন টাবীর মত তরুণদের জন্য কেঁদেছিলো। যতটুকু তাঁদের হাতে ছিলো, ততটুকু দিয়েই তাঁরা এসব তরুণদের সামান্য হলেও স্বস্তি দেবার চেষ্টা করেছেন। টাবী যেদিন ফিরে এলো, সেদিন আমাদের কান্নার বেগ আরো বেড়ে গেলো। ও আমাদের ধমকে বলেছিলো, ‘এখন কাঁদছিস কেন? আমি তো ফিরে এসেছি।’ টাবী আমাদের বলেছিলো, শত চেষ্টাতেও পাকসেনারা ওর বয়ান বদলাতে বাধ্য করতে পারেনি। প্রথম ক’দিন ও আমাদের সামনে শার্ট বা গেঞ্জি খুলতো না। একদিন খেয়াল না করে সেটা করাতে দেখেছিলাম, ওর পিঠে মারের চিহ্ন। তবু ওকে ফিরে পেয়ে আমরা খুশি ছিলাম। কতশত ছেলে ফেরেনি আর তাদের কোন হদিশও পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে দুঃখের কথা, আমাদের এই ভাই হায়েনার খাঁচা থেকে ফিরে আসার অনেকদিন পর স্বাধীন বাংলাদেশে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যায়। যাহোক, একাত্তরে ঢাকায় আমাদের অলস জীবন আবার শুরু হলো। চাচীর সহকর্মী ড. শফিউল্লাহ্ আমাদের বাড়িতে প্রায়ই আসতেন। চাচীকে তিনি ‘আপা’ ডাকতেন আর বড় বোনের মত ভালবাসতেন ও শ্রদ্ধা করতেন। তিনি আমাকে আর পিউকে বললেন, আমরা দেশের জন্য কাজ করতে চাই কিনা। আমরা তো ব্যাকুল হয়েই ছিলাম। তিনি তখন তাঁর বন্ধু ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এলেন। আমরা তাঁদের জানালাম আমাদের এক বন্ধু আজমিরী ওয়ারেস ওরফে মীরুও আমাদের সঙ্গে থাকবে। এরপর আমাদের কাজ শুরু হলো। তার মধ্যে আসন্ন শীতের কথা মনে করে কিছু গরম কাপড় ও টাকা সংগ্রহ যেমন ছিলো, তেমনি আবার অন্য খানিকটা বিপজ্জনক কাজও ছিলো। মীরু একদিন ইউএনডিপি’তে গিয়ে একটা চিঠি দিয়ে এসেছিলো। তারপর ডিসেম্বরের ঠিক আগে আগে আমি আর পিউ সদরঘাটের নদীর পাড়ে চলে গেলাম সেখানে ক’টা পাকসেনার বাঙ্কার আছে দেখে আসার জন্য। বাড়ির লোকরা জেনেছিলো আমরা মীরুর বাড়ি যাচ্ছি। এসব কাজের কারণে মনে হচ্ছিলো জীবনের তবু কিছুটা অর্থ আছে। এমন করতে করতে ডিসেম্বর মাস এসে গেলো এবং ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ লেগে গেলো।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com