মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

একাত্তর: ঢাকার জীবন

আমাদের ঢাকার জীবন শুরু হলো। তখন লক ডাউন শব্দের সঙ্গে পরিচয় ছিলো না। কিন্তু আমরা সত্যিকার অর্থে লক ডাউনে ছিলাম। খানিকটা স্বেচ্ছায়, খানিকটা বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠদের শাসনে। কিন্তু একেবারে যে বেরুতাম না, তেমন নয়। কালে ভদ্রে বন্ধু মীরুর বাড়ি অথবা চাচাতো বোন পিউর কোনো বন্ধুর বাড়িতে যেতাম। সবার বাড়ি অবশ্য কাছাকাছি ছিলো। বাকী সময় বাড়ি বসে অলস জীবন কাটতো। পিউ আর আমি বেড কভার বা টেবিল ক্লথে ফুল তুলতাম। বারান্দায় পাটি বিছিয়ে তাতে কাপড়টার এক প্রান্তে পিউ আর অন্য প্রান্তে আমি সূঁচ-সূতা দিয়ে নক্সা তুলতাম। রাতে একটা ঘরে সবাই জড়ো হয়ে মাটিতে বসে ভলিউম কমিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনতাম। বিবিসি বা আকাশবাণী কলকাতা শুনতাম। হারিকেন জ্বলতো। আরো পরে সরাসরি যুদ্ধ যখন বেঁধে গেলো, তখন পূর্ব পাকিস্তানের একটা ম্যাপ পেতে কোন্ কোন্ এলাকা মুক্তিসেনাদের অথবা যৌথ বাহিনীর দখলে চলে এসেছে, অর্থাৎ পাকসেনাদের দখল থেকে মুক্ত হয়েছে, সেটা চিহ্নিত করতাম। ততোদিনে তো জানালার কাঁচে কাগজ সেঁটে ব্ল্যাক আউটের জন্যও আমরা তৈরী। আজিমপুর কলোনীর বাড়িগুলোর ঢোকার মুখের সামনে বাফার ওয়াল তৈরী হয়েছে। অনেক জায়গায় ট্রেঞ্চ খোঁড়া হয়েছে, বাঙ্কার তৈরী হয়েছে। এর-ওর মুখে গেরিলাদের অসমসাহসী কর্মকা-ের খবর পেতাম আর সেটা আমাদের মনে আশার আলো জ্বালতো। মেজবোন রিনি হাসপাতাল থেকে বাড়ি এলে কিছু খবর পেতাম। আব্বা খুলনা চলে গেলেও শেষদিকে পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে ভারত ও মুক্তিসেনাদের যৌথ বাহিনীর যুদ্ধ শুরু হবার আগে আগেই চলে এসেছিলেন আর আমরা নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম। একটাই কষ্ট ছিলো, চিরকূট লিখে যুদ্ধে যোগ দিতে যাওয়া যমজ ভাইদের খবর পাচ্ছিলাম না। তারা কেমন আছে জানার কোনো উপায় ছিলো না। তার ওপর আশেপাশের বাড়ির কিছু মানুষ, যারা মনে করতো, পাকিস্তান ভেঙ্গে বাঙালিরা ভুল করছে, তাদের ব্যাঙ্গ শুনতে হতো, ‘তোমাদের ভাইরা কোথায়? তাদের দেখি না কেন?’ আমরা বলতাম ওরা দেশের বাড়ি গেছে। কেউ বিশ্বাস করতো বলে মনে হয় না। যাহোক এভাবেই চলছিলো। আমরা একটু মনোকষ্টে ছিলাম। কিছু করতে পারছি না, শুধু শুধু বসে সময় নষ্ট করছি। এরই মধ্যে মীরু বললো, ওর ভাই শওকত (সামসুল ওয়ারেস) আমাদের কিছু কাজ দিতে পারে। অনুবাদের কাজ। সেটা পেয়ে তো খুশি হলাম। সেগুলো ছিলো মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত প্রচারপত্র, পুস্তিকা ইত্যাদি। এর সঙ্গে জড়িত একটা ঘটনা ঘটেছিলো, যা আমার জন্য ছিলো ভয়াবহ আতঙ্কের। মীরুর বাড়ি থেকে আমি সেদিন একাই রিক্সায় ফিরছিলাম। আমার হাতে ছিলো সেলাইয়ের নক্সার একটা ফাইল। তার ভেতরে সেই প্রচারপত্র। খানিক দূর আসার পর দেখি ইপিআর’এর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) সদস্যরা সমস্ত যানবাহন থামিয়ে পরীক্ষা করছে। আমার তো যাকে বলে আত্মারাম খাঁচা ছাড়া! ফাইলটা খুলে দেখলে তার ভেতর থেকে বোমাসদৃশ সেই প্রচারপত্র বেরিয়ে আসবে! আমি ঘামছি। রিক্সাওয়ালা গতি কমাতে একজন বয়স্ক সেনা হাত নেড়ে তাকে চলে যেতে বললেন। হয়ত আমি একা মেয়ে বলে। সেদিন বড় বাঁচা বেঁচে গিয়েছিলাম। এর মধ্যে চাচার বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা গেরিলারা এসে আশ্রয় নিচ্ছিলো। মোফাজ্জল হোসেন মায়াভাই, কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমানের ভাই মানু আরো কয়েকজন। মানুর আর এক বোন পূর্ণিমা রিণির খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মাঝে মাঝে আরো কয়েকজন আসতো। তাদের মধ্যে গাজী দস্তগীরও ছিলেন। তাঁর ভাইও রিণিদের বন্ধু। আমরা তো যাকে বলে থ্রিলড! তাঁরা আমাদের দেশকে বাঁচাবার জন্য লড়ছেন। তাঁদের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা আমাদের যেমন সেদিনও ছিলো, আজও আছে। মানুর কাছেই গল্প শুনতাম। মায়াভাই খুব কম কথা বলতেন। তাঁরা ঢাকার নানান্ বাড়িতে থেকে অপারেশন চালাতেন। তারপর চলে যেতেন, আবার কয়েকদিন পরে আসতেন। এভাবেই চলছিলো। ওদের যোগাযোগের সেতু ছিলো মেজ ভাই টুবুল, যাকে আমরা টাবী বলে ডাকি। একদিন সে আমাকে আর পিউকে বললো, ‘তোরা যদি সীমান্ত পার হবার সময় গুলী খেয়ে মরে যাস, তবু আমার সান্ত¦ণা থাকবে। কিন্তু তোদের ধরে নিয়ে গেলে আমি সহ্য করতে পারবো না।’ ঠিক হলো বড়বোন নীনা, তার স্বামী মাহমুদ জামালী আর আমরা দু’জন, আমি আর পিউ, সীমান্ত পার হয়ে ভারতে গিয়ে কাজ করবো। দুলাভাইর বন্ধু ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ফিল্ড হাসপাতাল খুলেছেন। সেখানে ওরা মানে নীনা আর দুলাভাই কাজ করতে পারবে, ওরা দু’জনেই ডাক্তার। আমরাও কিছু না কিছু করতে পারবো। জেনেছিলাম আমাদের স্কুলের দুই বোন লুলু আপা আর টুলু, শ্রদ্ধেয়া সুফিয়া (কামাল) খালাম্মার দুই মেয়ে চলে গিয়ে সীমান্তের ওপাড় থেকে দেশের জন্য কাজ করছে। সেরকমই ঠিক হলো। নৌকা বায়না দেওয়া হলো। আমরা তৈরী হচ্ছি চলে যাবার জন্য। ভেতরে ভেতরে প্রচ- উত্তেজনা। এরই মধ্যে জানা গেলো কয়েকজন গেরিলা ধরা পড়েছে, তার মধ্যে চাচার বাড়িতে যারা থাকতো বা আসা যাওয়া করতো, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আছে। এরপর যা ঘটলো, তা আমাদের জীবনের একটা কালো অধ্যায়। আমাদের যেদিন চলে যাবার কথা, তার আগের দিন দুপুরে পাকিস্তানী সেনাদের কয়েকজন এসে টাবীকে ধরে নিয়ে গেলো। যাবার আগে বলে গেলো, তমিজুদ্দিন খানের মত ‘শরীফ আদমির’ নাতি কি করে এসব নাশকতামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকে। পাকিস্তান অ্যাসেম্বলীর সাবেক স্পীকার তমিজুদ্দিন খান ছিলেন চাচীর বাবা।
(চলবে)

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com