মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

সুন্দরবনে সীমান্ত দর্শন

সুন্দরবনের কথা বলে শেষ করা যাবে না। আমার জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে সুন্দরবন। সেখানে অজ্ঞান শৈশব কাটানো তো আছেই। তারপর নিউজপ্রিন্টে যাবার পর কতবার যে গিয়েছি, সেটা বলে শেষ করা যাবে না। ফরেস্ট ম্যানেজার হিসেবে আব্বাকে মাসে কয়েকবার যেতে হতো। আমি কলেজ ছুটি হলেই চলে যেতাম আব্বার সঙ্গে। কখনো কখনো শুধু আমি আর আব্বা। সে যাত্রা ছিলো খুব আনন্দময়। কত কি যে আব্বার কাছ থেকে শুনতাম, শিখতাম। তার ওপর ছিলো আব্বার কবিতা আবৃত্তি। সে সময় কত অতিথি যে সুন্দরবন গিয়েছেন- ঢাকা থেকে এসে, এমনকি বিদেশ থেকেও অতিথি আসতেন। সুন্দরবনের একটা অমোঘ টান ছিলো, দেশ-দেশান্তরের মানুষ একবার সুন্দরবনে যাবার, সুন্দরবনকে দেখার বাসনা রাখে। এসব যাত্রায় কতজনের সঙ্গে যে দেখা। হয়েছে বন্ধুত্ব হয়েছে। একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে একদল ছাত্রকে নিয়ে এসেছিলেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী সঙ্গীতশিল্পী জাহানারা ইসলাম, যাঁকে জুবিলী আপা ডাকতাম আর আমার শিক্ষিকা জাহানারা বেগম (জাহানারা নওশীন)। তিনি আর জুবিলী আপা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ঐ দলে ছিলেন ইকবাল ভাই (ভূঁইয়া ইকবাল), সাঈদভাই এবং আরো কয়েকজন। এতদিন পর সেকথা লিখতে গিয়ে মনে জাগলো, ছাত্রীরা কেন কেউ আসেননি কে জানে। যাহোক, ইকবাল ভাইর সঙ্গে সেই আলাপ থেকে যে বন্ধুত্ব, সেটা আজও অঁটুট আছে। আর একবার বন্ধু ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় আর রফিক কায়সারও গিয়েছিলো। রফিকের আব্বাকে এত পছন্দ হয়েছিলো যে সে আব্বার সঙ্গেই বেশী আড্ডা দিয়েছিলো। একবার ফরেস্ট্রি ডে’র সময় আলী ইমাম, গোলাম মুস্তাফা, মুহাম্মদ জাহঙ্গীর গিয়েছিলো। আলী ইমাম এখনো সেই স্মৃতির কথা বলে।

তবে একবার একটা ভ্রমণে সুন্দরবন গিয়েছিলাম, যা ছিলো সম্পূর্ণ অন্যরকম। সেটা ছিলো পাকিস্তান আমল আর আমরা গিয়েছিলাম সীমান্ত দর্শনে। বাংলাদেশের সাতক্ষীরা ও ভারতের ২৪ পরগণার মাঝখানে যে সীমান্ত সেটা দেখতে এসেছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কয়েকজন অফিসার। নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার খলিলুর রহমান (পরে তিনি মেজর জেনারেল হন এবং এক সময় আওয়ামী লীগেও যোগ দেন), মেজর শাহাদত, মেজর মঞ্জুর প্রমুখ। খলিল চাচার পরিবার, তাঁর পুত্র কন্যা মিলি, নাহাজ, ফাহাদ আর আমরা তিনবোন – আমি, তন্দ্রা বা তনু ও সোমা এবং চাচী ও মা। নিউজপ্রিন্টের লঞ্চ কেওড়া আর সরকারী বনবিভাগের লঞ্চ বনকন্যায় মিলে যাওয়া হলো। সাতক্ষীরা ও ভারতের ২৪ পরগণার মাঝখানে সীমান্ত বলে যা রয়েছে, সেখানে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। একটা বহমান নদী। নাম রায়মঙ্গল। আমরা নিউজপ্রিন্টের ক্যাম্প হয়ে সীমান্তের নানা জায়গায় গেলাম। যেখানে কাগজের কাঁচামাল হিসেবে গেউয়া গাছ কাটা হতো। সেখানেই নিউজপ্রিন্টের অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরী হতো। সেখানে কি ছিলো না? থাকার জায়গা, হাসপাতাল, ক্লাব, মসজিদ ইত্যাদি সবই থাকতো। তবে এতে মিলের অনেক খরচ হতো। তাই সত্তর দশকের শেষ দিকে প্রায় লালশিরা নামে একটা তিনতলা হাউজবোট কেনা হয়েছিলো আর তার ভেতরেই সব কিছু ছিলো। যাতে এক এলাকার কাজ শেষ হলে লালশিরাকে টেনে অন্য জায়গায় নিয়ে সেখানে ক্যাম্প করা যায়। পরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধর সময় তিন-চারটা জলে ডিঙ্গিতে চড়ে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এসে সেটাকে মাইন বসিয়ে ডুবিয়ে দেয়। তার আগে তারা অফিসার ও অন্য কর্মীদের তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিয়ে নেমে যেতে দিয়েছিলো। স্বাধীনতার পর সুন্দরবন গিয়ে তিনতলা লালশিরার শুধু মাথাটা পানির ওপর ভেসে থাকতে দেখেছিলাম। সেসব তো পরের কথা। আমাদের সীমান্ত দর্শনের কথা বলে এই বিবরণ শেষ করি। আমরা কয়েকটা চেকপোস্টে নেমে শেষ পর্যন্ত সীমান্তে পৌঁছলাম। নদীর দু’পাশে এক ধরনের চেহারার মানুষ, তবে তাদের আলাদা করে চেনা যায় পুরুষদের ধূতি-লুঙ্গি দিয়ে। মেয়েরা অবশ্য সবাই শাড়ি পরে। সেই সময় গ্রামে সালওয়ার-কামিজ পরার চল ছিলো না, ছোট মেয়েরাও শাড়ি পরতো। ওপাড়ের মেয়েদের কাউকে কাউকে শাখা-সিঁদূর পরা দেখেছিলাম। কিন্তু গ্রামের ছবি এক। বোঝা দুষ্কর যে দু’টি আলাদা দেশের গ্রাম। তবে মনে আছে গ্রামগুলো ভারী সুন্দর ছিলো। ছবির মতো। এখনো আছে কিনা জানি না। আমরা কত নদী যে পার হলাম বলা কঠিন – আউড়া শিপসা, জাফা, মর্দাত, হংসরাজ, মালঞ্চ, যমুনা (অন্য যমুনা), কালিন্দী (এটা যমুনার আর একটা নাম হলেও এই নদী অন্য কালিন্দী) ইত্যাদি।
ফেরার সময় একটা ঘটনা ঘটলো। দু’টো লঞ্চ একসঙ্গে যাচ্ছিলো। সারেং শর্টকাট মারতে গিয়ে খালে ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণ পর আর এগোনো যাচ্ছিলো না, কারণ খালের পানি ভাটার টানে কমে যাচ্ছিলো। বেশ রাতে লঞ্চ কাত হয়ে যাবার পর দেখলাম, খালে পানি নেই, মাঝখানে এক ফুট মত পানি। দু’পাশে ধূ ধূ মাঠ। লঞ্চ উল্টে যাবে বলে ভয় পাচ্ছিলাম, আব্বা আশ্বাস দিয়ে বললো, কিছু হবে না। এরকমই থাকবে। আমরা সবাই যে যার লঞ্চে ঘুমাতে গেলাম। মাঝরাতে মিষ্টি কল কল শব্দ শুনে বুঝলাম জোয়ার আসছে। আবার ঘুমে তলিয়ে গেলাম, কিন্তু প্রচ- শব্দে চমকে ঘুম থেকে উঠে দেখি জোয়ারের তোড়ে দু’টো লঞ্চ দু’দিকে ছিটকে পড়েছে। তখন বৃষ্টি নেমেছে। সরু খাল বেয়ে অতি কষ্টে বড় নদীতে পড়লাম আর তারপর নির্বিঘ্নে খুলনা পৌঁছলাম। নদীর অনাদি  স্রোত বয়ে চললো। গন্তব্যে পৌঁছে আমরা থেমে গেলাম। তার আগে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে কত নদী, কত গ্রাম, কত জনপদ যে পার হয়েছিলাম, সেই বিচিত্র অভিজ্ঞতা আজও ভুলিনি।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com