মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

ছাত্র রাজনীতি ও আমি

ছাত্র রাজনীতিতে আমার দীক্ষা স্কুলে থাকতেই হয়ে গিয়েছিলো। অনেকবার ক্লাস বর্জন করেছি। ছাতা কেটে কাল ব্যাজ পরেছি। মিছিলেও গিয়েছি। প্রথমবার গিয়েছিলাম ক্লাস এইট’এ পড়তে। কোন একটা শোকাবহ ঘটনার প্রতিবাদে আমরা মিছিল করেছিলাম। খালি পায়ে পিচ গলা পথে হেঁটেছিলাম। ঢাকা শহরের অনেকটা প্রদক্ষিণ করার পর বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম আর আশ্রয় নিয়েছিলাম আমতলা সংলগ্ন ভবনে। সম্ভবতঃ তখনও সেটা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ, ঢাকা মেডিকেল কলেজের অংশ হয় নাই। স্কুলে যেসব মেয়েদের তত্ত্বাবধানে আমরা এসব করেছি, অর্থাৎ যাঁরা আমাদের নেত্রী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে রাশেদ খান মেননের দুই বোন শিরি আপা ও চেরী আপা, তাঁর শ্যালিকা কাজল আপা, নাসিমুন আরা মিনু আপা প্রমুখ ছিলেন। বহুকাল পর লন্ডনে শিরি আপার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো, তবে মিনু আপার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। তিনি বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভানেত্রী। এরপর ঢাকা ছেড়ে খুলনা গিয়ে কলেজে ভর্তি হলাম। সেখানে আমার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি – ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র লীগ বা এনএসএফ। উল্লেখ্য সেই সময় অর্থাৎ ষাটের দশকে এই তিনটা দলই সক্রিয় ছিলো। তরুণ পাঠকদের জানাই, এনএসএফ বা ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফ্রন্ট ছিলো আয়ুব খানের তৈরী ছাত্রদল বা অন্য কথায় বলা যায় গু-া বাহিনী। ততদিনে ছাত্র ইউনয়ন চীন ও রুশপন্থী দু’টি দলে ভাগ হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু আমাদের কলেজে আমরা ভাগ হতে না দিয়ে একসঙ্গে ছিলাম। কারণ নইলে বাকী দু’টি দলের সঙ্গে লড়াইয়ে জিততে পারতাম না। যাহোক, আমার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ না করলেও আমিই তাদের খুঁজে জানালাম আমি ছাত্র ইউনিয়ন করি এবং তাদের সঙ্গে যোগ দিতে চাই। কলেজে আমারদের নেত্রীদের মধ্যে সবার নাম এতদিন পর আর মনে নেই, তবে রীনা আপা, শেলী আপা, মায়া আপা, কৃষ্ণার কথা মনে আছে। রীনা আপার সঙ্গে বেশ কয়েক বছর আগেও খুলনা গেলে দেখা হয়েছিলো। তিনি যাঁকে বিয়ে করেছিলেন, সেই ঈসা ভাইও ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। তাঁর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা ছিলো। দু’জনেই আমাকে খুব ¯েœহ করতেন। তাঁদের বিয়ের সময় আমি কন্যাপক্ষ হওয়াতে ঈসা ভাই রাগ করেছিলেন। আমার মা যখন মৃত্যু শয্যায় ঢাকা পিজি হাসপাতালে ছিলেন, তখন ঈসা ভাই তাঁকে দেখতে আসতেন। শেলী আপা লন্ডনে ছিলেন, আমরা প্রায় এক পাড়াতেই থাকতাম। দেখা হতো। বাকীদের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। ষাটের দশকের উত্তাল সময়, ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থাণের কালে আমার সময় কেটেছে মিছিলে, নয়ত পোস্টার লেখায়। খুলনা শহরে বহুবার সভায় যোগ দিতে গিয়েছি। একবার হরতালের দিন সভা ছিলো। আব্বা স্পীড বোটে করে আমাকে খুলনা শহরের একটি ঘাটে নামিয়ে দিয়েছিলেন আর ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘তুই আমার চাকরিটা খাবি।’ খুলনা শহরে ছাত্র ইউনিয়নের (তখন নাম ছিল ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস্ ইউনিয়ন বা সংক্ষেপে এপসু) নেতা ছিল নীলফামারীর এক মন্ত্রী বা সেরকম এক ব্যক্তিত্ব খয়রাত হোসেনের ছেলে মুজাহিদ। তার সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হয়েছিলো। আমাদের কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকার মধ্যেও বাম ভাবাদর্শ ছিলো। প্রগতিশীলতা তখন প্রতিকূল পরিবেশে যত দেখেছি, এখন সেটা কম দেখতে পাই। যাহোক। কলেজে নির্বাচনেও একাধিকবার দাঁড়িয়ে জয়লাভ করেছি। তবে আমাকে বিজ্ঞান ছেড়ে কলা বিভাগে চলে যেতে হয়েছিলো, সেটা আগেই বলেছি। খুলনা শহরের ছাত্র লীগের ছেলেরা নাকি আমার ঠ্যাং ভেঙ্গে দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলো। এরপর কলেজের পড়া শেষ হলো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালেয়ে ভর্তি হলাম। ততদিনে মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হয়েছে। এনএসএফ মুছে গেছে, জন্ম নিয়েছে জাসদ। দলের নাম এপসু থেকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন হয়েছে। সেই সময় দলের কিছু সিদ্ধান্ত আমার ভাল লাগেনি। আমি নিঃশব্দে সরে এসেছিলাম। কিন্তু আজীবন ছাত্র ইউনিয়নকে বুকের মধ্যে লালন করেছি। লন্ডনে একবার ছাত্র ইউনয়নের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সভা হলো। বলা বাহুল্য আমাকেও আমন্ত্রণ জানান হলো। বিলেতের কিছু বন্ধুও আমার অতীত জানতো। সেখানে গিয়ে দেখা গেলো বাকী সবাই আমার চেয়ে বয়সে ছোট, এমনকি আমার বন্ধু আবু মুসা হাসানও। আমাকে সভার প্রধান হবার অনুরোধ করলে রাজী হলাম। সক্রিয়ভাবে ছাত্র ইউনিয়ন ছাড়লেও ভালবাসা তো আর মুছে যায়নি। সেখানে আমি বলেছিলাম, ‘আমি ছাত্র ইউনিয়নের ইটারনাল সদস্য। অনেকে পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে। নেতারা পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মন্ত্রী হয়েছে। আমি কিন্তু আজও সেই ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যই রয়ে গেছি।’ আর সক্রিয় রাজনীতি ছাড়লেও বুকের ভেতর যে বাম মতাদর্শকে লালন করেছিলাম সেই সদ্য কৈশোর ছাড়ান বয়সে, তা আজও আছে। আমি সেজন্য গর্বিত।

ছবি; গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com