মনে পড়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

আমার কলেজ 

আব্বার কাজের সূত্রে আমাকে বাংলাদেশের নানা জায়গায় বা শহরে থাকতে হয়েছে, তবে আমার পুরো কলেজ জীবন কেটেছে খুলনায়। আমি খুলনা গার্লস কলেজে ভর্তি হলাম বিজ্ঞান বিভাগে। এখানে একটা কথা বলা দরকার, আমার জন্য বিজ্ঞান বিভাগ ঠিক ছিল না, পরে আমি কলা বিভাগে চলে যাই। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার আগেই স্কুলেই বিজ্ঞান নিয়েছিলাম, মূল কারণ পরিবারের প্রভাব। বাড়ির সবাই বিজ্ঞান নিয়ে পড়েছে। আমিও স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিয়েছিলাম আমাকেও বিজ্ঞানই পড়তে হবে। ততদিনে পুরোদমে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হলো। যখন আমার প্র্যাকটিকাল ক্লাসে থাকার কথা, তখন আমি পোস্টার লিখছি বা মিছিলে হাঁটছি। যাহোক ফলাফল খারাপ হওয়াতে কলেজের অধ্যক্ষা আমাদের পারিবারিক বন্ধু আনোয়ারা বেগম ওরফে রানু আপা আব্বাকে ডেকে বললেন, ‘মামা, ওকে আর্টস নিয়ে পড়তে বলেন। ও লেখালিখি করে, প্র্যাকটিকাল ক্লাস করে না। ও বাংলা আর ইংরেজিতে অনেক নম্বর পায়, সায়েন্স সাবজেক্টে কম নম্বর পায়।’ আব্বা এসে আমাকে বলায় আমি রাজী হয়ে বাংলা সাহিত্যে অনার্স নিয়ে পড়লাম। আব্বা কখনো জোর করতেন না, আমার ওপর ছেড়ে দিতেন। যাহোক এবার কলেজের কথা একটু বলি। বয়রা নামের এলাকায় আমাদের কলেজ, বড় রাস্তা থেকে একটু ভেতরে ঢুকে। বড় রাস্তার ওপর ছিলো পাবলিক লাইব্রেরী, যার পিছনে আমাদের কলেজ। সেই প্রাক-স্বাধীনতা কালে আমরা বাংলা সাহিত্যের তেমন বই পূর্ব পাকিস্তানে পেতাম না। তাই পাবলিক লাইব্রেরী ছিলো ভরসা, সেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাতাম। কলেজটা অনেকখানি জায়গা জুড়ে ছিলো। কলেজের ভেতরে একটা পুকুর, ধানক্ষেত, খেজুর আর নারকেল গাছ ছিলো। বেশ মনোরম পরিবেশ ছিলো। বিজ্ঞান ভবনটা আলাদা ছিলো। মূল ভবনে ক্লাসরুম, অধ্যক্ষা ও টিচারদের রুম, ক্যান্টিন ইত্যাদি ছিলো। খুব ভাল শিক্ষক পেয়েছিলাম। সবার নাম মনে নেই। মমতাজ আপা ছিলেন, জাহানারা আপা, যিনি নিজেও লিখতেন আর বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজীজুল হকের বড় বোন। রানু আপাও ক্লাস নিতেন। পরে কি কারণে যেন আমাদের অধ্যক্ষা হয়ে এসেছিলেন আইনজীবী মির্জা গোলাম হাফিজের স্ত্রী আবিদা হাফিজ। ফিজিক্স পড়াতেন একজন অসামান্য মানুষ – খালেদ রশীদ স্যার, যিনি গোটা খুলনা শহরে গুরু নামে পরিচিত ছিলেন। খুব রাগী ছিলেন। আমরা খুব ভয় পেতাম। কিন্তু টিফিন পিরিয়ডে ক্যান্টিন-পুকুর পাড়-মাঠে আড্ডা ফেলে কোন কারণে বিঞ্জান ভবনে গেলে শুনতে পেতাম স্যরের ট্রানজিস্টর রেডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছে। তাঁর সম্পর্কে হাসান আজীজুল হকের ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’ বইটি থেকে খানিকটা উদ্ধৃতি দেবার লোভ সম্বরণ করতে পারছি না -, খালেদ রশীদ “. . .খুলনা এসেছিলেন একজন অপরিচিত অধ্যাপক হিসেবে আর ধীরে ধীরে ৬/৭ বছরে আমাদের চোখের উপরেই বেড়ে উঠেছিলেন অসাধারণ বড়ো মানুষ হয়ে। আমরা অবাক হয়ে দেখলাম তাঁর নাগাল পাওয়া যায় না, তাঁর কলেজ, সন্দীপন, খুলনা শহর আর তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়, তাঁকে জায়গা দিতে পুরো দেশ লেগে যায় বা অন্যভাবে বলা যায় তিনি নিজেকে পুরো দেশের যোগ্য করে তুললেন।” খালেদ রশীদ স্যার পরে বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্র হাতে লড়াই করে শহীদ হন। সন্দীপনের কথা আগেও উল্লেখ করেছি। সেটি ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন, সঙ্গে গানের স্কুল। এই সংগঠন গড়ার মূলে নাজিম মাহমুদ নামে একজন অসাধারন মানুষ। চমৎকার লিখতেন। তাঁর লেখা গণসঙ্গীত আপনাদের অনেকেই একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের সময় আর মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শুনেছেন। তাঁর ও কবি আবু বকর সিদ্দিকের লেখা ও সাধন সরকারের সুরে গান এবং তার স্বরলিপিসহ একটি খুব ভাল বই বেরিয়েছিল ‘চেতনার সৈকতে’ নামে। সেটি এখন আর পাওয়া যায় কিনা জানি না। আমি আর আমার বোন তনু সন্দীপনে গান শিখতে গিয়ে সাধন স্যারের স্নেহের পরশ পেয়েছি। তিনিও আজ আর নেই। আবার কলেজের কথায় ফিরে যাই। কলেজের অধ্যক্ষা রানুআপা তো ভালবাসতেনই, আমাকে খুব ছোট বয়স থেকে দেখেছেন, আব্বার প্রতি ছিলো অসীম শ্রদ্ধা ও ভালবাসা; কিন্তু জাহানারা আপার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়লাম। তাঁর অপার স্নেহ পেয়েছি। তাঁর ও তাঁর সহোদর হাসান ভাইর সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠলো। আব্বা-মায়ের সঙ্গে তাঁদের সখ্য ছিলো। জাহানারা আপার মেয়ে হাসি, ছেলে কুমার আর কুশল যেন আমার নিজের ভাইবোন হয়ে উঠলো। ওদের সবার সঙ্গে এখনো যোগাযোগ আছে। সেই ভালবাসা আজও অটুট। কলেজে থাকতেই লেখালিখি ও ছাত্ররাজনীতি, দু’টোতেই জড়িয়ে পড়ি। লিখতাম আরো ছোট থেকে, স্কুলে পড়ার সময়। এসব করে এবং ভাল ভাল শিক্ষকদের হাতে পড়ে জীবনটা অনেকটা বদলে গেলো। বন্ধুদের সঙ্গেও চমৎকার সময় কাটতো। আড্ডা তো ছিলোই, ছাত্র রাজনীতি ছিলো, মনে রাখতে হবে সেটা ষাটের দশকের উত্তাল সময়। কলেজে ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা ছিলো জ্যোৎস্না মঞ্জু, বানু, রত্না। জুনিয়র মেয়েদের মধ্যে খুব সখ্য ছিলো সীমা, নাজমার সঙ্গে। আর ছাত্র ইউনিয়নের সহযাত্রীরা তো ছিলোই।খুব হৈ হল্লা করে, আনন্দ নিয়ে আমরা সেই সময় কাটিয়েছি। বন্ধুদের বেশীদিন না দেখে থাকতে পারতাম না। এখন আমরা কে কোথায় যে ছিটকে পড়েছি। আমার জীবন থেকে সেইসব বন্ধুরা কোথায় হারিয়ে গেছে। তাদের ভুলিনি, ভোলা কি যায়?

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com