মনকেমনের মেঘলা জল…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস,সঞ্চালক ও বাচিক শিল্পী

রিনু রোজ আঙুল গুনে দিনের হিসেব করে; হিসেবে যদিও সে কোনদিনই তেমন পোক্ত নয়; তবে আর ক’দিন পরে সেই দিনটা আসবে-তা রিনু দিব্যি বলে দিতে পারে আঙুলে গুনে! দিন কমে এলে তখন রিনু বেলা গোনে! ‘আর ঠিক তিন বেলা বাকি’.. ‘সকালবেলা, দুপুরবেলা, রাত্তিরবেলা’- তারপরই ছুটি ছুটি! স্কুলে ছুটি পড়েছে বেশ ক’দিন হল; এ ছুটি সে ছুটি নয়, এ হল ‘ছুট লাগানোর ছুটি’… ছোট্ট থেকে রিনু এমন ছুটির অপেক্ষা করে আজও! আগে থেকেই শুরু হয় এই ‘ছুটি’র জল্পনা কল্পনা; ‘হাতে তাহলে দিন দশ পাওয়া যাবে’.. সেইমত ভাবনাচিন্তা শুরু! ‘দক্ষিনভারত ঘুরতে তো অনেকদিন লাগবে’! পুরো তাহলে দেখা হবেনা! একঝলক মনখারাপ আসতে না আসতেই উড়ে যায়! ‘কিছু জায়গা তো ঘোরা যাবে’… যে কটাদিন ছুটি দুজনের অফিস থেকে পাওয়া যাবে সেই কদিনের মতই প্ল্যান তৈরি হয়! রিনুর মনে পড়া প্রথম ‘ছুট’ মানে ছুটির বেড়ানো – দক্ষিনভারতে! মাদ্রাজ-কন্যাকুমারী-পন্ডিচেরী-রামেশ্বরম-মাদুরাই আবার মাদ্রাজ হয়ে কলকাতার ট্রেন! ক-তক্ষণ ট্রেনে থাকা! আজও রিনুর কাছে ট্রেন মানেই দোল দোল দুলুনি আর অপলক চোখে বাইরে তাকিয়ে থাকা! মনে আছে সেবার কোন একটা ব্রিজের উপর দিয়ে ট্রেন চলছে, অনে-কটা নীচে তাকালে দেখা যাচ্ছে শুধু মনকেমনের মেঘলা জল আর জল, তাতে কত কত নৌকো; এই টুকু হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে! ব্রিজের উপর ট্রেন যাওয়ার ঝমঝম শব্দ আর দূরের ওই নৌকোগুলো এখনও রিনুকে হাত নেড়ে ডাকে! জায়গাটা ঠিক কোথায় তা মাঝেমধ্যে মনে করার চেষ্টা করে রিনু; পরমুহূর্তেই ভাবে কি হবে সঠিক স্থানকাল মনে করে, যা আছে, যতটুকু আছে মনে, তাই নাহয় থাক.. ছবিটার মধ্যে বিষাদ আছে; তাই হয়ত যখনই মনে পড়ে দুদন্ড থমকে যেতে হয়… পরের বেড়ানোর সময় আড়াই-তিনবছরের ভাই আছে সঙ্গে; মাঝখানে বছর দুই রিনুরা কোথাও যায়নি; সদ্যোজাত ভাইকে নিয়ে ব্যস্ত সময় কেটেছে তখন! সেবার সদলবলে তারা পাহাড় দেখতে চললো! রিনুর সেই প্রথম হিমালয় দর্শন! কু ঝিক ঝিক টয়ট্রেন ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে তাদের নিয়ে উঠতে লাগলো পাহাড়ের গা বেয়ে; হাওড়া স্টেশন থেকে কালকা অবধি বড় ট্রেন, তারপর এই টয়ট্রেন! কি অপূর্ব সাহেবি কোচ! মুখোমুখি চারটে করে বসার সিট; বড় বড় জানালা, যার মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের ঠান্ডা হাওয়া আর টুকরো মেঘ শুরু করলো রিনুদের সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা; ঘন্টা কয়েক পরে তারা পৌঁছলো ‘সিমলা’… ছবির মত সাজানো পাহাড়ি শহর; সেবার রিনুদের সঙ্গে ছিল শ্রীকান্তকাকু-খুশিকাকিমা-বাপিদাদা আর মান্টিও; ওরা ছিল সিমলা কালীবাড়িতে; সেখানে যেতে গেলে পাহাড়ের চড়াই পেরোতে হয়; কিছুদূর হাঁটলেই হাঁফ ধরে; অল্প থেমে আবার হাঁটা… কালীবাড়িতে ছোটবড় বানরের ছড়াছড়ি! এদিক যাও ওদিক যাও, তারা সর্বদা সঙ্গী! একদিন তো রীতিমত হাতাহাতি লেগে গেল বানরকুলের সঙ্গে! মায়ের হাত ধরে ভাই চলেছে -অন্য হাতে পুজোর প্রসাদ কালাকাঁদ; ভাইয়েরই সাইজের এক বানরবাবাজির সেদিকে চোখ পড়লো! ব্যস আর যায় কোথায়! ভাইয়ের হাত থেকে কালাকাঁদ নেওয়ার সে কি মরিয়া চেষ্টা যে সে চালালো তা বলার নয়! ভাইও কালাকাঁদ দেবোনা পণ করেছে! সেও নাছোড়বান্দা! এদিকে ছেলের হাত ধরে বানর ঝুলে পড়েছে দেখে মায়ের সে কি পরিত্রাহি চিৎকার! রিনু আর বাবা সম্ভবত এগিয়ে গিয়েছিল কিছুটা তাই বেশ খানিক পরে তারা ব্যাপারটা খেয়াল করে! সিমলা থেকে কুলু মানালি … মানালি থেকে রোটাং পাস.. বরফ; চতুর্দিকে শুধুই বরফ! কনকনে ঠান্ডা; চোখেমুখে বরফের কুচি… গ্লাভস্ পরা হাতও জমে পাথর… ভাইয়ের হয়ত কিছুই মনে পড়বেনা, কিন্তু রিনুর এখনো বরফঢাকা ছবিটা স্পষ্ট! অ্যালবামের ছবিগুলো ফ্যাকাশে হচ্ছে, মনেরগুলো ঝকঝকে… পায়ের নীচে বিশ্বাস কর্তাগিন্নীর সবসময়ই সর্ষে; অতএব সামান্য সুযোগ আর ছুটি পেলেই হল!একবার পাহাড় একবার সমুদ্র; মোটামুটি এভাবেই বেড়ানোর ভাগাভাগি হত! মোদ্দা ব্যাপার হল কোনটাই ছাড়া চলেনা; ছাড়া হতওনা.. কাছাকাছি বা দূরে; প্রতিবছর বেড়াতে যাওয়ার অলিখিত নিয়ম মানতেন রিনুর মা-বাবা.. তখন রিনুর ক্লাস সিক্স; সেবার তারা চললো অজন্তা ইলোরা দেখতে; একদম ছোট থেকেই ইতিহাস রিনুর বড্ড ভালোবাসার; তাই সে দস্তুরমত উত্তেজিত! বাবাই বই এনে দিয়ে বলেছেন ভালো করে পড়ে নিতে.. ওখানকার পেন্টিং বুঝতে গেলে মূর্খ হলে চলবেনা! রিনু চটপট পড়েও ফেললো- নারায়ন সান্যালের ‘অজন্তা অপরূপা’.. তারপর সেইসব ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বর্ণনা মিলিয়ে দেখতে দেখতে আশ্চর্য্য হল, মুগ্ধ হল.. কেন যেন রিনুর বড্ড চেনা মনে হল চারপাশটা, মনে হল বহুবার সে গেছে ওখানে, ‘আবার দেখা হবে’ মনে মনে বলে সেখান থেকে রিনু ফিরলো ঠিকই, কিন্তু আজও আরেকবার অজন্তায় যাওয়ার সুযোগ তার এলোনা! এমন রিনুর বারবার হয়েছে; অনেক জায়গায় প্রথমবার বেড়াতে গিয়েও মনে হয়েছে ‘এ তো চেনা’! যেন কোথায় দেখেছি দেখেছি! কিন্তু কোথায় দেখা! কিভাবেই বা! নাহ্, তা মনে আসেনি! কিসের এক চোরা টান তাকে বারবার পিছু টেনেছে.. কাছে ডেকেছে… অজন্তার সঙ্গেই রিনুরা সেবার গেল ইলোরা দেখতে… অপূর্ব ভাস্কর্যে মুগ্ধ সময় কাটিয়ে গাড়িতে উঠবে বলে তারা হেঁটে আসছে, দূরের আকাশে তখন কমলা আভা, সুয্যিমামা অস্ত যাই যাই করছেন… ভাড়া করা সাদা অ্যাম্বাসাডারে তখন টেপ রেকর্ডারে বাজছে – ‘সো গ্যয়া ইয়ে জাঁহা, সো গ্যয়া আসমান’…কি যে হল ঠিক তখুনি! কি অসম্ভব ভালোলাগা যে তৈরি হল হঠাৎ! চারপাশের অচেনা পরিবেশ, শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাস, মা – বাবা – ভাইকে টপকে এগারো বছরের মেয়েকে কিভাবে যেন ছুঁয়ে গেল সেই গান… আর এক লহমায় রিনুর প্রিয়র তালিকায় চলে এলেন নীতিন মুকেশ.. যদিও তখনও রিনু গায়কের নাম জানেনা; জানেনা আরো কতকিছু; জীবনের জটিল কুটিল অঙ্ক, এমনকি মনের উথালপাথাল হাবুডুবুও তখনও রিনুর অজানা… তবু সেই গান ছাপ ফেলে সেই সদ্য কিশোরীর মনে… অজন্তা-ঔরঙ্গাবাদ-ইলোরা হয়ে গোয়া… আহা! সারাজীবনে এরপর যতবার বেড়াতে যাওয়ার কথা মনে হবে রিনুর-প্রতিবার আসবে ‘গোয়া’র নাম… এমনই তার ভালোলাগা! মান্ডবী নদীর ওপাড়ে রাতের টুরিস্ট বোঝাই বাসটা যখন থেমেছিল, আকাশে তখনও কমলা আভা, সুয্যিমামা উঠি উঠি করছেন.. লঞ্চে উঠে জীবনের অন্যতম সেরা সূর্যোদয় দেখেছিল রিনু… আর এক নিমেষে মান্ডবী নদী-সমুদ্রগন্ধমাখা বিদেশি বিদেশি শহর গোয়া – হয়ে গেল রিনুর খুব খুব নিজের… প্রেম বোধহয় একেই বলে! সেভাবে বলতে গেলে(এখন এসব ভেবে দেখে রিনু, তখন এত পক্ক ছিলনা কিনা!) রিনুর প্রথম প্রেম-গোয়ার সঙ্গেই… যে কটাদিন রিনুরা গোয়ায় ছিল, তার প্রত্যেকটা মুহূর্ত রিনু মনে করতে পারে আজও… গোয়ার পরে বোম্বে হয়ে কলকাতা ফেরা! বহু চমক থাকলেও শহুরে জৌলুসে বোম্বে কিন্তু রিনুর মন ভোলাতে পারেনি সেবার! বাবার মতই সেও বলেছিল ইস্, বোম্বে না এসে গোয়াতেই আরো তিনদিন থাকলে হত….! কলকাতায় ফিরেই মনখারাপ! রোজকার একঘেয়ে রুটিনে ফিরতে কারই বা ভালো লাগে! রুটিনে একটা পছন্দের কাজও অবশ্য ছিল: খাতা কলম; অজন্তা বেড়ানোর কথা খসখস করে লিখে ফেলা হল, স্কুল ম্যাগাজিনের জন্য! মনে ছিলনা কথাটা! মনে করালো মিম্মিমের মা-রিনুর সেই ছোট্টবেলার বন্ধু পারমিতা! বেড়ানোর আনন্দ পুরো হয়না – যতক্ষণ না তার সব গল্প করা হয় বন্ধুর সঙ্গে! স্কুলে অনামিকা, বাসে পারমিতা আর পাড়ায় পাপু! বলার পর মনে হয় এতক্ষণে কলকাতায় ফেরা হল!!! এখান অবধি এসে আজকের রিনুকে থামতেই হয়;’ফেরা’ বলতেই চেনা একটা পুরোনো ছবি ভেসে ওঠে চোখ বন্ধ না করেও! বাবা-ভাই-রিনু বেড়িয়ে ফিরে-বাড়ি ঢুকে কোনরকমে হাত মুখ ধুয়েই যে যার মত ধপাস! অথচ মা: দিন দশ পনেরো পরে বাড়িতে পা দেওয়া মাত্রই তার হাজারো কাজ শুরু! প্রথমেই বাড়ি পরিস্কার, তারপর ‘আনপ্যাকিং’ এবং রান্নাবান্না! সব সেরে তিনি যখন বিশ্রামের সময় পান ততক্ষণে বাকি তিনজন অনেকটাই চাঙ্গা…! রিনুর কিন্তু এমন হলে মুখ গোমড়া হয়! সংসার কি তার একার! বেড়ানোর পর বাড়ি ঢুকে থেকেই এটা ওটা হাজারটা কাজ নিয়ে হিমসিম – একা তাকেই কেন হতে হবে! প্রতিবার রিনু বলবে এরপর আর বেড়াতে গিয়ে কাজ নেই! তারপর সব কাজ সেরে চূড়ান্ত ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় মেলে দিয়েই রিনু শুরু করবে আবার আঙুল গোনা… মনে মনে শুরু হবে আবার হিসেব…ঠিক কতদিন পরে আবার এভাবে ‘ছুট’ লাগানো যাবে, রিনু শুরু করবে তার দিন গোনা… ১, ২, ৩….. ….

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com