ভালোবাসা হোক ইউনিক, মেইড ইন বাংলাদেশ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জুনাইদ খন্দকার (সুইজারল্যান্ড থেকে ): আব্বা আম্মার বিয়ের পর আব্বা একটা কাজ প্রতি শুক্রবারে করতো। সেটা হল প্রতি শুক্রবারে আম্মা গোসল করে আব্বার সামনে বসতো , আর আব্বা অনেক যত্ন করে আম্মাকে চুল আচড়ে দিত, তেল দিয়ে দিত, ঝুটি করে দিত। পায়ে আলতাও লাগিয়ে দিত। কাজটা আব্বা অনেক সময় নিয়ে করত। বাড়ির উঠোনে মাদুর পেতে। পাশে ক্যাসেট প্লেয়ারে বাংলা সিনেমার গান বাজতো। পুরো সপ্তাহের সে সময়টায় আম্মা হয়ে যেত আব্বার জন্য কাদা ,আব্বা সে একতাল কাদা দিয়ে প্রতিমা বানাতো। তো একবারের ঘটনা বলি, সেবারের ভয়াবহ সাইক্লোনের কথা। আব্বা তখন চট্টগ্রাম চাকরি করে আর আমরা থাকি ফেনীতে। আমার বয়স চার বছর তখন। সাইক্লোনের রাতটা ছিল ভয়ঙ্কর এক রাত। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে আব্বা আসতো। শুক্রবার থেকে চলে যেতো। কিন্তু সেদিন রাতে সাইক্লোনের কারণে আব্বা আসবেনা এটা শিওর্। আমরা সবাই রেডিওতে শুনছি সাইক্লোনের খবর। সাত নম্বর বিপদ সংকেত, আট নাম্বার বিপদ সংকেত। নোয়াখালী উপকূলে নাকি লাখো মানুষ মারা গেছে। আমি দাদা দাদির মাঝখানে বসে আছি। যদি সাইক্লোন নিয়ে যায়। রাতের বাজে এগারোটা। হঠাৎ দরজায় ঠক ঠক। কে এতো রাতে? . দাদা বলল ঝড়ের রাতে নাকি ডাকাত পড়ে। বৃষ্টির শব্দে ওপাশের মানুষটা কি বলছে বুঝা যাচ্ছে না। একটু পর ভয়ে ভয়ে দাদা দরজা খুললো। কাকভেজা হয়ে দাড়িয়ে আছে আব্বা। আম্মার চোখ তো কপালে – তুমি না আসবে না – কালকে না শুক্রবার -কিভাবে এসেছো – বাস পাইনি। ট্রাকের সামনে বসে চলে এসেছি – তুমি কি পাগল – আমি না আসলে তোমায় খোপা করে দেবে কে ? তখন বুঝিনি বড় হওয়ার পর প্রায়ই ভাবি আব্বার এই পাগলামীটার কথা। আট নাম্বার সিগন্যালের ঝড়ের রাতে এক ত্রিশোর্ধ্ব যুবক ট্রাকের সামনে চেপে বাড়ি যাচ্ছে কারণ সে প্রতি শুক্রবারে তার সহধর্মিনীকে পায়ে আলতা পড়িয়ে দেয়… . আমাকে কখনো কেউ যদি ভালোবাসার মহাকাব্য শুনাতে বলে আমি রোমিও জুলিয়েট বা বলিউডি চরম রোমান্টিক সিনেমার ধারে কাছে না গিয়ে আব্বা আম্মার এই ঘটনাটা শোনাই। ভালোবাসা হবে এমন সহজ সরল সোজা সাপ্টা। গল্পটা বললাম কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু আমার কাছে আইডিয়া চেয়ে বসল – দোস্ত প্রপোজ কি দিয়ে করলে ভাল হবে – মানে – আজকাল নাকি রিং টিং পড়িয়ে প্রপোজ করার ফ্যাশন চলছে – তোর মন কি চাইছে – ইয়ে না মানে হাল ফ্যাশনে চলতে হইব তো . ভালোবাসায় আবার ফ্যাশন কিরে? ভালোবাসা হবে স্বতস্ফুর্ত যার যার মনের মত। পৃথিবীতে ছয়শ কোটি মানুষের ফিঙ্গারপ্রিন্ট যেমন ছয়শ কোটি রকম ,তেমনি প্রত্যেকটা মানুষের ভালোবাসাটাও হবে আলাদা আলাদা ইউনিক। . যেমন আমার দাদার প্রতি আমার দাদির ভালোবাসার প্রকাশ ছিল নিজের হাতে স্যুয়েটার সেলাই করে দেয়া। সারাবছর দাদী ক্রুশকাটা দিয়ে অল্প অল্প করে সে স্যুয়েটারটা বানাতো যাতে শীত আসলে দাদা সেটা পরতে পারে। যেবার দাদার ভাই মারা গেল। সারা বাড়িতে বিলাপ। দাদীও কাঁদছেন। কাঁদতে কাঁদতেও স্যুয়েটার সেলাই করে যাচ্ছেন। সামনে শীত,দাদার নতুন স্যুয়েটার লাগবে…মানে সাবকনশাস মাইন্ডে দাদীর এটা একদম গেঁথে গেছেন। আমার দাদী খুব বেশীদূর লেখাপড়া করেন নি। ইন্সটাগ্রাম ফেসবুকে তো দূরে থাক মোবাইলও বুঝতন না। টিভি দেখতন না। কিন্তু আমার দাদার প্রতি দাদির ভালোবাসা প্রকাশের এই আইডিয়াটা দাদিকে এয়ারটেলের নাটক কিংবা ফেসবুকের কোন কাপল কে দেখে নিতে হয়নি। ওয়ান পিস মেড আইডিয়া ছিল। নিজ মাথা থেকে যা বের হয়েছে সেটাই। আবার আব্বাকেও কোন নাটক কিংবা চলতি ফ্যাশনের কিছু থেকে প্রতি শুক্রবারে আম্মাকে চুলে তেল মেখে দেয়ার আইডিয়া নিতে হয়নি। বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত চিরকালই এমন রোমান্টিক ছিল। উল্টো এইসব খুচরো গল্পকে নাটকে ধারণ করেছে অনেকে। প্রেম করা ভালোবাসা শেখার জন্য বাঙ্গালীর টোয়াইলাইট, প্রাচ্যের ফ্যাশন , কিংবা কোন আল্ট্রামডার্ন কাপল কি করে সেটা খুঁজতে হয় না। ভালোবাসা থাকে দাদির কাটার প্রতিটা সূতোর প্যাঁচে, ভালোবাসা থাকে স্ত্রীকে আলতা পরাতে, ঝড়ের রাতে ছুটে যাওয়া যুবকের ভেজা চুলে সেই ভালোবাসার ঠিকানা খুজে পাক ছেলে মেয়েরা। ভালোবাসা হোক যেমন তেমন। স্পেশাল কিছুই না। পরনের সবচেয়ে সাধারণ জামাটা। সারাদিন স্যুট ব্যুট পরে থাকলেও রাতে যে জামাটা না পড়লে ঘুম আসে না। ভালোবাসা হোক সাধারণ কিছু। অক্সিজেনের মত। যার অস্তিত্বের কথা কেউ বলেনা কিন্তু যা না থাকলে জীবন চলেনা। ভালোবাসা আসুক বোকা প্রেমিকের আহাম্মক আইডিয়া হয়ে, ভালোবাসা ঝড়ুক উজবুক মেয়েটার কিম্ভুত চিন্তা ধরে। ভালোবাসা হোক ইউনিক, একদম অরিজিন্যাল।

আম্মাকে আব্বা প্রথম দেখেছিল ক্রিকেট খেলতে গিয়ে। মামার টিমে খেলতো আব্বা। সে ক্রিকেটের ব্যাপারে একদিন মামাদের বাসায় গিয়ে আম্মাকে দেখে আব্বা। অতঃপর প্রেম। আম্মা বারান্দায় এসে দাড়িয়ে খেলা দেখত। কথিত আছে, আম্মা বারান্দায় এসে দাড়িয়েছে এমন সময় আব্বা ব্যাটিং এ থাকলে আউট হয়ে যেত ভালোবাসার রেডিয়েশনে।বিয়ের আগ পর্যন্ত আম্মাকে দেয়া আব্বার একমাত্র উপহার ছিল আম্মাদের পুকুর থেকেই তুলে আনা শাপলা ফুল। হাতেগোনা কয়েকবার দেখা হয়েছিল, প্রতিবারই একটা করে শাপলা নিয়ে গিয়েছিল আব্বা। সেই শাপলার ভালোবাসা বিয়েতে গড়িয়ে চার যুগ পর এখন তাদের ছেলে কে দিয়ে তাদের ভালোবাসার কথা জানাচ্ছে ।
আমার নানা খুবই রাগি ছিলেন,আমার আম্মাই ছিলেন তার একমাএ কন্যা,আব্বাকে অনেক কষ্টে আম্মাকে পেতে হয়েছে,আব্বা সেই সময় তার পড়াশুনা ও মেধার গুনে আব্বা আম্মার বাবার মনে যায়গা করতে পেরেছিলেন,আব্বা আর আম্মার এই প্রেম কাহিনী দিয়ে একটি ভাল ছবি হবে,আমি মাঝে মধ্যেই বলতাম বাজান আপনাদের নিয়ে ছবি বানাবো,আব্বা আর আম্মা তখন শুধু হাসতেন। আমার দাদার প্রতি দাদির ভালোবাসা ছিল একটা মাত্র সোয়েটারে নিহিত।
দাদীর আরেক টেনশন ছিল পানের বাটা। দাদা প্রচুর পান খেত। দাদীর কাজ ছিল সব সময় পানের বাটা সাজিয়ে রাখা। আমার দাদী ভ্যালেন্টাইন্সের নামও জানত না ,কিন্তু আমার দাদা মারা যাওয়ার পরে দাদীকে দেখতাম প্রতি রাতে দাদার পানের বাটা কোলে নিয়ে কাঁদত। কি অদ্ভুত ভালোবাসা। আজ আমরা ব্লক করতে দুইবার ভাবিনা । নাইন্টিজের প্রেমগুলো ছিল বেশ মজার্। ভিউকার্ড ,চিঠি ,স্টিকারের প্রেম। আমার পাশের বাসার রুনু আপুর প্রেমিক সোহেল ভাইয়া প্রতিবার আপুর সাথে দেখা করার সময় সালমান শাহর ভিউকার্ড আনতো। এটা আপুর শর্ত ছিল। সে দেখা করাও কি কম হ্যাপারে ভাই? আপুর আব্বা ছিল রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার্। ভীষণ রাগী। তো আপু আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিল যেদিন যেদিন দেখা করার ডেট আসবে সেদিন আপুদের বাসায় যেয়ে কিছু একটা বলে আপুকে নিয়ে বাসা থেকে বের হবো। কোনদিন আইসক্রিম খাওয়ার ছুতোয় ,কোনদিন আচার কেনার ছুতোয় । এভাবে আমারে আইস ক্রিম ধরিয়ে দিয়ে আপু আর ভাইয়া দেখা করতো। পাঁচ মিনিটের দেখা। তাও কত ভয়। কে-না-কে দেখে ফেলে। এই পাঁচ মিনিটের মধ্যে তিন মিনিট নাকি আবার আপু ভাইয়াকে ঝাড়ি মারতো। আজকালকার যুগে শুনতে কি হাস্যকর লাগে না? পাঁচ মিনিট দেখা তাও এত ছুতা দিয়ে ।  তো একবারের ঘটনা বলি। দেখা হওয়ার পর ভাইয়া হুট করে আমার সামনেই আপুর হাত ধরে বসলো।আপুতো থ। হাত ধরেছে। আমি ছোট ছিলাম বলে কিছু বুঝিনি। কিন্তু বাসায় ফেরার পথে আপুর ফুর্তি দেখে জিজ্ঞেস করলাম – এত খুশী কেন? – আজকে প্রথম বারের মত ও আমার হাত ছুঁলো। এই অনুভূতি নিয়ে আমি সাত জনম পাড় করে দিতে পারি । সেদিন আমি বুঝতে পারি নি কথার মানে। কিন্তু এটা বুঝেছিলাম ,সেদিন আপুর চেহারায় সব পাওয়ার আনন্দটুকু দেখেছিলাম। অল্প একটু ছোঁয়া ,সারা জীবনের অক্সিজেন । এই অল্প ছোঁয়া সব পাওয়ার সুখ লিটন রতন স্বপন কামাল কারো ফ্ল্যাটেই পাওয়া যাবেনা এই ভালোবাসা মেইড ইন বাংলাদেশ । কিন্তু আমরা এটা আশা করতে পারিনা কোন আমেরিকান প্রেমিক তার প্রেমিকার জন্য হাটু পানিতে নেমে শাপলা তুলে আনছে। ওদের ভালোবাসার স্টাইলটা আলাদা ওদের মতো।কালকে যদি নিউইয়র্কের রাস্তায় কোন আমেরিকান যুবক লুঙ্গি পরে ,গামছা কাধে আকিজ বিড়ি টানতে টানতে যায় তাহলে আশেপাশের আমেরিকানরা ভ্রু কুঁচকে তাকাবে। এর মানে কি আমেরিকানরা সব সংকীর্ণ মনের? না এর মানে হল এটা তাদের সঙ্গে যায় না। লুঙ্গি গামছা পাঞ্জাবি হয়ত যায় কিন্তু এটা না। লিমিট আছে অন্য দেশের কালচার এডাপ্ট করার্। আমাদের দেশী ভালোবাসারও একটা স্টাইল আছে! পিওর বাংলা ভালোবাসা। হোক সেটা অল্প ছোঁয়ায় হোক সেটা অপেক্ষার অস্থিরতায়। হোক না সেটা নিয়মে মোড়ানো সুখি ভালোবাসা।ভালোবাসা বেঁচে থাক প্রেমিকের হাতের শাপলায় । ভালোবাসা বেঁচে থাক প্রেমিকার বোনা সোয়েটারে । ভালোবাসা বেঁচে যাক অল্প একটু ছোঁয়া, আরো পাওয়ার অপেক্ষায় । ভালোবাসা থাক মাছে ভাতে অত আধুনিক না । ভালোবাসা হোক ইউনিক, মেইড ইন বাংলাদেশ।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com