ভালোবাসা সবার জন্যে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
শেখ রানা

শেখ রানা (এডিনবরা, স্কটল্যান্ড থেকে)

কিছু গান আছে, অ্যালবামের সবচেয়ে হিট গান বা দর্শক পছন্দের গানের আড়ালে চলে যায় দীর্ঘ সময়ের জন্য। সবাই খুঁজে পায় না, কেউ কেউ খুঁজে পায় সেই গান। অন্তরালে থেকেই সুরের খেয়ার ভাসে, তীর খুঁজে পায়। সে রকম একটা গান হলো ভালোবাসা। আমার লেখা প্রিয় গানের একটি। বাপ্পা মজুমদারের ধূলো পরা চিঠি অ্যালবামে গানটি ছিল।

আজ গীতিকারের গল্পে ভালোবাসার উপাখ্যান…

কোন গভীরে ডুবেছিলে, কোন সে মোহনায়… যাই সীমানা, যাই পেরিয়ে তোমার আঙিনায়!

তখন বন্ধু সবাই। সবজায়গায়, সবার সাঙ্গে বন্ধুত্ব আমার। সিনিয়র ভাইদের স্নেহ, ব্যাচমেট-দের ভালোবাসায় উজার করা এক একটা দিন … দিনগুলো আনন্দ। দিনগুলো শরতের সাদা মেঘের মতো সুন্দর। আর রাতগুলো অন্ধকার ফুড়ে উঠে আসা এক এক আলোর ঝলকানি।
আনন্দ-বেদনার কাব্য মাত্রই শুরু। একটা উদাস মুখের বোহেমিয়ান ছেলে..এতদিন পরে ফিরে দেখি ছেলেটা জানালা দিয়ে রাতে একা একা আকাশ দেখে আর নস্টালজিয়া-র শব্দচয়নে স্বপ্ন সাজায়।
ছেলেটা আর সুখী মানুষের জামা খোঁজেনি কোনওদিন…

একটা সময়ের কিছু চিহ্ন, দাগ কেটে যায় কোথায় যেনো!
আমরা রুমমেট-রা মিলে সাহেববাজার থেকে একটা মোটা খাতা বানালাম ৯৮ এর কোনো এক রোদ হাসিমুখ দুপুরে। আমি , রাসেল, অপু আর রনি। আমাদের রুম নাম্বার ছিলো ২১০ আর পরে ২১২। রাজশাহি বি আই টি-র হামিদ হল। হলের সবচেয়ে জনপ্রিয় রুম। ডাইনিং এ যাবার আগে, পরে মোটামুটি সবাই এক-আধবার ঢু মেরে যায়। একটু পাশেই কমন রুম। ততদিনে আমি টি টি খেলা শিখে গেছি। দেখা যায় রাতে খেলা শুরু করি, একে একে পার্টনার বদল হয়। ভোর পর্যন্ত টিকে থাকি শুধু আমি আর ইমরান। ও ছিলো সিভিল ডিপার্টমেন্ট এর। আমাদের দারুন বন্ধুত্ব হয় কয়েক বছরের। তারপর একদিন এই বন্ধুটাকে আমি হারিয়ে ফেলি। ইমরান স্রেফ নিখোঁজ হয়ে যায়। সে আর এক গল্প… অন্য কোনো দিন!

ভোরের আলো, আমি আর ইমরান চলে যাই দেয়াল টপকে তালাইমারি। বট,পরোটা আর সেলিমের সর ভাসা দুধ-চা আর পাউরুটি। সবাই ক্লাসে যায়, আমি শব্দ মাথায় নিয়ে ঘুমাতে যাই। তখন আমি শব্দজট আর শব্দপাখির ঠিক মাঝ দরিয়ায় জীবন যাপন করছি। আমি স্বপ্ন দেখি শব্দ আর মেঘেদের। সে এক মজার স্বপ্ন!
কেউ যদি বুঝতো!

ভালোবাসা জন্ম নেয়, ভালোবাসার মৃত্যু দিনে!
গান লেখার একটা সুন্দর জোনাকী পোকা মাথায় ঢুকে গেছে ততদিনে। বাপ্পা ভাই এর সঙ্গেও জম্পেশ জমে গেছে। রাতের ট্রেন এ প্রথম লিরিক। তখনও ক্যাসেট যুগ! কত আর আগে! ৯৮-৯৯! কি উত্তেজনা আমার! টগবগ তারুণ্য! যখন তখন প্রসারিত হাতে ধরে ফেলি মেঘ। বোহেমিয়ান জীবনের নির্ভার স্বাধীন আকাশ আমার মাথায় ঢুকে যায়। আমি আমার ভিতরে ডুব দেই, নিজের অজান্তেই। কলম-কাগজ নিয়ে একা একা বেড়িয়ে পড়ি এখানে-ওখানে।
একা, কখনও সঙ্গে থাকে ইমরান…
ঘুমের সঙ্গে অনিঃশেষ প্রেমের কারণে মাঝে মাঝেই প্রথম ক্লাস মিস হয়ে যায়। রুমমেটরা একে একে ডেকে চলে যায়,আমি উঠে বসি আর ওরা চলে গেলেই আর একটু ঘুমাই। ক্লাস ধরি দ্বিতীয়-টা। ইলেক্ট্রিকাল মেশিন। এই সাবজেক্ট-টা মজাই লাগে। আরও বেশি দূর্ধর্ষ মজা লাগে ক্লাসে বসে চোখের সামনে দৃশ্যগুলো পালটে ফেলে নিজের মত একটা দৃশ্যকল্প তৈরি করতে। আমি তাই করি। রুহুল আমিন স্যার-এর ক্লাসে সাহেববাজার থেকে কেনা সেই পেটমোটা ক্লাসখাতার একদম শেষে চলে যাই। জানলা দিয়ে বাইরে তাকাই। সবুজ দেখি। আর দুজন কিশোর-কিশোরীকে নিয়ে আসি দৃশ্যকল্পে। রুহুল আমিন স্যার মন দিয়ে মেশিন পড়ায় আর আমি আরও বেশী মনোযোগ দিয়ে অনেক দুরের কিশোর-কিশোরীর কাছে চলে যাই। শব্দরা নামতে থাকে …

ভালোবাসা জন্ম নেয়
ভালোবাসার মৃত্যু দিনে …
তারপর! সবুজের মাঝখানে একটা জলটলমল স্বচ্ছ পুকুর । অনেকগুলো মানুষ। কারও ভালোবাসা জন্ম নিচ্ছে,আর ঠিক তারপাশেই কেউ কাউকে বিষাদ চোখে বিদায় জানাচ্ছে। বিভ্রম জাগানিয়া একটা সুররিয়াল চারপাশ তৈরি হয়। ঘড়ির ডায়ালের একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তে পৃথিবীর কোথাও দুজনের গভীর ভালোবাসার জন্ম নিলো, ঠিক তখনই পৃথিবীর অন্য গোলার্ধে কারো ভালোবাসার মৃত্যু হলো। একই সময়ে …
এ রকম হয় না? আমি লিখে ফেলি একটানে – 

ভালোবাসা জন্ম নেয়
ভালোবাসার মৃত্যু দিনে
ভালোবাসা শুদ্ধ হয়
ভালোবাসার সত্য চিনে

সন্তরণে যায় যে ভেসে
ভালোবাসা অবশেষে…

ভালোবাসা অগ্নি জলে
ভালোবাসার কথা বলে
ভালোবাসা স্পর্শকাতর
ভালোবাসা হৃদয় চাদর

সন্তরণে যায় যে ভেসে
ভালোবাসা অবশেষে…

ভালোবাসা মেঘের খাতায়
ভালোবাসার পদ্য আঁকা
ভালোবাসা কে জানে কই
ভালোবাসার তল যে অথৈ

সন্তরণে যায় যে ভেসে
ভালোবাসা অবশেষে…

লেখা শেষ করে হাসিমুখে ক্লাস থেকে বের হই। মেশিন ক্লাস এর জয় হোক! সাহেববাজার থেকে বানানো পেট মোটা খাতা বেঁচে থাকুক। আমার খুব মন ভালো অনুভূতি হয়।
সেই আনন্দমুহূর্ত, আমি এখন, এই নস্টালজিয়া লিখবার সময়টাতেও দেখতে পাচ্ছি। সেই সময়ের আমার আমিকে দেখতে পাচ্ছি।
স্মিত হেসে আমার দিয়ে তাকিয়ে আছে আমি।

‘ কেমন আছো হে অশিক্ষিত গীতিকার? গান লিখবে বলে সব না ছেড়েছুড়ে বোহেমিয়ান হয়ে গেলে! তারপর? ‘

দহন লাগা তৃষ্ণা নিয়ে, এ হৃদয় যাযাবর!
ছুটিতে ঢাকায় ফিরে বাসার সবার সঙ্গে দেখা করেই আমার তখন প্রথম কাজ বাপ্পা ভাই-র বাসায় ঢু মারা। ততদিনে আমার রিলিজ হওয়া লিরিক- রাতের ট্রেন এর ‘বিশ্বাসেতে বস্তু মেলায়’, বাসুদার সুরে একটি নারী অবুঝ(মিক্সড এলবাম)-এ ওয়ারফেজ এর মিজানের ভয়েস এ ‘পাখি উড়ে যায়’। আর আমার খুব প্রিয় দলছুটের হৃদয়পুরে সবুজ যখন, গাছ, বৃষ্টি পড়ে। শব্দ, লিরিক,গান … আমাকে আনন্দচোখ দিয়ে চারপাশ দেখার আনন্দ দেয়।
ধুলো পড়া চিঠি। বাপ্পা ভাই এর থার্ড সলো। রাজশাহী থেকে ফিরেই সেই মেশিন ক্লাসে বসে লেখা ‘ভালোবাসা’ গানটা বাপ্পা ভাইকে দেখাই। বাপ্পা ভাই হ্যা-না কিছুই বলেনি তখন। মেইন কপি -ওটাই। খাতা থেকে ছিড়ে লিরিকটা বাপ্পা ভাইকে দিয়ে আসি।
তারপর প্রিয় হাইকোর্টে যেয়ে নস্টালজিক হই। একটি গাছ-কে খুঁজে ফিরি। বাসায় ফেরার তাড়া দ্বন্দ্বমুখর হয়। হাইকোর্টেই থেকে যেতে ইচ্ছে করে। হাইকোর্ট কলোনীর অপাপবিদ্ধ সময়ের কথা ভেবে আমার রীতিমত কান্না পায়। কিন্তু ততদিনে আমি হাসিমুখে বিষাদ নিয়ে হাঁটা শিখে গেছি।
লোকালয় থেকেও ক্রমে ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছি, আনন্দে…বিষাদে…


পাখি উড়ে যায়, কবিতার ডানা মেলে!
‘ ভালোবাসা লিরিকটার একটা টিউন দাড় করেছি, রানা। কিন্তু লিরিকটা খুঁজে পাচ্ছি না। লিরিকটা নিয়ে চলে এসো বাসায়। ‘
বাপ্পা ভাই এর ফোন। ফোন রেখেই ধুকপুকানি শুরু হয়। আমার কাছে তো মেইন কপি নেই। এখন!!
সেই খাতাটা বের করি। উত্তেজনায় কাঁপছি আমি। লিরিক খুঁজে পাবো না তো! লেখা শেষ হলে লেখাটা আমি একদম ভুলে যাই। মাথা থেকে চলে যায়। তাহলে! একটা মজার ঘটনা ঘটে তখন।
লেখা নাই, কিন্তু লেখাটা রয়ে গেছে আসলে।
আমি লেখার সময় কলমে বেশ জোর দিয়ে লিখি। সেই পাতা-টা তো হারিয়ে গেছে। কিন্তু ঠিক পরের সাদা পাতাটা চোখের খুব কাছে ধরতেই দেখতে পাই ভালোবাসার লিরিক-টা রয়ে গেছে সাদা পাতায় আরো সফেদ হয়ে। কি যে আনন্দ হয় ভালোবাসা-কে ফিরে পেয়ে।
পুরোটা লিখে ফেলি সেই অদৃশ্য কালির সাদা পাতা থেকে।
ভালোবাসা আসলে হারায় না। ভালোবাসা থেকে যায় আনন্দে, গাঢ় বিষাদে…
ভালোবাসা থেকে যায় নস্টালজিয়ায়।

লিরিকটা উদ্ধার করে ভোঁ দৌড়ে বাপ্পা ভাই-র বাসা। দু-তিন পরেই ভালোবাসা-র লিরিকে চমৎকার একটা গান হয়। বাপ্পা ভাই এর মায়াবী কী-বোর্ডের জাদুতে শুনতে দারুন লাগে। তখনও পরী গান হয়ে ওঠেনি। জয় গোস্বামীর কবিতা সংগ্রহ-২ এর কোনো এক পাতায় চুপচাপ ঘুমিয়ে আছে। ধুলো পড়া চিঠি রিলিজ করে। দুর্দান্ত সব গান ছাপিয়ে পরী সর্বগ্রাসী হয়।

আমার কিন্তু ভালোবাসা-র কথা মনে পড়ে। সেই ইলেক্ট্রিকাল মেশিন ক্লাসে বসে দৃশ্যকল্প সাজানোর কথা মনে পড়ে। লিরিকটা হারিয়ে ফেলেও খুঁজে পাওয়ার সেই অদ্ভুত সময়টা মনে পড়ে।
আমার মনে পড়ে, আটপৌড়ে চারপাশ ছেড়ে শব্দপাখি ধরবো বলে আমি ঘর থেকে বেড়িয়ে পরেছিলাম একদিন। তারপর অনেকদিন ঘরে ফেরা হয় নি আমার। বোহেমিয়ান জীবন আমাকে নিবিড় ভালোবাসায় কাছে টেনে নিয়েছিলো।

ভালোবাসা-সবার জন্য।
ভালোবাসা-র গানে সময় ভালো কাটুক স্বজনদের।

ছবি: টুটুল নেছার সৌজন্যে

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com