ভালোবাসার ফুলঝুরি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুলতানা শিরিন সাজি

একদিন এক সুভদ্রা ভোরে আমার ঘুম ভেঙেছে। আমি চোখ মেলতেই দেখি আমার প্রিয় এক জানালা।জানালার বাইরে থেকে পর্দার ফাঁক গলে ভোরের রং ঢুকে পড়েছে। আমি রবী ঠাকুরের আনমোনা বালিকার মত উঠে দাঁড়ালাম।
দরজার পাশে রাখা পায়ের কাঠবিড়ালী স্লিপার। গায়ের মাখন এর মত শুভ্র রোবটা জড়িয়ে বারান্দায় বেরুতেই দেখলাম তুমি হাঁটছো। বারান্দার নীচ থেকেই বাগানটার শুরু। ইট বিছানো পথটা সোজা যেতে যেতে ডানদিকে চলে গেছে একদম মহা্সড়কের দিকে।
তোমার গায়ের চাদর এর রং এ ভোরের আলো ছুঁয়ে আছে। আমি বারান্দার ইজিচেয়ারটায় বসতেই, শব্দে তাকালে আমার দিকে। হাত নাড়লে। কোন ভোরে উঠেছো কে জানে!তোমার লেখার টেবিলে ডাইরী ,খাতা ,কলম ছড়ানো দেখেছি।তুমি বাগানের ফুল গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে আছো। আর আমি তোমার দিকে।
আমি তোমার মত কোন লেখক বা কবি নই।
তুমি সারাজীবন ধরে মানুষ দেখেছো,গাছ দেখেছো আর পাখি দেখেছো।
আর আমি,আমি শুধু তোমাকেই দেখেছি।
তোমার ভালোলাগাগুলোকে নিজের করে নিয়েছি।
কে বলে মানুষ বদলায় না?আমি তো বদলেছি। আমি তোমার জন্যই শহরের জীবন ফেলে, প্রিয় জগত,পরিবার,পরিজন ফেলে এই ছোট্ট শহরটায় চলে এসেছি।তোমার কখন মুড়িমাখা খেতে ভালো লাগবে।
কখন পিঁয়াজু আর চা।কখন মাংস লাল করে ভুনা করে,লাল চালের ভাত খাবে তুমি।
পাট শাক ভাজি আর পাঁচ ফোঁড়ন দিয়ে ডাল তোমার দারুণ পছন্দ।
আর সকালবেলায় চায়ের সঙ্গে টোস্ট বিস্কিট ।
শুধু তোমার জন্য আমি পাহাড় এ উঠেছি। যদিও হাইটে আমার ভীষন ভয়। তোমার সঙ্গে দূরের কাশবন দেখতে গেছি আমি। তুমি ভালোবাসো তাই বিড়ালের সঙ্গে সখ্যতা করেছি।
শহুরে জীবন ফেলে এই ছোট্ট শহরে এসে মাঝে মাঝে খুব একা লাগতো। মনে হতো আমার সেই বন্ধুদের,যাদের সঙ্গে দাঁপিয়ে বেড়িয়েছি সারা শহর।
টাঙ্গাইল শাড়ি ভালোবাসতাম খুব। একবার টাঙ্গাইলের তাঁতি বাড়ি দেখতে যাবার সময় তোমার সঙ্গে বাসে দেখা।মির্জাপুর এর খুব কাছাকাছি যেয়ে মাইক্রোবাসটা নস্ট হয়ে গেলো। ঠিক করতে কিছু সময় লাগবে।
আমার সঙ্গে ছিল আরো দুই বন্ধু। ওদের একজনের সঙ্গেই প্রথম তোমার আলাপ। তোমার কথা শুনে নাচতে নাচতে আমার কাছে এলো।কাছেই নাকি হাঁটাপথে মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতাল।বাউন্ডারী ওয়ালটা দেখালো হাত উঁচিয়ে।
ঠিক একঘন্টা সময়।যদি ঘুরতে যাই।
একঘন্টার মধ্যে ফিরছি বলে আমরা এগিয়ে গেলাম। তোমার সঙ্গে পরিচয় ছাড়া আর কথা হয়নি কোন।কুমুদিনী হাসপাতালের ভিতরে চাইলে যাওয়া যায়না।গেটে কি যেনো কথা বললে তুমি। আমি তখন পাশের ছোট্ট সরু নদীটার কাছে গিয়ে নদী দেখছি। তুমি বললে ওপারে যাওয়া যায়। নৌকায় চড়ে এটুকু পাড়ি দিতে হয়।বললে ওপাশে অদ্ভুত সুন্দর একটা গ্রাম আছে। শুধু হেঁটে হেঁটে ঘুরতে হয়।আমি তোমার কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে যাই। আর তুমি মুগ্ধ হও আমার মুগ্ধতার।”পলকের তরে শুধু হাসি মুখ” বুঝি একেই বলে!
কুমুদিনী হাসপাতালের ভিতরটা ঘুরে দেখলাম আমরা। ভারতেশ্বরী হোমসের সামনে থেকে ঘুরে আসলাম। ওয়ান থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত মেয়েরা এখানে পড়ে। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা অত ছোটবেলায় হোস্টেলে রেখে কেন বাবা মায়েরা মেয়েদের পড়ায় । কি তার কারন! এইসব নানা কিছু নিয়ে কথা বলতে বলতে আমরা ঘুরতে থাকলাম।
হাসপাতালের ডক্টরস কোয়ার্টারের পাশে বড় দীঘি নাকি পুকুরটার চারপাশে ঘাটবাঁধা।
আমি একটা ঘাটে যেয়ে বসলাম।পানির ছায়ায় নিজেকে দেখছিলাম আর অদ্ভুত আকাশ। মাথার উপরে আর পানির নীচে দুইটা আকাশ। কেমন এক মোহাচ্ছন্ন সময়!

ফেরার সময় খুব মন খারাপ হলো। এত সুন্দর জায়গা। ঢাকার এত কাছে জানতাম না।হাঁটতে হাঁটতে তোমাকে একথা বললাম। তুমি বললে, আরো কত আছে। তুমি সোনারগাঁয়ের কথা বললে। ডেমরার কাছাকাছি কি একটা গ্রাম।নদী পার হয়ে যেতে হয়। যেখানে শীতলক্ষ্যা আর ব্রক্ষ্মপুত্রের পানি মেশে,সেখানে একটা দাগ দেখা যায়।দুই পাশের দুই পানির রং আলাদা। শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। এমনো হয় নাকি কখনো!
টাঙ্গাইল এ তাঁতিপাড়ায় ঘুরে শাড়ি কিনি আমরা। তোমার কাজ ছিল কুমুদিনী কলেজে। ফেরার সময়ে আমরা আবার একসঙ্গে ফিরলাম। তিন নাকি চারঘন্টা। আমাদের কথাবলা সময়। তুমি কথা বলছো আর আমি শুনছি। সেইতো শুরু।
আজো সেই মুগ্ধতা ।
তুমি লেখো।সারাদেশে কত ভক্ত পাঠক তোমার। শুধু সারা দেশ কেনো,সারা পৃথিবীতে কত পাঠক তোমার।
আমি তোমার সব লেখার প্রথম পাঠক। তোমার লেখায় নায়িকারা কোন শাড়ি কখন পড়ে।কখন চুলে কোন ফুল পড়ে।আমাকে ডেকে বলো।জানতে চাও কত কিছু।
আমি তোমার লেখা গল্পের চরিত্র হয়ে ঘুরে বেড়াই। ভালোলাগে। ভালোলাগে এই রকম কল্পলোকের জীবন!
আমার একটুও ঈর্ষা হয়না কাউকে ,যখন দেখি তোমাকে দেখলে সবাই ঘিরে ধরে।
আমার ভালোলাগে। এই ভালোলাগা ফুলের নাম ভালোবাসা। যা ছুঁলেই ভালোবাসার অজস্র ফুল ঝুরঝুর করে পড়ে।
আমি ভালোবাসার এই ফুলঝুরিতে ভেসে বেড়াই!

ছবি: লেখক ও গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com