ভালোবাসাটুকু থাক…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নীলান্জন চট্টোপাধ্যায়

যেকোনো শিল্পী,কবি বা লব্ধপ্রতিষ্ঠ কাউকেই “দাদা” বা “দা” সম্বোধন টা আমার চিরকালের অপছন্দ। চিনি না, জানি তার থেকেও কম- এমন কাউকেই খুব একটা নিজের করে নিতে একটু কুন্ঠা হয় বৈকি। তবে এতে ভক্ত ও ভগবানের দুরত্বটুকু ভক্তির জায়গাটা আরো ভালো ভাবে জারিত হয়। আসলে, “স্টেলা ” আর “এস্ট্রোফেল” দুই আলাদা জগতের বাসিন্দা। কিন্তু আমাদের এক দুর্নিবার আকর্ষণ থেকেই যায়, সেইসব তারাদের অন্তরমহলে ঢুকে পড়ার। এই সো্স্যাল মিডিয়া সেই উকি দেবার গেটপাস আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছে অনবরত। যাদের দেখার অভ্যেস ছিল হয় স্টেজের উপরে বা টিভির ওপারে, তাদের সাথে যখন মুখোমুখি বসে চা জল খেলে সেই অনুভূতি টা কাহাতক টিকে থাকবে!! কিন্তু চাঁদ হাতে পেলে যা হবার তাই হয়। মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে মহাকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। যেন বলতে চায়- মেরে পাস ইয়ে হ্যায়। দেওয়ালময় বিজ্ঞাপিত হয় সেই সব ছবি। রাতারাতিই সেই সব তারা রা হয়ে পড়েন “দাদা”। যাক। আমার এখনো এরকম কাউকে “দাদা ” “দিদি” করতে পারি নাই। তাই, উহাদের আনন্দেও খুব বিচলিত হই না, দুঃখে উদ্বিগ্ন ও না। বেশ ভালই ছিলাম স্টেজের নীচে গলা ফাটিয়ে, টিভির এপারে হাততালি দিয়ে। কিন্তু একটা সকাল সব হিসেব তছনছ করে দিয়ে চলে গেল। দিনক্ষণ আর নাই বললাম। এম এ পাশ করে হদ্দ বেকার অবস্থা নিয়ে গূঢ় আলোচনা করতে মগ্ন ছিলাম আরো এক কাঠ বেকার এম এস সি র সঙ্গে। হঠাৎ, দৈববাণী র মত সে বলে ফেলল – শুনেছিস খবর টা? – কি খবর? – কালিকাপ্রসাদ। আসলে তখনো ভাবনার বৃত্তে মৃত্যুর চিন্তাটা আনতে পারি নি। বড়জোর অসুস্থ – এই টুকুই বিশ্বাস নিয়ে ফোন টা কেটে দিই। ততক্ষনে বুঝতে পারি আমি সময়ের থেকে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছি। রেস্ট ইন পিস এর প্ল্যাকার্ড ততক্ষণে দেওয়ালে দেওয়ালে ঝোলানো শুরু করে দিয়েছেন লোকজন, ভক্ত রা। তবুও কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না, এটা কোনো ভাবেই হতে পারে না। যে মানুষটার ঐদিন সন্ধ্যায় আমাদেরই কলেজের প্ল্যাটিনাম জুবিলি অনুষ্ঠানে গাইবার কথা, তিনি কিভাবে… কালক্রমে সবাই সিন্ধু সেচে বের করে নিয়ে আনল কালিকাপ্রসাদ এবং তাদের ছবি। জুলজুল চোখে তাকিয়ে রইলাম। একটা সময় বিশ্বাস নেমে এল দুচোখে। আমার সঙ্গে উঁনার কোনো ছবি ছিলনা। কোনো সই,অটোগ্রাফ কিস্যু না। শুধু দুবার উঁনাকে সামনে থেকে গাইতে দেখেছি। আর টিভি তে । অসংখ্যবার মুগ্ধ হয়েছি। মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা দিনদিন বেড়ে গেছে। কিন্তু আমি ওঁনাকে কখনো “দাদা” বলি নি, সামনাসামনি তো নয়ই, বন্ধুমহলেও না। উনার সঙ্গে কোনো ছবিও দিতে পারি নি ফেসবুকে, খবরের কোনো চ্যানেল অব্দি চালাতে পারিনি সেদিন। কেন জানিনা একটা মন খারাপের আবহ তৈরী হয়ে গেল চারপাশটায়। মা কেও জানালাম। একটা স্তব্ধ উপত্যকার মধ্যে হঠাৎ করে এসে পড়লাম যেন। যেখানে আমার আপন বলতে কেউ নেই। শুধু মাইলের পর মাইল জুড়ে নৈঃশব্দের ঘুঙুর বেজে যায়। শান্ত, সমাহিত একটা আখড়া দূরে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে। যেখানে কেউ কেউ আসে, আমারই মত, খুব কষ্টের সময়গুলোতে। এখানে মেহমানদারী বলতে কিছুই নেই। শুধু কপালজোর থাকলে দেখা পেয়ে যেতে পারেন কারো কারো। যাদের কোনো না কোনো সময় কেউ একলা রেখে চলে গিয়েছে। যারা আপনার কোনোদিন ও আত্মীয় হয়ে উঠে নি, যাদের আপনি “দাদা” বলে ডাকার ও সুযোগ পান নি। ভালোবাসা টুকু থাক শুধু যেখানেই।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com