ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাগর চৌধুরী

(কলকাতা থেকে): স্কুলের ছাত্র থাকার সময় থেকেই আমার একটি প্রিয় অভ্যাস সময় পেলেই কোন পাঠগারে গিয়ে বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করা। একটা সময়ে পশ্চিম বঙ্গের সমস্ত শহরের পাড়ায় পাড়ায় ছোটবড় সাধারণ পাঠাগার থাকতো এবং সেগুলো লোকজন ব্যবহার করতে পারতো মোটামুটি অবাধে। তাছাড়া, সামাজিক মেলামেশার এবং নানা বিষয়ে আলাপআলোচনা, মত বিনিময়ের জায়গাও ছিলো এইসব পাঠাগার। এমনকি গ্রামেও পাওয়া যেতো সাধারণ পাঠাগারের সন্ধান। প্রায় তিন দশক বিলেত প্রবাসের সময়েও সাধারণ পাঠাগার ব্যবহারের প্রভূত সুযোগ পেয়েছি। লন্ডনে বা অন্যান্য শহরে প্রত্যেক পৌর এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের দ্বারা পরিচালিত সর্বসাধারণের জন্য চমৎকার সব পাঠাগার আছে এবং এগুলো ব্যবহার করা যায় বিনা দক্ষিণাতেই। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, কলকাতায় বা পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য শহরে  গ্রামের কথা তো বাদই দিচ্ছি , সাধারণ পাঠাগার আজকাল প্রায় ডোডো পাখির মতোই বিরল বস্তুতে পরিণত হয়েছে। বড় বড় কয়েকটা বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোন ভালো পাঠাগার পরিচালনা করে না কেউই, এবং এগুলো একদিকে যেমন ব্যয়বহুল, অন্য দিকে তেমনই নানা নিয়মের নিগড়ে বাঁধা। সরকারী পাঠাগার থাকা না থাকা একই কথা, যথেষ্ট বইপত্র তো নেইই, বসে পড়ার ব্যবস্থাও না থাকারই মতো। দক্ষিণ কলকাতার যে এলাকায় আমি থাকি সেখানে অনেক খুঁজেও কোন ব্যবহারযোগ্য সাধারণ পাঠাগারের সন্ধান পাইনি, শহরের অন্যত্রও সম্ভবত একই অবস্থা। তাই বিলেতের লাইব্রেরীগুলোর কথা ভাবলে মন খারাপ হয়ে যায়।

অবশ্য সরকারী পরিচালনাধীন অন্তত একটি ভালো পাঠাগার কলকাতায় আছে, এবং সেটি সাধারণ পাঠাগার বলেই পরিচিত। মুস্কিল হলো, এই পাঠাগার শহরবাসীর প্রত্যেকের সহজ নাগালের মধ্যে নয়। লন্ডনে যেমন ব্রিটিশ লাইব্রেরী, কলকাতায় তেমনি জাতীয় গ্রন্থাগার, যার কথা পুস্তকপ্রেমীমাত্রেই জানেন। তবে যাঁরা সেই অর্থে পুস্তকপ্রেমী নন তাঁরাও কিন্তু এই গ্রন্থাগারের নাম শুনেছেন শহর কলকাতার প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলির একটি হিসাবে। আলিপুর এলাকার বেলভিডিয়ার রোড-এ অবস্থিত ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার, ইংরেজিতে National Library of India, দেশের সর্ববৃহৎ সাধারণ পাঠাগার। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী তার সংগ্রহে আছে কমবেশি ২২ থেকে ২৫ লক্ষ পুস্তক, পত্রপত্রিকা, সরকারী নথিপত্র ও দলিল-দস্তাবেজ। এছাড়াও আছে কমপক্ষে ৮৬,০০০ মানচিত্র এবং প্রায় ৩,৫০০ পান্ডুলিপি। প্রচুর গাছপালায় ভরা ত্রিশ একর জমির উপর অবস্থিত গ্রন্থাগারের মূল ভবন স্বাধীনতাপূর্ব যুগে ছিলো বাংলার ব্রিটিশ লেফ্টেন্যান্ট গভার্নারের সরকারী বাসভবন।

  ১৮৩৬ সালে তৎকালীন কলকাতার কয়েকজন বিশিষ্ট ধনী ব্যক্তির উদ্যোগে , যাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর, ‘ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরী’ নামে একটি পাঠাগার স্থাপিত হয়। দরিদ্র পরিবারের ছাত্ররা তাদের লেখাপড়ায় সাহায্যের জন্য এই পাঠাগার ব্যবহার করতে পারতো বিনামূল্যে। সেই সময়ে ভারতের গভার্নার জেনারেল লর্ড মেটকাফ্ তথাকথিত ‘নেটিভ’, অর্থাৎ দেশি লোকজনের মধ্যে আধুনিক বিদ্যাচর্চায় উৎসাহ প্রদানের উদ্দেশ্যে কলকাতার ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের’ পাঠাগার থেকে ৪,৬৭৫টি পুস্তক ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরীতে স্থানান্তরিত করেন, অন্যান্য সূত্র থেকেও বেশ কিছু গ্রন্থ দান হিসাবে পাওয়া যায়, এবং এইভাবেই পত্তন হয় পৃথিবীর এই অঞ্চলের প্রথম সাধারণ পাঠাগারের। এমন একটি সুসংগঠিত ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত পাঠাগার ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম অর্ধে ইউরোপেও ছিলো না বললেই হয়।

এরপর কলকাতার দ্বিতীয় প্রধান পাঠাগার হলো ‘ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরী’, যেটি গঠিত হয় ১৮৯১ সালে কয়েকটি সরকারী সচিবালয়ের পাঠাগার থেকে সংগৃহীত বইপত্র দিয়ে। এদের মধ্যে ছিলো ‘ঈস্ট ইন্ডিয়া কলেজ’, ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’ এবং লন্ডনের ‘ঈস্ট ইন্ডিয়া বোর্ড’ থেকে পাওয়া প্রচুর গ্রন্থ। তবে এই পাঠাগারটি ব্যবহারের সুযোগ তখন সীমাবদ্ধ ছিলো কেবল ঊর্ধতন সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে।

আরো কয়েক বছর পর তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন মনে করেন যে সর্বসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী একটি পাঠাগার খোলা দরকার। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরী এবং ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরী এই দুই পাঠাগারেরই সুযোগসুবিধা সীমিত কিংবা তাদের ব্যবহারে বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আছে। তাই তিনি স্থির করেন যে দুই পাঠাগারকে একত্রিত করে একটি গ্রন্থাগার তৈরি করা হবে, এবং তাঁর এই সিদ্ধান্ত অনুসারে ১৯০৩ সালের ৩০শে জানুয়ারী তারিখে ‘মেট্কাফ্ হল’ নামে ভবনটিতে স্থাপিত হয় নতুন পাঠাগার যার নামও রাখা হয় ‘ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরী’। এই মেট্কাফ হল আগে ছিলো গভার্নার জেনারেলের সরকারী বাসভবন, লর্ড ওয়েলিংটন, লর্ড কর্নওয়ালিস্ এবং ওয়ারেন হেস্টিংস্ এখানে বাস করেছেন। ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরী’র দরজা পাঠকদের জন্য খুলে দেওয়ার পর গেজেট্ অভ্ লন্ডন পত্রিকায় লেখা হয়েছিলো: “It is intended that it should be a library of reference, a working place for students and a repository of material for the future historians of India, in which, so far as possible, every work written about India, at any time, can be seen and read.” প্রকৃতপক্ষে, সেই থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত সারা ভারতে যেখানে যত বইপত্র ছাপা হয়, যে কোন ভাষায়, সেই সঙ্গে পৃথিবীর যে কোন দেশে ভারত-সংক্রান্ত যা কিছু প্রকাশিত হয়, সবই এই গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত থাকে (প্রসঙ্গত, লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরীতেও অনেকটা এই ধরনের ব্যবস্থা আছে)। ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক সকলেই এখানকার পাঠকক্ষে এসে অবাধে পড়াশোনা করতে পারেন, গ্রন্থাগারের সদস্য হিসাবে নাম-ঠিকানা নথিভুক্ত করার পর বইপত্র ধার করে বাড়ি নিয়েও যাওয়া যায় দু-একটি শর্তসাপেক্ষে। গ্রন্থাগারের সংগ্রহের ‘ডিজিটাইজেশন’, অর্থাৎ বৈদ্যুতিন প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণের কাজও সম্প্রতি শুরু হয়েছে, প্রাথমিকভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বিশেষ মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য বইপত্র ও দলিলকে। এই প্রক্রিয়া অবলম্বনের ফলে গ্রন্থাগারে উল্লেখযোগ্য স্থান-সংকুলানও সম্ভব হবে।

ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের কেন্দ্রীয় সরকার ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরী’র নতুন নাম দেয় ‘ন্যাশনাল লাইব্রেরী’ বা ‘জাতীয় গ্রন্থাগার’। মধ্য কলকাতার ‘এস্প্ল্যানেড’ অঞ্চলে তার সাবেক ঠিকানা থেকে আলিপুরের বেলভিডিয়ার রোডে তাকে স্থানান্তরিত করার পর, ১ ফেব্রুয়ারী ১৯৫৩ তারিখে জাতীয় গ্রন্থাগার সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

ভারতের বৃহত্তম এই সাধারণ পাঠাগার একটি কেন্দ্রীয় সরকারী প্রতিষ্ঠান এবং এটি পরিচালিত হয় ভারত সরকারের ‘তথ্য ও সংস্কৃতি দফ্তরের’ দ্বারা। ২০১০ সালে জাতীয় গ্রন্থাগারের প্রাচীন মূল ভবন ও সংলগ্ন অন্যান্য বাড়িগুলি সংস্কারের দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অভ্ ইন্ডিয়া’ (অঝও) নামে সংস্থাটিকে। সংস্কারের কাজ চলার সময় এই সংস্থার প্রকৌশলীরা মূল ভবনের একতলার মেঝের নিচে প্রায় ১০০০ বর্গফুট আয়তনের একটা ঘরের সন্ধান পান যাতে ঢোকার কোন দরজা খুঁজে পাওয়া যায় না। ঐ এলাকার কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন যে তাঁদের পূর্বপুরুষরা মনে করতেন ঐ ঘরটা তৈরি করিয়েছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস্ এবং অন্যান্য পদস্থ ব্রিটিশ কর্মচারীরা অপরাধীদের আটক রেখে শাস্তি দেওয়ার জন্য, আবার কারো কারো ধারণা যে সেখানে মূল্যবান ধনসম্পদ লুকিয়ে রাখা হতো। শেষ পর্যন্ত স্থির হয়, প্রথমেই ঘরের মেঝে না ভেঙে একটা বড় ছিদ্র করে দেখার চেষ্টা হবে ভেতরে কী আছে। বছরখানেক বাদে অনুসন্ধানকারীরা ঘোষণা করেন যে ঐ ঘরটা সম্পূর্ণভাবেই কাদামাটি দিয়ে ভরা, তাঁদের ধারণা গোটা বাড়িটার ভিতকে দৃঢ় রাখার উদ্দেশ্যেই সম্ভবত এই কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিলো।

ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রথম গভার্নার জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস্ থাকতেন এই ভবনে, কলকাতা ছেড়ে বিলেতে চলে যাওয়া পর্যন্ত। একটি জনশ্রুতি হলো যে হেস্টিংস্-এর প্রেতাত্মা নাকি এখনও রাত্রে ভবনের ঘরে ঘরে, অলিন্দে অলিন্দে ঘুরে বেড়ায়, মাঝে মাঝে তার অস্পষ্ট অপচ্ছায়া কারো কারো চোখে পড়েও যায়। কিন্তু দুশিচন্তার কিছু নেই, কাউকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া বা আক্রমণ করা এই প্রেতাত্মার উদ্দেশ্য নয়, সে কেবল খুঁজে বেড়ায় কালো রঙের একটা দেরাজওয়ালা টেবিল, যেটা নাকি হেস্টিংস্-এর জীবদ্দশাতেই হারিয়ে গিয়েছিলো। ঐ টেবিলটা খুঁজে পাওয়া তার জন্য অত্যন্ত জরুরী, কারণ ওটার মধ্যেই সযত্নে রক্ষিত ছিলো এমন কিছু দলিলপত্র যেগুলির সাহায্যেই নাকি বিলেতী পার্লামেন্টের হাউজ অভ্ কমন্সের বিচারসভায় প্রমাণ করা যেতো যে হেস্টিংস্-এর বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগগুলি মিথ্যা। কিন্তু ওয়ারেন হেস্টিংস্-এর দুর্ভাগ্য যে ঐসব কাগজপত্রসহ হারিয়ে যাওয়া টেবিলটা তিনি বিলেত যাত্রা করার আগে কিছুতেই খুঁজে পাননি। তাই মৃত্যুর পরেও তাঁর প্রেতাত্মার শান্তি নেই, সে বেচারা জানেই না যে ঐসব দলিল খুঁজে পাওয়ায় বা না পাওয়ায় এখন আর কিছুই যায়-আসে না।

হেস্টিংস্-এর প্রেতাত্মার এই কাহিনী অনেকের কাছে এতই বিশ্বাসযোগ্য যে জাতীয় গ্রন্থাগারের নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত যেসব রক্ষী রাত্রে সেখানে পাহারায় থাকেন, তাঁদের কেউ কেউ নাকি ভূত তাড়ানোর অমোঘ অস্ত্র হিসাবে ‘হনুমান চালিশা’ হাতে নিয়ে টহল দেন। তাঁদের দাবি, একাধিকবার তাঁদের চোখে পড়েছে, দুশো বছর আগেকার অভিজাত ইংরেজ ভদ্রলোকদের মতো পোষাক পরা একটা ছায়ামূর্তি নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই প্রাচীন ভবনের আনাচে-কানাচে। বিশ্বাস, বা অবিশ্বাস, একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com