ভাবিয়া করিও কাজ…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
হোমায়েদ ইসহাক মুন

হোমায়েদ ইসহাক মুন

পরীর বয়সটাই এমন যে, শুধু ডানা ঝাপটে উড়তে চায় মন, মুক্ত বিহঙ্গের মতো। কোনো বাধাতেই তার মন বাঁধে না। নতুন নতুন জিনিসকে সে আলিঙ্গন করে নি™ির্^ধায়। পরখ করে দেখতে চায়, কোন পাত্রে কী রাখা আছে। সব কাজেই উৎসাহ-উদ্দীপনার কোনো কমতি নেই। বয়োঃসন্ধির সময়টায় সবারই এমনটা হয়। কৈশোরের দিনগুলো যারা ফেলে এসেছেন, তারা হয়তো সেদিনকার সুখ-দুঃখের স্মৃতিগুলো আজও হাতড়ে বেড়ান। কৈশোরের এই সময়েই নতুন কোনো জিনিসের প্রতি অতি উৎসাহ অনেক সময়ই বিপত্তি ঘটায়। শুভ সবেমাত্র সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। সে তার বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছে, সিগারেট খেলে নাকি স্মার্টনেস বাড়ে। মেয়েরা একটু ঘুরে তাকায় ছেলেদের দিকে। বন্ধুদের আড্ডায় গিয়ে তাই সে একদিন জিনিসটা পরখ করে দেখে। এতে শরীরে নতুন কোনো শিহরণ অনুভব করে সে। আর তারপর থেকেই এর শুরটা। সে যে তার জীবনে কত বড় ভুল পথে পা বাড়িয়েছে, তা হয়তো নিজেও ভাবতে পারেনি।
পরীর বাবা অনেক ধুমপান করেন। পরী এবং তার ভাইবোনরা তা দেখে অভ্যস্ত। একদিন তিনি সিগারেটটা শেষ না করেই রেখে চলে যান। আর পরীর মনে কৌতূহল জাগে, বাবা প্রতিদিন কী খায় এসব, আমিও একটু খেয়ে দেখি! পরী বাবার সিগারেটে টান দিয়েই কাশতে কাশতে শেষ। পরীর বাবা কিন্তু একবারও চিন্তা করলেন না, তার এই ধূমপানের কারণে তিনি নিজের শরীরের যেমন ক্ষতি করছেন, তেমনি তার ঘরের ছোট ছেলেমেয়েদের কত অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। এটা হয়তো তিনি ভেবে দেখেননি। সেদিন রেডিওতে শুনতে পেলাম, কোনো এক স্কুলপড়ুয়া মেয়ে ক্ষুদে বার্তায় লিখেছেÑ তার বাবা তার পড়ার রুমে এসে ধুমপান করেন; তার অনেক কষ্ট হয়। আরও একটি ব্যাপারে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা এখন অনেক অগ্রসর। আর তা হলো, ধূমপানের পাশাপাশি তারা অ্যালকোহল পানে অভ্যস্ত হচ্ছে। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা কোনো না কোনোভাবে এসবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। সিগারেট এবং ড্রিংক করা থেকেই একসময় তারা ঝুঁকে পড়ছে মাদকের মরণ নেশার পথে। আর পরিণামে তারা মৃত্যুপথযাত্রী হচ্ছে।
মাদক আমাদের তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়। আর এর শুরুটা হয় ধূমপান থেকেই। বিশ^ স্বাস্থ সংস্থার মতে, প্রতি ৮ সেকেন্ডে ধূমপান বা তামাক সেবনজনিত রোগে একজন করে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। তামাক সেবনের কারণে প্রতি বছর ৫ মিলিয়ন লোক মৃত্যুবরণ করছে। গবেষকরা মনে করেন, ২০২০ সালে এর সংখ্যা ১০ মিলিয়নে পৌঁছতে পারে। আর পৃথিবীতে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ™ি^তীয় স্থানে রয়েছে তামাক। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৫০ ভাগ পুরুষ এবং ৩ ভাগ নারী ধূমপান করে। এর মধ্যে ১৬ ভাগ পুরুষ এবং ৩১ ভাগ নারী তামাক বা তামাক জাতীয় দ্রব্য ব্যবহার করে থাকে।

inside chobi_jan-4-2017.1 (1)
যারা ধূমপান করেন, তারা কি জানেন, একটি সিগারেট সেবনে ১১ মিনিট আয়ু কমে। হিসাব করলে দেখা যায়, সারাদিনে ১০টি সিগারেট সেবন করে আয়ু কমে প্রায় ২৮ দিন। ধূমপান যারা করেন, তার চেয়ে অধূমপায়ীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বিশে^র ২৫ ভাগ মানুষ ধূমপানের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষতিগ্রস্থ করা ছাড়াও অধূমপায়ী ৭৫ ভাগকে ক্ষতিগ্রস্থ করে থাকে। ধূমপান ছাড়াও তামাক জাতীয় পণ্য মুখ, ফুসফুস, মূত্রথলি, খাদ্যনালি এবং অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়াও শ^াসকষ্ট, হজমে গন্ডগোল, আলসার, কাশি, রক্তে নানা রকম সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, হƒদরোগ এবং বুকের নানা রকম অসুখের জন্য সিগারেট, বিড়ি, গুল, অর্থাৎ তামাকই দায়ী। শুধু ধূমপানের কারণে প্রতি বছর সোয়া লাখেরও বেশি লোক বিভিন্ন রোগে মারা যায়। ধূমপায়ীদের পেপ্টিক আলসার সহজে নিরাময় হয় না এবং এটি প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার ফলাফল পর্যন্ত বদলে দেয়।
আমাদের দেশে এখন মেয়েরাও ধূমপানসহ মাদক সেবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। ধূমপায়ী নারীদের মধ্যে মৃত এবং কম ওজনের শিশু জš§দানের ঘটনা তুলনামূলক বেশি। অনেক সময় ধূমপায়ী নারীদের গর্ভজাত শিশুরা নানা রকম ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে জš§াতে পারে।
বিশ^ব্যাপী মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে ইউনাইটেড নেশন্স অফিস অন ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইম (UNODC)। তারা আন্তার্জাতিকভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে অবৈধ এবং ধ্বংসাͧক মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরিতে, যার প্রধান গ্রহীতা হচ্ছে যুব সমাজ। তাদের প্রচারণার মূলমন্ত্রহলোÑ ‘তোমার জীবনে মাদকের নিয়ন্ত্রণ কর? তোমার জীবন, তোমার সম্প্রদায়ে মাদকের কোনো স্থান নেই।’
তাদের ভাষ্য মতে, বিশেষভাবে কিশোর এবং যুবকরা অবৈধ মাদকের আক্রমণে গ্রাস হচ্ছে। মূলত সাধারণ জনসংখ্যার প্রায় ™ি^গুণ সংখ্যক তরুণ প্রজš§ এই ভয়াবহ মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। যুক্তরাষ্টে ১৮ বছরের কমবয়সী ছেলেমেয়েদের কাছে মাদকদ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে তা এখনও ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায় না।

inside chobi_jan-4-2017.1 (3)
তাহলে হয়তো অনেক কিশোর-তরুণরা বেঁচে যেত। ফিফা এবং আইসিসিসহ বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থা সিগারেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের স্পন্সর নিষিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে Narcotics Control Act-১৯৯০ চালু আছে। NCA Convention অনুযায়ী সমগ্র মাদকদ্রব্যকে ৩ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর জন্য মৃত্যুদন্ড- থেকে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে আইনে। এই আইনের অধীনে ১৯৯০ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ৪টি অনুবিভাগের মাধ্যমে এর কার্যত্রক্রম পরিচালিত হয়ে থাকেÑ ১. প্রশাসন, প্রশিক্ষণ ও অর্থ ২. নিরোধ শিল্প গবেষণা ও প্রকাশনা ৩. অপারেশন ও গোয়েন্দা ৪. চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। এছাড়া এই অ্যাক্টের অধীনে Narcotics Control Board (NCB) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এত আইন থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের কিশোর-তরুণরা এর মারাত্তক ছোবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না।
মাদকদ্রব্য মূলত আফিম ও ক্যানাবিস জাতীয় গাছপালা থেকে তৈরি হয়ে থাকে। অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী তার এক লেখায় উল্কেèখ করেনÑ ‘বাংলাদেশে প্রতি বছর ৮ হাজার কোটি টাকার সিগারেট পুড়ছে, যা দিয়ে দুটি যমুনা সেতু নির্মাণ করা যায়। তাছাড়া তামাকজনিত বিভিন্ন অপচয় রোধ করতে পারলে দেশে সোয়া কোটি ক্ষুধার্ত লোককে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়াসহ বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থসেবায় ব্যয় বরাদ্দ করা যাবে। একটি সিগারেটের তামাকে রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ এবং গ্যাস, যার মধ্যে ২৮ ধরনের পদার্থ ক্যান্সার বৃদ্ধির কারণ। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশে^ ১৫ কোটি শিশু-কিশোর অপরিণত বয়সে মৃত্যুবরণ করে শুধু নানা রকম মাদকদ্রব্যের কারণে।
নেশা জাতীয় দ্রব্যের মধ্যে অ্যালকোহল বিশেষভাবে উলেলখযোগ্য। এর ক্ষতিকর দিক রয়েছে হাজারটা। এর মধ্যে যকৃত এবং অগ্নাশয়ে মারাত্মক ভাবে ক্ষতি সাধন করে এই অ্যালকোহল। দীর্ঘকালব্যাপী প্রচুর পরিমাণ অ্যালকোহল সেবনে অ্যালকোহলিক হেপাটাইসিস হতে পারে। এর ফলে যকৃত ধীরে ধীরে ধ্বংস এবং অšেúর স্থায়ী রোগে যকৃত বিকল হয়ে যেতে পারে। এছাড়া রক্তের কোষগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে এবং নিয়স্ত্রণাধীন রক্তপ্রবাহ ঘটবে। অ্যালকোহল সেবনে যকৃতে চর্বি জমবে এবং এর ফলে যকৃতের কাজ বল্পব্দ হয়ে কোমায় অথবা মৃত্যুমুখে পতিত হতে পারে। নারীদের অ্যালকোহল সেবনে সন্তাান জš§দানে এবং স্তন ক্যান্সারের মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া নারী-পুরুষ উভয়ের যৌন ক্ষমতা হীন হতে পারে।

inside chobi_jan-4-2017.1 (2)
অ্যালকোহল সেবনে ফুসফুসে ব্যাপক প্রদাহ হবে এবং এর প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে। দীর্ঘদিন ধরে অ্যালকোহল সেবনে মস্তিস্ক চিরতরে বিকারগ্রস্ত হতে পারে। মূলত অ্যালকোহল ¯œায়বিক উত্তেজনা এবং মানসিক অস্থিরতা প্রশমনের কাজ করে আমাদের কেন্দ্রীয় ¯œায়ু পদ্ধতিতে; এবং এর পাশাপাশি ধ্বংস করে দেয় মস্তিস্কের স্নায়ুকোষ। এর ফলে ঘুমের তীব্রতা বাড়ে, অচেতন হয়, শ^াস-প্রশ^াসে অকৃতকার্যতা, কোমাতে যাওয়া এবং শেষে মৃত্যু। এইচডিআরসি প্রকাশিত এক তথ্যে দেখা যায়, ১৫ বছর ও তদহৃর্ধ্ব বয়সী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তামাক ব্যবহারের হার ৩৭ শতাংশ এবং তামাকজনিত সামাজিক ব্যয় বার্ষিক ৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। তামাক ব্যবহার নিয়šúণ করা গেলে যে পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে, তা ™^ারা ১ কোটি মানুষের পু®িদ্বহীনতা লাঘব করা যাবে। আমাদের সচেতন হতে হবে, আর বাড়াতে হবে ব্যাপক হারে সচেতনতা। বাড়ির শিশু-কিশোররা যেন এর মরণ ছোবল থেকে বিরত থাকে, সেদিকে বড়দেরকেই দৃস্টি রাখতে হবে। ঘরের বাবা-চাচা বা বড় ভাইরা যদি ছোটদের সামনে ধুমপান বা মাদকদ্রব্য সেবন করে, তাহলে পরোক্ষভাবে হলেও শিশুরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। বিশে^র বিভিন্ন দেশে সিগারেটের প্যাকেটে ধুমপানের নানা ক্ষতিকর দিক সর্ম্পকে সবাইকে অবহিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাংলাদেশেও এর প্রয়োগ আছে। কিন্তু কেউ এতে মাথা ঘামায় না। সম্প্রতি ব্রাজিল সিগারেটের মোড়কের গায়ে ধুমপানের ফলে নানা রকম ভীতিকর অসুখের ছবি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে দেখা গেছে, ধূমপায়ীর সংখ্যা শতকরা ৭০ থেকে ৬০ ভাগে নেমে এসেছে। আমাদের দেশেও এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, যেখানে ক্ষতিকর দিকগুলোর ছবি প্রকাশ করা হবে। অন্তত: এর ফলে কিছুটা হলেও ধুমপায়ীর সংখ্যা হ্রাস পাবে। তরুণ প্রজš§কে বাঁচাতে আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। পরিবারের বড়দেরকে আগে এ থেকে বিরত থেকে ছোটদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর রাখতে হবে। ভালো বন্ধু যাচাই করতে হবে এবং ছোটদের হাতে অহেতুক যেন বেশি অর্থ চলে না যায়, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে তাদের উন্নত মানসিকতার প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। যত ভালো কাজের সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত হবে, ততই মানসিকতা উন্নত হবে এবং মাদক থেকে তারা দূরে থাকবে।
অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে এই সমাজের তরুণ প্রজš§কে রক্ষায়। পরীর বাবার মতো অসংখ্য বাবা যদি মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, তবে তরুণরা এর থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবে আর আমাদের তরুণƒণদের এই মরণ ছোবল থেকে মুক্ত করতে সচেতন সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com