ব্লকবাস্টার সিনেমাসে রিনা ব্রাউন দেখার পর…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইভা আফরোজম খান

যুদ্ধ কি কেবল একটি দলকে বিজয়ী চিহ্নিত করে? একটি দলের বিজয় আর অন্য দলের পরাজয় এবং তার পরেই সব শেষ? যুদ্ধ যে করতেই হবে এই সিদ্ধান্তই বা কে নেয়? জনগণ না রাষ্ট্র নায়ক? দেশ চালানোর জন্য, কখনো ক্ষমতা বহাল রাখার জন্য রাষ্ট্রনায়করা ঘোষণা দেন যুদ্ধের। যিনি সিদ্ধান্ত নেন যুদ্ধের তিনি কি নিজে গিয়ে যুদ্ধ করেন? অস্ত্র হাতে ঝাপিয়ে পরেন জীবন বাজী রেখে? মা, ভাই, বোন, বাবা, প্রেমিকা তাদের ছেড়ে মৃত্যুর দিকে হামাগুরি দেন কাদা-মাখামাখি হয়ে? না। তার কোনটিই তারা করেন না। শুধু ঘোষণা দেন যুদ্ধের। আজন্ম পালিত বাহিনী ঝাপিয়ে পড়ে যুদ্ধে। সাধারণ মানুষের ভাগ্যে দুর্ভাগ্য লেখন হয় নেতার কলমের কালিতে।। তারা নিরুপায়। নেতাই নির্ধারণ করেন কে হবে তার শত্রু আর কে তার আপন। প্রতিবেশি হিন্দু পরিবার মূহুর্তে হয়ে যায় নেতাদের সিদ্ধান্তে পরম শত্রু। কিন্তু তার ঘরে যখন নুন ছিল না কিংবা ছিল না অসময়ে এক মুঠো ভাত, বাচ্চার বায়না সামলাতে প্রতিবেশির ঘরেই দিতে হয়েছে হানা, নেতার কাছে না… সেই কী তবে পরক্ষণেই পরম পর তাদের বিচলিত মস্তিষ্কের খোঁচায়? তারা কি ভেবে দেখেছেন এই ভিটে ছেড়ে তারা কেন যাবেন পরদেশে? এই আলো বাতাস মাটিকেই তো তারা বড় ভালবেসেছিল, আপন ভেবেছিল, নিজের করে নিয়েছিল। তারা আজ ভীনদেশী?

 জনগণের ইচ্ছেতেও হয় যুদ্ধ। যখন সমগ্র জাতি জেগে ওঠে, যখন তাদের রক্তে প্রতিধ্বনিত হয় প্রতিরোধের স্লোগান, নেতার সঙ্গে যখন তারাও সমস্বরে ডেকে ওঠে- জাগো বাহে কুণ্ঠে সবাই– তখন সেই জাতিকে কে রুখে, এমন সাধ্যি কার? এ যুদ্ধ তখন অনিবার্য। তথাপি, যুদ্ধ কি কেবল দুই পক্ষের লড়াই ও হার-জিত? একপক্ষের বিজয় চিহ্নিতকরণ?

কে করে যুদ্ধ, কে তাকে জোগায় সাহস, কে দেয় মুখে অন্ন? যুদ্ধ কী শুধু তার যে থাকে সম্মুখে মরণাস্ত্র হাতে? সমরক্ষেত্রে যুদ্ধ ছাড়াও কত বড় যুদ্ধ ঘটে যায়, মানুষের মনে, শরীরে, নারীর দেহে? স্বপ্নের অট্টালিকা গুড়িয়ে পড়ে অদৃষ্টে পোতা মাইনে। ভাষাশহিদ রফিক ঢাকায় এসেছিল তার বিয়ের শপিং করতে। যার সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক, সে ছিল প্রতীক্ষায়- রফিক ফিরবে, তার সঙ্গে হবে তার বিয়ে, লাল শাড়িতে তাকে কেমন দেখাবে মনে মনে এঁকে নিয়েছিল সে চিত্র। মেয়ের বাবা আদরের মেয়ের বিয়ের দেবার জন্য বিক্রি করে দিল গোয়ালের গরু…(হয়তো)। খেতের ফসল তুলে আবার একটা গরু না হয় কিনে ফেলা যাবে! ভাল ছেলে তো আর পাওয়া যাবে না। মা অনেক কষ্টে  জমানো তার শেষ সম্বলটুকু ও হাতে তুলে দিল বিয়ের বাজার-সদাই করার জন্য। তখন খবর যখন আসে, রফিক শহীদ…তখন রফিক আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, কিন্তু সেই মেয়েটি কি এক দিনের জন্য ও মরে নাই? সেই মেয়ে কে কি বয়ে বেড়াতে হই নাই অপয়ার পদবি? বিয়ে কি আর হয়েছিল তার? সংসার? হলেও কি আলিঙ্গনের সময় তার মনে ভেসে ওঠে নাই একবারও রফিকের মুখ? সে কি কোন দিন গেয়েছিল এই গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী…? রফিক আজ তার ভাই। একটা সংগ্রাম, একটা স্মৃতির মিনার। এই মিনার শুধুই কি রফিক, শফিক, বরকত, জব্বার, আওয়ালের? সেই মেয়ের কষ্ট আর গ্লানিরও কি নয়? ‘ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’এ তো সবে শুরু…নয় মাস মুক্তির যুদ্ধে আরও কত কী না হয়েছিল?

লাখ লাখ মানুষ মরেছে, ঘর-পুড়েছে, রাস্তা ভেঙ্গেছে, দেশ ছাড়া হয়েছে শত শত মানুষ,উদ্বাস্তু, দুর্ভিক্ষে মরেছে শয়ে শয়ে। নারী হয়েছে ধর্ষিত, জন্ম হয়েছে  কত যুদ্ধ শিশুর। মা হয়েছে পুত্র হারা, বধু স্বামীহীন।এই তো সত্য। সবাই জানি। পড়েছি, লিখেছি। ১৬ আর ২৬ শে কত গেয়েছি। শুধুই কি এই? যারা বেঁচেছে তারাও কি বেঁচে মরে নাই? তাদের স্বপ্ন মরে নাই? আশা, ভালবাসা বদলে যায় নাই? যুদ্ধ শুরু হল, যুদ্ধ শেষ হল। যারা বেঁচে থাকল তারা বদলে গেল। যুদ্ধে যাবার আগে যাকে কথা দিয়ে রেখেছিল যুদ্ধ শেষে বিয়ে করবে। সেই মেয়ে কেন তাহলে বিয়ে করতে আর রাজি হয় না তাকে? যুদ্ধ আমূল পালটে দেয় সুকুমার অনুভূতি, আর বোধ।যুদ্ধ তাকে কী শেখায় যে আর সে রাজি হয় না তাকে বিয়ে করতে? ভালবাসার পাগলামিকে ছাড়িয়ে সে হয়ে ওঠে বাস্তবসম্মত পূর্ণবয়স্ক মানুষ। যে প্রেম অল্প বয়সে সম্ভব, বয়স বেড়ে গেলে তার খেলাটা আর জমে না। যুদ্ধ মানুষকে পূর্ণবয়স্ক করে তোলে। রিনা ব্রাউন তাই ফিরিয়ে দেয় দারাকে। কোমল কোমল মিষ্টি মিষ্টি অনুভূতি আর থাকে না। শঙ্কা, ভয় আর মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষগুলো বদলে যায়।

রিনা ব্রাউন ( সান্ড্রা) চরিত্রে প্রমা পাবনী খুব ভালো করেছেন। তার সাবলীলতা ভাল লেগেছে। এমনকি পূর্ণবয়স্ক চরিত্রেও সে খুব ভাল করেছে। আর ভাল লেগেছে বয়স বাড়ানোর জন্য অহেতুক মেকাপ, গেট আপের বাহুল্য না থাকাতে। ভাল অভিনয়ই পারে এই সব অপূর্ণতা ভরিয়ে তুলতে। একাত্তরের পাত্র-পাত্রীদের বোঝাতে সত্তর দশকের ডিজাইনে কস্টিউম না পরিয়ে অভিনয় আর গল্প কথনের উপর জোর দিয়েছেন পরিচালক যার কারণে উপস্থাপন ভিন্ন লেগেছে, নাটক-সিনেমায় দেখা অভ্যস্ত চোখে তা প্রথমে খটকা লেগে থাকলেও বাহুল্য বর্জনের এই চেষ্টায় উপস্থাপন হয়েছে স্নিগ্ধ, সাধারণ ।এমনকি দারার বাবার মৃত্য বোঝাতেও আদিখ্যেতার বর্জন ভাল লেগেছে। ২য় অংশে দ্রুত সব ঘটনা ঘটতে থাকে। পরিচালক তার দক্ষতার আঁচড়ে দর্শককে টেনে ধরলেন যাকে বলে টান টান উত্তেজনায়। কী নির্মল কথোপকথন, বাস্তবিক অনুভূতির প্রকাশ, কিছু না বলেও নিঃশব্দের ভাষায় বৃদ্ধ দারা আর সান্ড্রা ছুঁইয়ে গেল দুজন দুজনকে, দর্শককে। পর্দায় কী চমৎকার অনুভূতির খেলা। তখন আর অচেনা ঘটনা বলে মনে হয় না এসবকে, কি এক জাদুর ছোঁয়ায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে যায় দর্শকের চোখ। বাস্তব জীবনের মত সতেজ মনে হয় আবার তেমনি ঘোর আর মায়া লাগা। দারার আবার সেই বাস্তব জীবনের কাছে ফিরে আসা। তাহলে কোনটা সত্যিকারের বাস্তব? বাইরের যাকে দেখি আমরা প্রতিদিন, নিত্যকার চাহিদাগুলো পূরণ করে যাচ্ছে, সামাজিকতা আর সৌজন্যতার মাপকাঠি দিয়ে সন্তুষ্ট করে যাচ্ছে সবাইকে, নাকি তার মনের গহীনে যে ভালবাসা, যে বিদ্রোহ, যে উত্তাপ যার দেখা কেউ পায় না, সেটা? আজকের সফল কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব যিনি, প্রতিরাতে তারও মনে ভেসে ওঠে যুদ্ধাহত প্রিয় বন্ধুর মুখ। তার বন্ধু যুদ্ধে বাঁচেনি, দারা বেঁচেছে। কিন্তু সন্তর্পনে আজও যে বয়ে বেড়াচ্ছে প্রথম প্রেমের স্মৃতি -যুদ্ধ যাকে মিলিত হতে দেয় নি,  বয়ে বেড়ায় বিপ্লব আর যুদ্ধের সেই দিনগুলোর কথা। কিন্তু সেই মুখগুলো আজ আর কোথাও দেখে না। পরানের গহীন ভিতরে কি খেলা করে তার খবর কেউ আর রাখে না এই ফেসবুকের যুগে। দেখি সেই মানুষটিই আজ কেক নিয়ে বাড়ি ফিরবে বলে তার স্ত্রী আর কন্যা প্রতীক্ষায়। স্ত্রীর মুখে আজ বহুদিন পর প্রশান্তির হাসি।

রিনা ব্রাউন শামিম আখতারের গল্প, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় সাম্প্রতিককালের একটি সিনেমা।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com