বোধ তৈরি হয় যত, চলে যাওয়া বুকে বাজে ততই…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রিনি বিশ্বাস

জন্মের প্রথম মুহূর্তই বলে দিয়েছে যেতে হবে একদিন; কবে, কখন- তা শুধু বলেনি… বোধ তৈরি হয় যত, ‘চলে যাওয়া’ বুকে বাজে, ততই… কাকভোরে চিত্তদাদা এসে কড়া নেড়েছিল সেদিন; ঘরে ঘরে টেলিফোনের চল নেই তখনও, খবরাখবর যন্ত্র নয়, মানুষই আনা নেওয়া করতো… ভাই সদ্যোজাত.. রিনুর মনে পড়ে মা শাড়ি পরতে পরতে চোখ মুছছে আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলছে ‘বাবু বোধহয় চলেই গেল’… মামাবাড়িতে বড় হওয়া চিত্তদাদা ফাইফরমাশ খাটতো আর দাদুমণিকে তাঁর ছেলেমেয়ের মতই ডাকতো ‘বাবু’ বলে; সেদিন ‘বাবু’র প্রস্থানের সংবাদ পৌঁছতেই চিত্তদাদা হাজির হয়েছিল ফুলদির কাছে; যদিও ‘বাবু নেই’ সে বলেনি, বলেছিল ‘শিগগির চলো ফুলদি, বাবুর শরীর ভালো নেই’… কিন্তু মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের কনিষ্ঠা কন্যা কিভাবে যেন টের পেয়েছিল তার বাবা-‘বাবু’ না-ফেরার দেশে চলেই গেছেন… আর দেখতে পাবে না তাঁকে….রিনুর মনে দাগ কাটা প্রথম প্রস্থান-প্রথম মৃত্যু… দাদুমণির মৃত্যু…. যাঁরা মৃত্যুকে চলে যাওয়া বলেননা, রিনু তাঁদের দলে নেই… ধরাছোঁয়ার বাইরে, আদর-আব্দারের বাইরে চলে যাওয়া কি যাওয়া নয়?! যাওয়াই তো, এমন দেশে যাওয়া – যেখানকার হদিশ সেখানে না পৌঁছলে, কেউ জানতে পারেনা, পারেনি, পারবেওনা…. পরের ধাক্কা এলো বেশ ক’বছর পরে… যখন দিম্মাও পাড়ি দিলেন সেই না-ফেরার মুলুকে… বুকে বেজেছিল কষ্টটা; রিনু জানতে পেরেছিল মেয়ের মেয়ে অর্থাৎ মেয়ের ঘরের নাতনির অশৌচ নেই-হয়না.. মেয়ে অশৌচ পালন করবে তিনদিন-চতুর্থীতে তার কাজ.. মেয়ের ঘরের নাতিও করবে কাজ-দানও… জামাইয়েরও একরাত(?) অশৌচ; কেবল নাতনি এসবের বাইরে… কি অদ্ভুত! কি কঠিন! কি বাজে নিয়ম; মনে হয়েছিল রিনুর… দিম্মা তবে তার কেউ নয়….! এ কেমন শাস্ত্রের বিধান! কাছের একজনের হঠাৎ নেই হয়ে যাওয়ায় যে শূন্যতা, তাতে শোক প্রকাশের অধিকারও থাকবেনা তার! দিম্মার চতুর্থীর কাজ হচ্ছিল রিনুদের টালিগঞ্জের ফ্ল্যাটের বাইরের ঘরে.. পাশাপাশি মা আর মাসি… দুজনের দুচোখ বেয়ে অঝোরধারা… পুরোহিতমশাই কেন যেন বলেছিলেন ‘কাজ সার্থক হল, চোখের জল পেয়ে…’ মনে আছে ভাই ছাতা দান করেছিল… নাতিকে নাকি তা করতে হয়…. রিনু যখন এম এ ক্লাসের ছাত্রী, সদ্য তারা উঠে গেছে নিজেদের বাড়িতে তখন ঠাকুমাও চলে গেলেন সব ধরাছোঁয়ার বাইরে… ৯৯ সাল.. জুন মাসের ১তারিখ…খবর এলো টেলিফোনে.. ঠাকুমা আর নেই… পাঁচ নাতনির দুজনের বিয়ে দেখে, এক নাতনির কোল আলো করা ‘পুতি’ দেখে আর চার নাতি নিয়ে ভরভরন্ত সংসার ফেলে ৯৬ বছর বয়সে তিনি স্বর্গবাসী হয়েছিলেন… তবু, রিনু এই চলে যাওয়া মানতে পারেনি আজও! এখনও চারু মার্কেটের বাড়ির ভিতরের ঘরে বসে সোনাকাকা-কাকিমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে মনে হয়, ঠাকুমা বাইরের বারান্দার চেয়ারেই বসা… যে কোন সময় ডেকে উঠবেন ‘ও রিনি, রিনি রে…’! রিনুর জন্মের সময়ই তাঁর ৭৫ বছর বয়স.. রিনু আজন্ম ঠাকুমাকে দেখেছে সাদা ধবধবে থান পরতে… কপালে পুজো দেবার পর চন্দনের ফোঁটা আর খয়ের দিয়ে হামানদিস্তায়(দাঁত ছিলনা একটাও) ছেঁচা পানে টুকটুকে রাঙা দুটি ঠোঁট… ছেলেদের ঘরে পরপর পাঁচ নাতনি; পাড়াপ্রতিবেশী কে যেন এতে উতলা হয়ে বলেছিল ‘কি হবে গো!’ তাড়া দিয়ে বলেছিলেন ‘তোমাগো কি! নাতনি তো আমার!’ সারাদিনে তিনবার খেতেন। সকালে দুধমুড়ি, দুপুরে ভাত, সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় আবার দুধমুড়ি-ওটাই ওঁর ডিনার.. এর বাইরে একমাত্র বিজয়া দশমীতে মিষ্টি খেতেন তাঁর রোজকার নিয়ম ভেঙে…ভোরবেলা উঠতেন ঘুম থেকে, সন্ধ্যে গাঢ় হলেই ঘুমোতে চলে যেতেন। দুপুরে বসতেন তাঁর ইয়া মোটা রামায়ণ মহাভারত নিয়ে পড়তে… মনে রাখতে পারতেন না কত অবধি পড়লেন, পরদিন আবারো একই পাতা থেকে শুরু হত তাঁর পড়া.. সকলের বিবাদ মীমাংসায় তাঁর ডাক পড়তো; সকাল সকাল বাজার সেরে এসে ছোটবউমাকে কুটনো কেটে দিয়ে বেরোতেন পাড়া বেড়াতে; আশপাশের জ্ঞাতিদের সবার খোঁজ নিতেন নিয়মিত! দু-দুটো ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে প্রতি সকালে মেজছেলের বাড়ি যেতেন নাতি নাতনির সঙ্গে দেখা করতে…হাতের ঠোঙায় কোনদিন থাকতো জিলিপি, কোনদিন গুজিয়া কোনদিন বা পটল বিস্কুট… কলিংবেলে হাত পৌঁছতোনা; ছোটখাটো ছিলেন ঠাকুমা.. লোহার গেটে ধম্ ধম্ শব্দ করে – পাড়া জানিয়ে ডাক দিতেন ‘ও রিনি, রিনি রে’…. রিনুর বাবা চাকরিসূত্রে বেশিরভাগ সময়ই কলকাতার বাইরে; শনিবার রাতে ফিরে সোমবার ভোরের ট্রেনে আবার চলে যেতেন কাজের জায়গায়… প্রতি রবিবার, রিনু আর ভাইকে নিয়ে বাবাই-মা যেতেন ঠাকুমাবাড়ি… নাতিরা ছিল চঞ্চল, কথা শুনতোনা, পালিয়ে যেত দুদ্দার; রিনুকে বসাতেন কাছে; দুধমুড়ি গরাস করে তুলে দিতেন নাতনির মুখে… এ নিয়মের নড়চড় হয়েছে বলে রিনুর মনে আসেনা…. সেই ঠাকুমার ‘নেই’ হয়ে যাওয়া রিনু কোনভাবেই মানতে পারলোনা তাই… সেই প্রথম রিনু দেখলো শশ্মান… দেখলো অন্তিম কাজ কি… দেখলো কিসব মন্ত্র পড়ে, গায়ে ঘি মাখিয়ে দেবার পর ঠাকুমা চলে গেল গনগনে আগুনের মধ্যে…. মুখাগ্নি কেন করতেই হবে, প্রশ্ন জুড়লো রিনু…এত নিজের মানুষ যতদিন বেঁচে ছিলেন-ভাবতেও কি পেরেছি তার গায়ে-মুখে আগুন ছোঁয়ানোর কথা… যেই তিনি নেই হয়ে গেলেন-কেন তবে ভাববো এমন!! শুনলো না কেউ; শুধু বাবাই চুপিচুপি বলে দিলেন ‘আমার এসব কোরোনা, দেহদান করে যাবো, ওদের খবর দিয়ো…’! পরের বেশ কয়েকদিন মাঝরাতে রিনু মানুষপোড়ার গন্ধে উঠে বসেছে… ফুপিয়ে কেঁদে উঠেছে… নাহ্, আজও এই মৃত্যু তাকে কাঁদায়… বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রিনু টের পায় যাওয়ার দিকেই লাইন বাড়ছে; থাকার মানুষ ক্রমেই কমতির দিকে…বোঝে এই তো জীবন… তবু মানতে পারেনা… তাই কালিকাপ্রসাদের হঠাৎ এই মর্মান্তিকভাবে অকালে চলে যাওয়া রিনুকে রাতজাগায়… পরদিনের ভোরে ওঠা-লাইভ অনুষ্ঠান সেরেই ইভেন্টের জন্য তৈরি হবার কথা মাথায় রাখা সত্ত্বেও সেরাতে ঘুমের ওষুধও কাজ করেনা! বারবার মনে পড়ে এরাতের সকালটাও তো নিটোল ছিল… কে জানতো বেলা বাড়লে তা এভাবে ছিঁড়েখুঁড়ে একসা হবে! চোখের পাতা ভারি হয় আর আশাবরীর মুখ মনে আসে; মনে আসে ঋতচেতাদির হাসিমুখ… ওরা কি দোষ করলো! এভাবে কেন দাঁড়ি পড়লো কালিকা’দার জীবনে! কতজন সোশ্যাল মিডিয়ায় ক-তকিছু লিখলেন-কেউ লিখলেন ‘শোক প্রস্তাব মুলতুবি থাক, আত্মাকে মুক্তি দাও, তার তো বিনাশ নেই…’! কেউ বা লিখলেন ‘কেন সবাই কালিকাপ্রসাদকে শান্তিতে থাকতে বলছো! পাঁচবছরের শিশুকন্যাকে ফেলে রেখে কোন্ বাবা পারে শান্তিতে থাকতে..’! কবি লিখলেন ‘গান ফিরেছে মাটির কাছে, মৃত্যু কেবল মিথ্যে হোক..’! এই তোলপাড়, এই অস্থির হওয়া, এই ডুকরে কেঁদে ওঠা-আজ বাদে কাল শান্ত হবে… আবার দশটা-পাঁচটার নিশ্চিন্ত জীবনে ফিরবে সবাই, ফিরবে রিনুও… তবু থেকে যাবে কিছু কথা, গান আর প্রাণ.. থাকবেই আমাদের সব-সব কাছের মানুষেরা… যাদের দেখতে হয়তো পাবোনা, ছুঁতেও হয়তো পাবোনা আর, তবুও তারা থাকবেই…চলে যাবার পরেও- এক্কেবারে নিজের করে তাদের আটকে রাখবো আমরা; রাখবে রিনুও..

ছবি: সৌজন্যে লেখক

পড়ুন

ছোটবেলা আসলে নরম একটা মনকেমন
ছবিগুলোতে লেগে থাকা আদরগুলো কেমন আজীবন ঘিরে রাখে
পাওয়া, না-পাওয়া নিয়ে মাথাব্যথা ছিলনা রিনুর

এই যে আমার স্কুল…

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com