বৈশাখ এলেই সেই মেলাটা আসে!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

একটু দূরেই পদ্মা নদী। বর্ষা আসতে এখনো অনেক দেরী, তারপরও পদ্মার দুরন্তপনার শেষ নেই। এখানে, ঠিক এখানটায় পদ্মা নদী এসে একটু বাঁক নিয়েছে। সেই বাঁকের কাছেই একটা বট গাছ। গাছটার বয়স কতো, কেউ সঠিক বলতে পারে  না। নদীপাড়ে যাদের বয়স ৮০ বছর ছুঁই ছুঁই তারা বলে, প্রাচীন এই বটগাছটার বয়স ৩০০ বছর। তরুণরা অনেক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বলার চেষ্টা করে,  গাছটির বয়স ১০০ বছরের একটু বেশি।
নদী ছিলো আরো পশ্চিমে। পাড় ভাঙতে ভাঙতে, একটার পর একটা গ্রাম গ্রাস করতে করতে নদী এখন বটগাছটার কাছে এসে কিছুটা স্থির-শান্ত হয়েছে। তবে বর্ষায় নদী কোন রূপ নেবে তা কেউ বলতে পারে না। নদী পাড়ের মানুষ বলে, আকাশের মেঘ, নারীর মন আর পদ্মা নদীর খেয়াল ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। তবে গত তিন-চার বছর এই বাঁকে পদ্মা তেমন ভাঙেনি। তাই মেলাটা এখনো বসে বটগাছের তলায়।
কবে, কোনকালে নদীকে সাক্ষী মেনে, এই খানে, এই বটতলায় মেলার শুরু কেউ জানে না, যেমন স্থির জানে না কেউ বটগাছের বয়স কত, জানে না এই নদীর বয়সের কথাও!
তো, কখন বসে মেলা? যখন বাতাস মাতাল হয়; যখন সে বাতাসে দামাল উড়ে বেড়ায় ঝরাপাতা আর পদ্মাপাড়ের মিহিবালু, তখন। তো, তেমনি এক দিনে বাবার কাছে তুমুল বায়না করে, ছোট্ট ছেলেটি বাবারই হাত ধরে মেলায় যায়। সে ঘুরে ঘুরে দেখে নানা রঙের সেই মেলা। কোথাও বাজছে বাঁশের বাঁশি। কোথাও ঢোলের তালে নাচছে সঙ। কোথাও চড়কগাছে দোল খাচ্ছে ফুটফুটে শিশুরা। মেলার এক কোণায় বড় বড় কড়াইয়ে ডোবা তেলে ভাজা হচ্ছে নিমকি। মুরালি আর মিষ্টি বানানো হচ্ছে গভীর মনোযোগে। মিষ্টির কত নাম- জিলেপি, আমৃত্তি, বালুসাই আর রসগোল্লাতো আছেই।
ঊাবর সঙ্গে ছেলেটা সব দেখে। দেখতে দেখতে বেলা গড়ায়। বৈশাখের প্রথম দিনের প্রখর সূর্যতাপ একটু কমে আসে। সেসময় বাবা ছেলেটাকে একটা মিষ্টির দোকানের সামনে বসিয়ে কী একটা কাজে যায়। তারপর হঠাৎই চারদিকে অন্ধকার। পশ্চিম আকাশ প্রথমে লাল হয় । তারপর হয় ভীষণ কালো। মুহূর্তেই এলোমেলো হয় বাতাস। শো শো শব্দ। বাতাসের সঙ্গে উড়তে থাকে ধুলার সাগর। একটু আগেও আকাশ জুড়ে ভুবনচিলদের ওড়াউড়ি ছিলো, তারা কোথায় মিলিয়ে গেছে কেউ জানে না! একে একে বন্ধ হয়ে যেতে থাকে মেলার দোকানগুলো। মেলায় আসা মানুষ দিগি¦দিক ছুটতে থাকে একটু আশ্রয়ের জন্য।  ছেলেটা কী করবে? দৌড়ে যাবে কোনো নিরাপদ জায়গায়? কোনো দোকানের ভেতর? অথবা অন্য মানুষের সঙ্গে ছুটবে? কিন্তু বাবা যে তাকে বলেছে একদম না নড়তে। এসে যদি তাকে না পায়! এসব ভাবতে ভাবতে বাতাস আরো তেজি হয়। শুরু হয় প্রচন্ড ঝড়। ছেলেটা বুকফাটা কান্না শুরু করে।  কাদতে কাঁদতেই যুদ্ধ শুরু করে ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে। তুমুল বৃষ্টির সঙ্গে। কোথা থেকে উড়ে এসে একটা গাছের ডাল পড়ে তার শরীর ঘেষে। তারপরও জায়গাটা ছেড়ে যায় না সে। ভাবে সে, বাবা কি তাহলে ভুলে গেছে তার কথা? বাবা কি তারই মতো বিপদে পড়েছে? বাবা কি আর তাকে নিতে আসবে না?
সেই বৈশাখী ঝড়ের বিকেল বেলায়, সেই পদ্মা নদীর বটগাছের তলার মেলায় ছোট ছেলেটাকে বাবা এসে উদ্ধার করেছিলো। ছেলেটা এখন অনেক বড়, তারপরও, রুদ্রররূপী বৈশাখ এলে তার মনে পড়ে পিছনে ফেলে আসার সেই নদীর কথা, নদীপাড়ে বটগাছটার কথা। সেই ঝড়ের কথা। আর মনে পড়ে বাবার হাত!

 লেখক: গল্পকার,ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com