দুটি অণু গল্প

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আন্জুমান রোজী, কানাডা থেকে

বৃষ্টিভেজা সূর্য

রাতে তুমুল ঝড়বৃষ্টির তাণ্ডবলীলা বয়ে গেলো। টিনের চালে বৃষ্টির উৎপাতে রাহাত সারারাত ঘুমোতে পারেনি। দমকা হাওয়া আর মোষলধারে বৃষ্টির দাপটে উঠোনের ওপারে বড়বড় বৃক্ষসারির এলোপাথাড়ি দানবশব্দ; ভয়ে রাহাতের দু’চোখের পাতা এক হয় না। পুরো পৃথিবী যেন দুমড়েমুচড়ে ভেঙ্গে পড়ছে। মাথার কাছে হ্যারিকেনের আলোটা একটু উজিয়ে দিয়ে ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে নেয়। দেখে নেয়, ঘরের সবকিছু ঠিক জায়গায়`আছে কিনা! ডানদিক দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে ঘরের চারদিক দেখতে গিয়ে বা’দিকের দেয়ালে রাহাতের চোখ থমকে যায়। ঘরের বা’পাশের দেয়ালটা রাহাত সবসময় আড়াল করে চলে। চোখ ফিরিয়ে রাখে অন্যদিকে। কিন্তু এই ঝড়ের রাতে সেই দেয়ালে চোখ পড়তেই দেখে, একটি মানুষের অবয়ব, অবিকল নিজের মতো। কেমন নির্লিপ্ত চাহনি রাহাতের দিকে! চোখ পড়ামাত্রই মেরুদণ্ড বেয়ে একঝলক বরফনদী বয়ে যায়। দখিনের বন্ধ জানালার ফাঁকফোকর দিয়ে বিদ্যুৎ চমকানোর আলো ঠিকরে ঢুকছে ঘরের ভিতর, তারই ছিটেফোটায় এক ভূতুড়ে পরিবেশ তৈরি করে। আতঙ্কে রাহাতের সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসে। মনে হয়, কে যেন তার দিকে এগিয়ে আসছে!

বেশ’কদিন ধরেই রাহাত কেমন একটা ভয়ের মধ্যে আছে। বুকের বাম অলিন্দে সারাক্ষণ চিনচিন ব্যথা অনুভব হচ্ছে। কোথাও কোনো অঘটন বা কোনো অভিসম্পাত কিছু ঘটছে কিনা, কে জানে! একেএকে কাছের যারা, তাদের কুশলাদী জানতে চাইলো। ভালইতো আছে সবাই। তবে এ কেমন যন্ত্রণা বুকের ভিতর, রাহাত বুঝে উঠতে পারছে না। সবকিছু ছেড়েছুড়ে রাহাত এখন বাপ-দাদার ভিটেবাড়ি, গ্রামে এসে থিতু হয়ে বসেছে। জীবনের বাকিটা সময় এই গ্রামের আলোছায়ায় পার করে দিবে এমনটাই ইচ্ছে। এসেছে বেশিদিন হয়নি। এরই মাঝে শুরু হয়ে গেলো এক অজানা আতঙ্ক। তার উপর চলছে এমন ঝড়ের তাণ্ডব, কিছুতেই কোনো কিছু মিলাতে পারছে না। বা’পাশের দেয়ালে রাহাত আর ফিরে তাকায় না। অপেক্ষা করতে থাকে কখন দিনের আলো ফুটবে। এসব আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতে রাহাতের চোখ বন্ধ হয়ে আসে। একসময় ক্লান্তিতে ঘুমিয়েও পড়ে ।

ঘুম ভাঙতেই বিছানা থেকে আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে জানালা খুলতেই দেখে বাইরে বৃষ্টিভেজা সূর্য । গাছের পাতাগুলো বৃষ্টিতে ধুয়ে আরও সজীব হয়েছে। উঠোনে বৃষ্টির জল জমেছে। বাড়ির মানুষের কোনো সাড়াশব্দ নেই। কোথায় গেলো সবাই? হয়তো তারাও সারারাত ঝড়বৃষ্টির দাপটে ঘু্মোতে পারেনি। ধীরেধীরে ঘরের বাইরে বের হয়ে এলো রাহাত। ঝোপঝাড়ের ফাঁকে সূর্য আলোর ছিটেফোঁটায় রাহাত পুলকিত হয়ে ওঠে। আনচান মন নিয়ে বাড়ির বাহিরে চলে এলে হঠাৎ করে হাতের মুঠোবন্দী ফোনটি বেজে উঠলো। এই সাতসকালে কে ফোন দিলো ভেবে ফোনটা কানের কাছে নিতেই ওপার থেকে নিরবকান্নার ধ্বনি ভেসে এলো। আরো গভীর করে শুনার জন্য ফোনটি কানেচেপে ধরতেই ওপাশ থেকে বললো- ‘রাহাত, মৌমিতা আর নেই। গতরাতে রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে।’

রাহাত অস্পষ্ট স্বরে শুধু ‘মৌমিতা’ বলে উঠলো। আর কোনো কথা না বলে ফোনটি বন্ধ করে আবার ধীরপায়ে ঘরের দিকে পা বাড়ালো। শত শত স্মৃতি এসে ভিড় করতে লাগলো। মাথাটা আচমকা কেমন যেন করছে! শেষদেখার দিন ঠিক গতরাতের মতো বৃষ্টি ঝরেছিলো। রাহাতের দু’হাত ধরে মৌমিতা অনেক কেঁদেছিলো। কিছুকিছু বিচ্ছিন্নতা হয়তো এমন করেই ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

রাহাতের গভীর ভালোবাসার নাম ছিলো মৌমিতা। চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলো অন্যের হাতধরে নতুন জীবন গড়ার জন্যে। রাহাত পারেনি তার বোহেমিয়ান জীবন বিসর্জন দিতে। তাই মৌমিতা চলে যাবার পর গ্রামে চলে আসে। স্মৃতি হিসেবে ছিলো একটি পোট্রেট, যা মৌমিতা রাহাতের ছবি নিয়ে এক আর্টিস্ট দিয়ে করিয়ে দিয়েছিলো।

ঘরের ভেজানো দরজা আলতো হাতে ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই দেখে বাম পাশের দেয়ালের সেই পোট্রেটটি নিচে পড়ে আছে, বৃষ্টির পানিতে ভিজে একাকার!

ঢেউ
গল্প করতে করতে কমল আর মায়া গল্পের এক মোহনায় এসে দাঁড়ালো। গল্পের ডালপালা অনেকদিকে ছড়িয়েছিটিয়ে গেলেও শেষপর্যন্ত এক মোহনায় এসে থামতে হলো। গল্পতো নয় যেন স্বপ্নবিলাস। ঘুরে বেড়ানোর এক প্রবোদ আমোদ। সারাবছর মায়া আর কমল স্বপ্ন দেখে পৃথিবী ঘুরে দেখার। সাধ আছে কিন্তু সাধ্য নেই। তাই যখনই দুজন ঘন হয়ে বসে গল্পে মশগুল হয় তখনই স্বপ্ন দেখে পৃথিবী ভ্রমণের। চেষ্টা করে একটুএকটু করে পয়সা জমিয়ে ভ্রমণ করার জন্যে। চেষ্টা চালিয়েও যায়। কিন্তু সাধ বা সখ তো পাখির মতো নয়, যে ইচ্ছে মতো ওড়ে বেড়াবে। তাই মাঝেমাঝে পাখির ডানা ভেঙ্গে সখের ইচ্ছেগুলো যাতে বেশী দূরে উড়ে না যেতে পারে তার ব্যবস্থা করে। তখন কমল আর মায়া খুঁজতে থাকে কাছে কোথাও যাওয়া যায় কিনা। কাছের সাগর, পাহাড়, কিম্বা অরণ্য; এমন কোনো একটি জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা করতে শুরু করে। ভেবেভেবে শেষপর্যন্ত সাগরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ওরা। সেই প্রথম যখন কমল  রোদছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়েছিলো বাসস্ট্যান্ডে তখন মায়াকে দেখে বলেছিলো,’ এই মেয়ে সমুদ্রে যাবে?’ গুরুকণ্ঠের এমন আবেদন ভরা আহ্বান শুনে মায়া একপলক তাকিয়ে থমকে গেলো। এমন শব্দ, এমন ভাষার পর হয়তো আর কিছু থাকে না কিম্বা আর কিছু বলার নেই। হঠাৎ করে মায়ার ওপর নস্টালজিয়া ভর করে। কমল আলতো একটু ধাক্কা দিয়ে বললো, কি হলো? চুপমেরে গেলে যে!

মায়া সলাজ হেসে বললো, ‘তোমার সাথে প্রথম দেখার কথাগুলো মনে পড়ে গেলো। সমুদ্র দেখার আহবান। সেই সমুদ্রে যাওয়া হচ্ছে আমাদের বিয়ের ন’বছর পর।‘
–তাতে কি। যাওয়া তো হচ্ছে। আর কল্পনায় তুমি তো আমার একবুক সমুদ্র। ডুব দিয়ে দিয়ে হীরে জহরত কুড়াই। বলেই কমল মায়াকে দু’বাহুতে জড়িয়ে নিলো।
ব্যাগ গুছিয়েই পরেরদিন ভোরে রওনা দিলো দুজনে। সমুদ্র দেখার উন্মাদনা শরীরে মনে উত্তেজনা এনে দিচ্ছে। মায়ার আবার জল ভীষণ প্রিয়। জলের কাছে গেলেই এক শ্রান্তভাব এসে ভর করে। কমল তা বুঝে বলেই এমন সিদ্ধান্ত নিলো।
গান বাজছে কানের পাশে। চলতি পথের সুর। ছুটে বেড়ানোর আনন্দসুর। “আমার বেলা যে যায় সাঁঝবেলাতে, তোমার সুরেসুরে সুর মেলাতে”।
সমুদ্রপাড়ে এসে দিগন্তে চোখ তুলে তাকাতেই মায়া আবিস্কার করে নিজেকে, একঅন্য মায়াকে। এই বিশালতার মাঝে মায়া হাত বাড়িয়ে দেয়, ধরতে চায় কমলকে। দেখে পাশে কমল নেই। কমল হাঁটতে হাঁটতে একাকী অনেক দূর চলে যায়!  এমন বিশালতার মাঝে এলে মানুষ বুঝি নিজেকে হারিয়ে ফেলে! যেমনটি হারিয়েছে মায়া নিজেকে! এই দিগন্তে যেন দুটো মানুষ ভিন্নরূপ নেয়। দুটো স্বত্বা ছিটকে যায় দুদিকে, দূর…থেকে দূরে, বহুদূরে।

মায়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কমলের হেঁটে যাওয়ার দিকে। ধড়াস ধড়াস করে বুকের ভিতর কেঁপে উঠলো। মনেহলো কমল আর ফিরে আসবে না। বাতাসে কালের শনশন সুর। উড়িয়ে নিতে চায় মায়াকে।
কিছুক্ষণ পর কমল ফিরে আসে। হাতটি রাখে মায়ার কাঁধে। বলে, ‘এখানে আমাদের বেশীক্ষণ থাকা ঠিক হবে না। চলো ফিরে যাই।‘
মায়া চমকে উঠে বললো, ‘সবে তো এলাম। এখুনি বলছো ফিরে যেতে।‘
—আমার ভাল লাগছে না, প্লিজ।!
অবাক হয়ে মায়া  জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি ঠিক আছো তো?’
–না, আমি ঠিক নাই। প্লিজ চলো।

অগত্যা ফিরে আসতে হলো তাদের। কমলের কিছু সুখস্মৃতি ডুবে আছে এই জলে যা জানে না মায়া। মায়া কোনোদিনও জানবে না। কমল কখনো বলবে না। শুধু জানবে এই সমুদ্রের বাতাস ও জল। বাতাস শুধু কানেকানে বলে গেলো, ভালো থেকো কমল। কমল শুধু বুঝে, তার সমুদ্র এখন  মায়া, ওর বুকেই  সমুদ্রের ঢেউ খুঁজে বেড়াবে। এদিকে মায়া বাতাসের উথাল-পাথাল শব্দে ছিন্নভিন্ন হতে থাকে। সমুদ্রজুড়ে তখন মায়াময় ঢেউ!

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com