বুড়ো মানুষ তবু কণ্ঠে কি তারুণ্য তারঁ…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

বিমোচন ভট্টাচার্য

আমি তখন চাকরী পেয়েছি সদ্য। সেভিংস এর কাউন্টার এ বসি। তখনো কৈলাশ বিল্ডিং হয় নি। আমাদের ব্যাঙ্কের ঠিকানা ছিল ৩৬, চৌরঙ্গী রোড।ডানদিকে আই টি সি আর বাঁদিকে আই সি আই। দুটোই ঝাঁ চকচকে অফিস। আমাদেরটাও বেশ ডেকরেটেড ছিল সেই সময়।
আসতে আসতে সড়গড় হচ্ছি। আই সি আই এ অনেক বয়স্ক মানুষ ছিলেন। ধুতি পাঞ্জাবী পরতেন অনেকে। ধুতি শার্টও পরতেন কেউ কেউ। একজন আসতেন যাকে দেখে আমার “জন অরণ্য”র আদক বাবুর কথা মনে হত। নাম ছিল সুশীল পাল। আমি ডাকতাম “পালদা” বলে। সেই সময় প্রায় সবাই বাবার নাম জানতেন। পালদাও।
আমার খাতির বেড়ে গেল। পালদা ডেকে ডেকে আই সি আই এর লোকেদের সংগে পরিচয় করিয়ে দিতেন আমি বিধায়ক ভট্টাচার্যের ছেলে বলে। একদিন এক দীর্ঘকায়, সাদা ধুতি শার্ট পরা ভদ্রলোকের সংগে আলাপ করিয়ে দিলেন এইভাবে – একে চেনো তো ভটচাজ, এর নাম বরুন চাটুজ্জে। উত্তমকুমারের মেজভাই। ভদ্রলোক বিব্রত বোধ করাতে বললেন – আরে সাধে কি আর তোমার সংগে আলাপ করিয়ে দিচ্ছি। এ হল বিধায়ক ভটচাজের ছেলে। বরুনবাবু একটু স্বাভাবিক হলেন। বললেন – আরে তাই, আমাদের বাড়িতে আপনার বাবাকে দেখেছি আমি। আমার মা আর বড়বৌদি খুব পছন্দ করেন আপনার বাবাকে।
আমার ওঁদের তিনভাইকেই দেখা হয়ে গেল। তারপর থেকে বরুনদার সব কাজ আমাকেই করতে হত।
আর একজন ছিলেন। ধুতির ওপর হাল্কা নীল রঙের শার্ট পরে আসতেন। নাম কুমুদ বন্ধু ঘোষ। একেবারে অখিল বন্ধু ঘোষের মত দেখতে। পালদাকে একদিন ধরাতে বললেন – ঠিক ধরেছো। কুমুদ অখিলবাবুরই নিজের ভাই। ও নিজেও খুব ভাল গান করে। একদিন সংগে করে নিয়ে এলেন। বললেন – অ কুমুদ, একে চেনো তো। এ হল বিধায়ক ভটচাজের ছেলে। অখিল বন্ধু চিরদিনই আমার প্রিয় গায়ক। ভাবলাম কুমুদদাকে একদিন বলবো অখিলবাবুর সংগে দেখা করতে যাব।

অখিল বন্ধু ঘোষকে আমি প্রথম দেখি /শুনি আমাদের পাড়ায়। দত্তবাগানের মোড়ে একটি বিরাট কালিপুজো করতেন নিমাই সামন্ত এবং তার দলবল। তখন কলকাতার নামী তিনটে কালিপুজোর একটা ছিল সেই পুজো। কি গ্রাঞ্জার ছিল সেই পুজোর!! কলকাতার সব নামকরা শিল্পীদের দেখেছি/ শুনেছি ওই পুজোর ফাংশনে। সেইখানেই প্রথম অখিল বাবুকে দেখি আমি। আনরুলি দর্শক। এদিকে তখন এত জনবসতি ছিল না। আশেপাশের এলাকাগুলো থেকে প্রচুর মানুষ আসতেন এবং তারা আসতেন মুলত মহঃ আজিজ, তিলক চক্রবর্তী দের গান শুনতে। রফিসাহেব আর কিশোরকুমারের গান করতেন এরা দুজন। অখিলবাবুকে দেখেই তাদের অসন্তোষ প্রকাশ পেল। অখিলবাবু মনে হয় এসবের জন্যে প্রস্তুতই থাকতেন। হারমোনিয়াম নিয়ে বসে প্রথমেই ধরলেন ” ও দয়াল, বিচার করো। সবাই যেন কেমন হয়ে গেল। মন্ত্রমুগ্ধ। তারপর এক এক করে গাইলেন – ওই যে আকাশের গায়/দুরের বলাকা ভেসে যায়, পিয়াল শাখার ফাঁকে ওঠে, অন্তত দশ খানা গান গেয়ে যখন উঠলেন সবাই তখন ভুলে গেছে মহঃ আজিজ বা তিলকের কথা।
তা কুমুদদার সংগে আলাপ হবার পর মনে বাসনা হল একবার অখিলবাবুর সংগে দেখা করলে কেমন হয়। কুমুদ দাকে বললাম সে কথা। উনি সংগে সংগে রাজী। বললেন – দাদার সংগে কথা বলে জানাবো আপনাকে।
একদিন এসে বললেন – আজ যেতে পারবেন? দাদাকে বলেছি আপনার কথা। আজ দাদার কোন কাজ নেই। ওঁদের ছুটি হত সাড়ে পাঁচটায়। আমি অপেক্ষা করছিলাম। উনি আসাতে চললুম ওঁর সাথে।
ভবানীপুরের কাছে একটা গলিতে থাকতেন উনি। গলিটার নাম সম্ভবত টার্ফ লেন। একটা মাঝারী সাইজের ঘরে ধুতি আর শার্ট পরে বসে ছিলেন উনি। সামনে এক দীর্ঘকায় মানুষ বসে ছিলেন। দেখেই উন্নাসিক মানুষ বলে মনে হয়েছিলা আমার। কুমুদদা পরিচয় দিলেন আমার। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে গেলাম, শশব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন- করেন কি, করেন কি, কত বড় মানুষের ছেলে আপনি!
হল না পাঠক, অখিলবন্ধু ঘোষের চরণস্পর্শ করা হল না আমার। অনিচ্ছায় কত মানুষকে প্রণাম করতে হয়েছে আমায় সারা জীবনে। কিন্তু অখিলবন্ধু ঘোষের চরণস্পর্শ করা হল না আমার।

আমায় জিজ্ঞাসা করলেন কেন দেখা করতে এসেছি। সবিনয়ে বলেছিলাম, শুধু আপনাকে একবার দেখতে এসেছিলাম। শুধু আমি নই আমাদের বাড়ির সবাই আপনার গানের ভক্ত। বাবাও। উনি কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন – কি যে বলেন।

চলে আসছিলাম বললেন – এসেছেন যখন তখন দুটো গান শুনে যান। ভাবতে পারেন!!!হারমোনিয়াম সামনেই ছিল। ধরলেন – কবে আছি, কবে নেই। এই কবে নেই যখন শেষ করলেন তখন হারমনিয়ামের সংগে হর্ষ ই টা মিলে গেল। মুগ্ধ হয়ে লক্ষ করছি। পরের গানটি গাইলেন – তোমার ভুবনে ফুলের মেলা / আমি কাঁদি সাহারায়। পরের লাইনে যখন গাইছেন “- ওগো কমলিকা, বুঝিলে না তুমি / আমি কত অসহায়। শিহরণ হচ্ছিল আমার।আমি কত অসহায়, আহা.. কি সুন্দর করে বলতেন!! আমার সামনে বসে এক কিংবদন্তি শিল্পী গান গাইছেন। অত্যন্ত সাধারণ দেখতে। বুড়ো মানুষ তবু কণ্ঠে কি তারুণ্য!এতটুকু অহংকার নেই।
ধন্য হয়েছিলাম সেদিন।খুশি মনে বাড়ি ফিরেছিলাম দু নম্বর দোতলা বাসে করে।

কাল শুনলাম সেই বাড়ি প্রমোটারের গ্রাসে গেছে। ফ্লাট বাড়ি হয়েছে সেখানে। শুনেছি নিঃসন্তান ছিলেন। কোথায় আছে তাঁর ব্যবহৃত হারমোনিয়াম বা অন্য সরঞ্জাম!! আদৌ আছি কী? কে জানে?

হারিয়ে গেছেন অখিলবন্ধু ঘোষ। ওই সময়েই কম্পিউটারের বিরোধিতা করছিলাম আমরা। তবে ভাজ্ঞিস শেষ অবধি এসেছিল কম্পিউটার। আর তার হাত ধরে আরও অনেক কিছুর সংগে ইউ টিউব! তাই তো অখিলবন্ধু এখন তাঁর গান নিয়ে বন্দী সেখানে। যখন ইচ্ছে শুনি তাকে।

দুরদর্শনে একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ওঁর জটিলেশ্বর বাবু। অনাড়ম্বর সেই অনুষ্ঠানটিও অনবদ্য হয়েছিল।

সেদিন উনি ওঁকে প্রণাম করতে দেন নি আমায়। আজ এই লেখা দিয়ে আপনার চরণস্পর্শ করলাম স্যার……..।

আজ আর চাইলেও বাধা দিতে পারবেন না আপনি…..।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com