বুদ্ধদেব বসুর পুরানা পল্টন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সেই পুরানা পল্টন। দেড়শো-দুশো বছর আগে এইখানটাই খাঁ-খাঁ ময়দান।এখানেই ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার ক্যান্টনমেন্ট? শহরের মানচিত্র বদলে যায়ম বদলাতে থাকে। কিন্তু নামগুলো? সেগুলো কিন্তু থেকে যায় ইতিহাসের মরচে বুকে নিয়ে। ইংরিজি শব্দ ‘প্লাটুন’ থেকে বাংলায় হয়ে গিয়েছিল পল্টন। আর সে থেওেকই এলাকার নাম পল্টন। পুরানা পল্টন, মানে ‘পুরনো সেনানিবাস’। সে যুগের ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডস নির্দেশ দিয়েছিলেন, শহরের উত্তর-পূর্ব দিকে, নবাবপুর-শাঁখারিবাজারের ও পারে গড়তে হবে নতুন এক ক্যান্টনমেন্ট— সিপাইদের ব্যারাক, অফিসারদের কোয়ার্টার্স, প্যারেড গ্রাউন্ড। সেটা ১৮২০সাল। পল্টন তখন বিশাল অজ ময়দান এক। পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর। মশা আর ম্যালেরিয়ার জন্মস্থান। সেই পল্টন হাতবদল হয়ে গেল পৌরসভার কাছে। তারা পল্টনের একটা অংশে বাগান করার সিদ্ধান্ত নিলো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামে তার নাম হল ‘কোম্পানি বাগান’। বাকি জায়গায় বিশাল ময়দান, শহরের শতাব্দীপ্রাচীন ঢাকা কলেজ-এর ছাত্ররা ফুটবল খেলতে আসে। ক্রমে সেই মস্ত মাঠটাই হয়ে দাঁড়াল সারা বছরের দৌড়ঝাঁপ, কুস্তি প্রতিযোগিতার জায়গা। লেফটেন্যান্ট গভর্নর বা বড়লাট ভিজিটে এলে সেখানেই হত কুচকাওয়াজ বা গুলিবন্দুক ছোড়ার কাজ। আর উনিশ শতকের শেষাশেষি মাঝে মাঝে হতে থাকল জনসভা। সেই পল্টনেই কি খুঁজে পাওয়া যাবে ৪৭ নম্বর পুরানা পল্টনের সেই বাড়ি যেখানে জীবনের তারুণ্য কাটিয়ে গেছেন সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু?

১৮২০-র দশকে যে পল্টনে ব্যারাক গড়ে উঠেছিল সেখানেই একশো বছর পর ১৯২০-র দশকের সেই পুরানা পল্টনেই দিদিমার তোলা টিনের বাড়িতে এসে এসে উঠছেন বুদ্ধদেব বসু। কুমিল্লার জন্মস্থান, নোয়াখালির শৈশব পেরিয়ে ঢাকায় এসেই নয় ক্লাসে ভর্তি হওয়া তাঁর, ম্যাট্রিক দেওয়া। উয়াড়ি এলাকার র‌্যাংকিন স্ট্রিট, আর্মানিটোলা, লালবাগের সাময়িক বাস শেষে যখন পুরানা পল্টনে এসেছিলেন তিনি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র তখন।  অনেকেই সে এলাকাটাকে তখন ডাকেন ‘সেগুনবাগান’ বলে। রমনার পূর্ব সীমান্তে, সত্যিই সেখানে এক কালে ছিল সেগুনের মস্ত বড় বন— বুদ্ধদেবের স্বচক্ষে দেখা। সেই বন কেটে পরে জমি বার করা হল, বাঙালি বাবুরা বাড়ি করে থাকবেন। বুদ্ধদেবের দাদু একটি প্লটের বায়না করেছিলেন। বেঁচে থাকতে  নিজে ঘর তুলে যেতে পারেননি। সেই ঘর তুললেন বিধবা দিদিমা। পদ্মার জলে তলিয়ে যাওয়া গ্রামের বাড়ির অবশিষ্ট কিছু করোগেটেড টিন তিনি পেয়েছিলেন স্বামীর উত্তরাধিকারে, সেইগুলো দিয়েই টিনের ঘর খাড়া করলেন পুরানা পল্টনে। গোটা পুরানা পল্টনে, এবড়োখেবড়ো মাঠের মধ্যে ছড়ানো-ছিটানো তিনটে মোটে বাড়ি তখন, তারই একটা ওঁদের। তিন কামরার ঘরের প্রথমটাতেই থাকেন বুদ্ধদেব। বর্ষাকালে মাটির মেঝে ফুঁড়ে কেঁচো বেরোয়, তাই দিদিমা ওঁর ঘরটুকু শুধু সিমেন্টের মেঝে করে দিলেন। মাঘ-রাতে সেই ঘরই হয়ে ওঠে বরফের বাক্স, তাই দেওয়ালে এঁটে-সেঁটে দিলেন খবরকাগজ।

বুদ্ধদেব দেখেছিলেন তাঁর ঘর থেকে পুবে-উত্তরে শুধু বনজঙ্গল আর তাঁর অনন্য গদ্যে ‘অনির্ণেয় গ্রাম’, দক্ষিণে রেললাইন পেরিয়ে নবাবপুরের বসতি। ৪৭ নম্বর পুরানা পল্টনের ঘরের বাইরে তুলসীমঞ্চ, পাতার ফাঁকে নীল চোখ মেলে থাকা অপরাজিতা আর শরতে স্থলপদ্ম ছিল, ঘাসের সবুজে জ্বলজ্বল করত লাল কেন্নো, চৈত্রের বাতাস উড়িয়ে নিত কবির কাগজপত্র, নিভিয়ে দিত সন্ধের কেরোসিন-ল্যাম্প। সারা দুপুর শোনা যেত ছাদ-পেটানোর গান— সারেঙ্গির বাজনা আর মুগুরের তালের সঙ্গতে গান গেয়ে চলা জন কুড়ি-পঁচিশ মুগুর পেটানো বাচ্চা ছেলে। পুরানা পল্টনের এই ঠিকানা থেকেই বেরোত বুদ্ধদেবের ‘প্রগতি’ পত্রিকা। বরিশাল থেকে ডাকে কবিতা পাঠাতেন জীবনানন্দ দাশ। গান পাঠাতেন কাজী নজরুল ইসলাম। অদূরে ইসলামপুর থেকে আসতেন বুদ্ধদেবের প্রিয় বন্ধু টুনু— জগন্নাথ কলেজের ছাত্র অজিত দত্ত। একসঙ্গে তুর্গেনেভ, রবীন্দ্রনাথের ‘পূরবী’ বা পলগ্রেভ সাহেবের বই থেকে শেলি-কিট্‌স-ব্রাউনিং পড়া, কলকাতা থেকে ডাকে আসা সাহিত্যপত্রিকা গোগ্রাসে গেলা। একশো বছর আগের পুরানা পল্টনে, বুদ্ধদেব লিখেছিলেন, ‘বাতাস অনেক বেশি স্বাদু, রাত্রি অনেক বেশি গভীর।’ যদি কখনও কোনও দুর্বিপাকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ডাবলিন শহরটা ধুয়েমুছে যায়, আমার লেখা থেকে আপনি তাকে ফের অবিকল তুলে আনতে পারবেন— জেমস জয়েস লিখেছিলেন তাঁর প্রকাশককে। এক-এক জন লেখকের কলমে এ ভাবেই তো ধরা থাকে এক-একটা শহর আর পাড়ার ইতিহাস-ভূগোল, আত্মা। বুদ্ধদেব বসুর লেখায় সেভাবেই মাটির তলায় যেন জেগে থাকে হারিয়ে যাওয়া পুরানা পল্টন।

সাহিত্য ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com