বিচিত্র কালচারের শহর মারাকেশ-১

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নিজামুল হক বিপুল

নিজামুল হক বিপুল

বছর পাঁচেক হল দেশের বাইরে যাচ্ছি। প্রতি বছর নভেম্বর-ডিসেম্বরেই যাওয়া হচ্ছে। উপলক্ষ বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন। সম্মেলন না বলে বলা যেতে পারে আন্তর্জাতিক পিকনিক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৫০ থেকে ৭০ হাজার লোক দিন কয়েক এর জন্য একত্রিত হন। সব ভেদাভেদ ভুলে সাদা-কালো চামড়া’র মানুষের মিলনমেলা ঘটে। সরকার, রাষ্ট্র প্রধান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা, এনজিও কর্মী, সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি, প্রতিবাদী তরুণ-তরুণী সাংবাদিক কেউই বাদ যান না। বিশাল এলাকা জুড়ে ভেন্যু তৈরি করা হয়। দিন নেই, রাত নেই নারী-পুরুষ সেখানে অবিরাম ব্যস্ত বৈঠকে, আলাপ-আলোচনায়। খাওয়া-দাওয়া, ছবি তোলায় ব্যস্ত সবাই।বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনকে পিকনিক বলছিলাম সঙ্গত কারণে। গত পাঁচ বছর ধরে এই সম্মেলনে অংশ নিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে আসলেই এটি একটি বিনোদন উৎসব। কারণ এখান থেকে গত পাঁচ বছরে বিশ্ব আসলে কি পেয়েছে- সেই হিসাব আজও মিলাতে পারিনি। আর জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা আমাদের মত ক্ষুদ্র ও দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো কতোটা লাভবান হয়েছে তাও বুঝে উঠতে পারছি না। অথচ যে দেশে এই উৎসব হয়, সেই দেশের পর্যটন ব্যবসা, আবাসিক ও খাবার হোটেলের ব্যবসা দিন পনেরো’র জন্য জমজমাট হয়ে উঠে। ওই কয়েকদিনে এক সম্মেলনে কেন্দ্র ঘিরেই অর্থাৎ কেন্দ্রের ভিতরেই হয় বিশাল বা

মারাকেশ শহরের প্রাণ মেদিনা ময়দানের রাতের চিত্র।

মারাকেশ শহরের প্রাণ মেদিনা ময়দানের রাতের চিত্র।

ণিজ্য। এই বাণিজ্য হয় শুধু খাবার নিয়েই। হালকা খাবার, কোমল পানীয় থেকে শুরু করে হার্ড ড্রিংকস সবই বিক্রি হয় অতিরিক্ত মূল্যে। তারপরও বিক্রির কোন কমতি নেই।এই সম্মেলন বা পিকনিক অনুষ্ঠিত হয় একেকবার একেক দেশে। কখনও ইউরোপে, কখনো বা লাতিন আমেরিকার কোন দেশে, আবার কখনও মধ্যপ্রাচ্য। সর্বশেষ সম্মেলনটি হয়ে গেল সাহারা মরুভুমির দেশ মরক্কো’র পর্যটন শহর মারাকেশ-এ।

মারাকেশ সত্যিই সুন্দর এক শহর। পুরনো আর নতুন শহর মিলিয়ে বিশাল এক শহর। বাসা-বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সব ভবনের গায়ের রং যেন একই। বাদামী। বিচিত্র এর কালচার। আফ্রিকার দেশ মরক্কোর এই পর্যটন শহর নিজস্ব কালচারকে ছাপিয়ে যেন হয়ে উঠেছে ইউরোপ, আফ্রিকা আর মধ্যপ্রাচ্যের মিশেলে এক অন্যরকম কালচারের শহর। জিব্রাল্টার প্রণালী পাড়ি দিলেই ওপাড়ে স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স। মরক্কো’র পাশের রাষ্ট্রই তিউনিশিয়া, মৌরিতানিয়া, মালি ও আলজেরিয়া। আছে মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি। আর আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিলে দেখা মেলে আমেরিকা-কানাডা’র। তবে মরক্কো’তে মূলত ইউরোপ, আফ্রিকা এবং মধ্যাপ্রাচ্যের সংস্কৃতিই বেশি প্রচলিত। সুনির্দিষ্টভাবে পর্যটন শহর মারাকেশে’র কথা বললে বলতে হয়, এখানে যেন ইউরোপের সংস্কৃতির ছোঁয়াটাই বেশি।মারাকেশ শহরের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে মেদিনা ময়দান। বিশাল এই ময়দান জুড়ে দিন-রাত চলে হাজার হাজার নারী-পুরুষের উৎসব। দিনভর বিভিন্ন খাবার আর ফলের ভাসমান দোকান থাকে। কয়েক প্রকারের খেজুর, কমলা

জাচার বছরের পুরনো কুতুবিয়া মসজিদ মিনার

জাচার বছরের পুরনো কুতুবিয়া মসজিদ মিনার

,আপেল, আঙ্গুর, বাদাম, কাজু বাদাম, কিসমিসসহ হেন কোন ফল নেই যা পাওয়া যায় না। হস্থশিল্পের বিভিন্ন পসরা নিয়ে মাঠের মধ্যেই বসে পড়েন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা লালচে বর্ণ ধারণ করা মারাকেশ যেন হয়ে উঠে অন্যরকম এক আকর্ষণীয় শহর। তাই এই শহরকে ‘রেড সিটি’ বা ‘রাঙা শহর’ও বলা হয়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের হৈ-হুল্লোড়, গান-বাজনা, বানরের খেলা, সাপের খেলা- কোন কিছুই বাদ যায় না। কেউবা ভুভু জ্বালা বাঁশি বাজিয়ে মাতিয়ে রেখেছে। আবার কেউ বা বিনোদন দিচ্ছে ছন্দের তালে তালে নেচে-গেয়ে।কেউ বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে ঘোড়ার গাড়ি বা আমাদের ভাষায় পুরান ঢাকার টমটম করে চড়ে বেড়ান শহরময়। আবার কেউবা মেদিনা ময়দানের একপাশে গড়ে উঠা চমৎকার সুন্দর পার্কের ভিতর বেঞ্চে বসে তুমুল আড্ডায় মগ্ন থাকেন।
পর্যটকরা শুধু যে ঘোরাঘুরি আর খেলা দেখা কিংবা গান-বাজনায় মত্ত থাকেন তেমনটাও নয়। এই শহরে আসা পর্যটকরা সন্ধ্যার পর ভোজন নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটান। মারাকেশের স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ থেকে বিশেষ করে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসা পর্যটকরা মেদিনা ময়দানে গড়ে উঠা ভাসমান খাবার দোকানগুলোতে ভিড় জমান। জম্পেশ আড্ডায় অনেকেই মেতে উঠেন ভোজনে। পর্যটকদের কাছে মারাকাশের প্রধান খাবার হচ্ছে ‘লাম তাজিন’, ‘চিকেন তাজিন’, ‘বীফ তাজিন’ আর নানা প্রজাতির মাছের ফ্রাই। আছে নানারকম সব্জি আর সালাদ। সব খাবারেই বাধ্যতামূলক দেখা মেলে কারো কিংবা লাল রং অলিভ এর। আছে আমাদের দেশের ভাতের ফ্যান এর মত এক ধরণের স্যুপ। খাদ্যরসিকদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয় এসব খাবার।(চলবে)

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com