বাড়ির কাছে আরশিনগর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

rupgong-4রাজধানীর দূষন, কোলাহল, জ্যাম, সবকিছু ঠেলে একটা গ্রামে যেতে চাই। সে গ্রামে থাকবে কাঁচা মাটির সোদা গন্ধ, নানা জাতের ফলের গাছ, মেঠো পথ, ধান মাড়ানিতে ব্যস্ত কৃষাণী, মুক্ত মনে বৃষ্টিতে ভেজা, ছায়াঘেরা পথ,তাজা সবজি, মাটির চূলায় রান্না করা খাবার আরো কত কি! নিজের দ্বিচক্্রযানকে সঙ্গী করে বেড়িয়ে পড়লাম গ্রামের পথে। খিলক্ষেত থেকে পূর্বদিকে রওনা দিলে খুব সহজেই সুন্দর কিছু গ্রামের সন্ধান পাওয়া যাবে। যেতে যেতে পথে অনেক কিছুই চোখে পড়বে যাতে মন ভাল হয়ে যাবার মত অনেক উপাদান আছে। খিলক্ষেত দিয়ে যাবার সময় সুউচ্চ দালান চোখে পড়বে যাকে সবাই লেক সিটি কনকর্ড বলে, আর আমি বলি তাকে পরিকল্পিত বস্তি। তার পাশ দিয়েই গেছে নারায়নগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের রাস্তা। ঢাকার খুব কাছে সুন্দর আর স্নিগ্ধ গ্রামের পথ। ঢাকার খিলক্ষেত অথবা ডেমরা দিয়ে ঢুকে রূপগঞ্জ হয়ে যাওয়া যায় শীতলক্ষ্যা নদী পর্যন্ত। যদিও বসুন্ধরার তিনশ ফিট রাস্তার কল্যাণে এখন সেদিকটায় যাওয়া বেশ সহজতর হয়েছে। যখন তখনই গাড়ি বা সাইকেলে চলে যাওয়া যায়। তবে গ্রামের মনোরম রাস্তা ধরতে চাইলে আপনাকে খিলক্ষেতের ভেতর দিয়েই যেতে হবে।
rupgong-6প্রাত ভ্রমণে প্রায়ই বেড়িয়ে পড়ি এ রাস্তা ধরে। এ পথে এগুতে থাকলে প্রথমে পড়বে বড়ুয়া, পাতিরা, ডুমনি, ইছাপুরা। খিলক্ষেত থেকে ইছাপুরার পথ পাঁচ কিলোমিটার আর এর পর থেকেই নারায়ণগঞ্জ জেলার শুরু । ইছাপুরাকে স্পর্শ করে এঁকে বেঁকে চলে গেছে বালু নদী। উপরে আছে একটি লোহার ব্রীজ। বালু নদীর প্রধান শক্র বালু তাই এখন এর করুণ দশা। আশেপাশের সব জায়গায় প্রতিনিয়ত বালু ফেলার ফলে পানির পরিমান এখন আনেক কম। এখনো মনে পড়ে, একযুগ আগে যখন আমরা খিলক্ষেতে আসলাম তখনও বর্ষার দিনে নৌকা চলতো, পানিতে থৈ থৈ করতো চর্তুদিক। বর্ষায় এ পথে আসলে মনে হতো সমুদ্রের পাড়ে চলে এসেছি। আর এখন যেদিকে তাকাই শুধুই ধুধু বালুচর। বিভিন্ন নামের প্রকল্পগুলো সব জায়গা একে একে নিজেদের দখলে নিয়েছে। ইছাপুরার পর থেকেই গ্রামের মাটির সোদা গন্ধ অনুভব করা যাবে। এখানকার মাটিও বেশ উর্বর। কত ধরনের শস্য আর ফলফলাদি হয় এই অঞ্চলে। ভোরে খিলক্ষেতের বাজারে গ্রামের টাটকা শাক-সবজি চলে আসে এসব গ্রাম থেকে। ইছাপুরাতেও হাট বসে সপ্তাহে শুক্র আর সোমবার। আমের দিনে আমসহ মৌসুমী ফলের সমারোহ থাকে এইসব বাজারগুলোতে। প্রতি বাড়িতেই কমবেশ কিছু ফলের গাছ পাওয়া যাবে। পেট ভরে খেয়েদেয়ে তারা বাজারে নিয়ে আসে তা বেঁচতে। শাক-সবজির বেলাতেও তাই। ব্রীজের উপর থেকেই দেখলাম নৌকার উপর ফল আর সবজির ঝাপি সাজানো। এসব পণ্যবোঝাই নৌকাগুলো বালুনদী ধরে চলে যায় উত্তরের গ্রাম বেরাইদ হয়ে ঢাকার রামপুরা আর দক্ষিণে টংঙ্গী পর্যন্ত। ছবি তুলে আবার সাইকেলে চড়ে বসলাম। এ পথে সাইকেল চালাতে বেশ তৃপ্তি আছে। সাপের মত আঁকাবাকা মসৃণ রাস্তা, নানা জাতের ফল আর ঔষধি গাছের সারি, পাখির কিচিরমিচির, আর মৃদুমন্দ হাওয়া। আর এখানকার মানুষগুলোও বেশ মিশুক। মনে পড়ে একবার সাইকেলে চলতে চলতে পরিচয় হয় মকবুল নামে এক নিউজ পেপার হকারের সঙ্গে। আলাপ জমতে না জমতেই তিনি আমাকে তার বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে গেলেন, আর পরম আতিথেয়তায় ভাতও খাইয়েছিলেন। আমি স্মৃতি হাতড়ে এগিয়ে গেলাম বাড়িয়ারটেক, টেকনোয়াদ্দা, গোয়ালপাড়া, সিটি মার্কেট হয়ে আরো কত দূরে। এ রাস্তা দিয়ে সিএনজি আর ব্যাটারি চালিত সিএনজি বা ময়ূরী চলে সোজা রূপগঞ্জ পর্যন্ত। ময়ূরি চালক নূর হোসেন কে জিজ্ঞেস করলাম ‘ভাই রূপগঞ্জ যেতে কত ভাড়া লাগে?’ জানালো, ইছাপুর থেকে লোকালে ২০টাকা আর রিজার্ভ করে গেলে ৮০টাকা লাগবে। আর খিলক্ষেত থেকে আসলে ২০০টাকা হলে ঘূরে যাওয়া যাবে। সিএনজিতে লাগবে ৩০০টাকার মত। ধন্যবাদ বলে প্যাডেলে চাপ দিলাম। একটু সামনে দেখি বিরাট বড় এক পাকুড় গাছ, বয়স তেমন একটা বেশি মনে হলো না। আম, কাঠাল, তাল, বরই, খেজুর সহ আরো যে কত ফলফলাদির গাছ, পথ থেকে দেখেই চোখ জুড়াই। মনে মনে ভাবি বাড়ির কাছে এতো আমার আরশিনগর। কিছু দূর পরপর rupgong-3মাটির ঘরগুলো কাছে টেনে নিবে। পথের পাশেই স্নিগ্ধ ছায়াঘেরা এ গ্রামগুলো ছুঁতে বার বার মন ইশারা করে। দমকা হাওয়া যেন শিহরণ জাগায়। পথে পথে থামি, আর সুন্দরকে ধারন করি ক্যামেরায়। ল্যান্ডস্কেপগুলো সত্যি অসাধারণ। ঐ দূরে ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকা দিয়ে মাছ ধরছে দুজন, পেছনে মুক্ত আকাশে মেঘ বারতা। কৃষানিরা ব্যস্ত কেটে আনা পাকা ধানের শিশ ছড়াতে আবার কেউবা ধান মেলে দিচ্ছে বাড়ির আঙ্গিনায়। কি অপূর্ব!
চলে আসলাম অনেকটা পথ, একটা স্কুল পথের পাশেই, প্রতিষ্ঠা সাল ১৯৩৯, দক্ষিণবাগ সরকারি স্কুল, তারপর টানমুশুরি, মুশুরি হয়ে রূপগঞ্জ থানা স্বাস্থ্য কমপ্লক্সে। এর পরই শীতলক্ষা নদী। স্বাস্থ কমপ্লক্সে এর ভেতরটাও বেশ পরিপাটি। এখান থেকেই নদী তার দর্শন দিবে। একটু নিচে নেমে গেলে নৌকার ঘাট। নদীর ঐ পাড়ে বানিয়াদি সুইচ ঘাট, দু’টাকা দিলেই পার করে দিবে। ফাঁকে নদীতেও একটু ঘোুরা হয়ে যাবে। শীতলক্ষ্যা এখন আর অত চওড়া না, তারপরও গুণ তার অক্ষত।
নদীর উপর বিশাল কাঞ্চন ব্রীজে যেতে হলে ফজুরবাড়ি স্ট্যান্ড থেকে বামে যেতে হবে আর রূপগঞ্জ ফেরিঘাট যেতে হলে ডানে যেতে হবে। আমি ফেরিঘাট দেখে এলাম। এখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ফেরি ছাড়াও পারাপারের জন্য নৌকা থাকে। বেলা বেড়ে যাচ্ছে, কোমল সূর্য এখন কঠিন হতে শুরু করেছে। দূষণমুক্ত পানি ভরে rupgong-5নিলাম বোতলে। ফেরার সময় হলো কিন্তু এত কাছে এত সুন্দর জায়গা, বার বার তো আসতেই হবে!
সাইকেল এর রুট হিসেবে এই রাস্তা বেশ আকর্ষনীয়। খিলক্ষেতের ভেতর দিয়ে গিয়ে রূপগঞ্জ হয়ে আবার তিনশ ফিট হয়ে ফেরা যাবে। একটু বেশি দূরত¦ চাইলে রুপগঞ্জ থেকে ডেমরা পর্যন্ত যাওয়া যাবে শীতলক্ষ্যার পাড় ধরেই। সেই রাস্তাটাও ভারি সুন্দর। দূরত্বে প্রায় নয় কিলোমিটার।

যেতে পারবেন যেভাবে:
ঢাকার খিলক্ষেত থেকে ইছাপুরা পর্যন্ত আসতে হবে লোকাল টেম্পু, বেবি টেক্সি, মাইক্রোবাস বা সিএনজিতে। এরপর ইছাপুরা থেকে আবার সিএনজি বা ময়ূরীতে করে রূপগঞ্জ, সিএনজি রিজার্ভ ১০০টাকা, লোকাল ২০/৩০টাকা, ময়ূরী লোকাল ২০টাকা, রিজার্ভ ৭০/৮০টাকা।
আর ডেমরা দিয়ে রূপগঞ্জ যেতে হলে সরাসরি বাস আসে ভক্তবাড়ি বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত,ফিরেও যেতে পারবেন একই পথে। ভাড়া পড়বে ৩০টাকার মধ্যে।
শীতলক্ষ্যা নদীতে ঘুরতে চাইলে নৌকা ভাড়া করতে পারবেন ঘন্টা হিসেবে রূপগঞ্জ ফেরী ঘাট থেকে, আর নদী পার হতে জনপ্রতি দুই টাকা আর রিজার্ভ ১০টাকা।

লেখা ও ছবি: হোমায়েদ ইসহাক মুন

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com