বাবার জন্মদিনে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শামীম আজাদ

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আমরা জামালপুরে। সাতাশ রোজার দিন। আম্মা বেলের শরবত বানাচ্ছেন। সাইকেলে করে শরবতে দেবার জন্য বরফ কল থেকে বরফ আনতে গেছে আমাদের পিওন মনা ভাই। পাকা বেলটি আমাদের গাছ থেকে টুব করে

বাবা ও মা

মাটিতে পড়ে ফেটে গেছিলো। আম্মা ঢাকাইয়া বড়ই গাছের নিচে কূয়োর জলে তা ধু’য়ে এনেছেন। এখন ডাইনিং চেয়ারে বসে বেল কুড়িয়ে বোলের মধ্যে নিয়ে তা নরম করছেন। সারা ঘর পাকা বেলের গন্ধে ম ম করছে।

আব্বা তার দাড়ি কাটার পুরানো ব্লেড দিয়ে ভাইয়া আমার ও শোয়েবের নখ্‌ কেটে দিচ্ছেন। ব্লেডটা কি করে যেনো অর্ধেক করা হয়েছে। বুজান তখন খালামনির কাছে নারায়নগঞ্জে। আমি খুব চিন্তিত নখ কাটার পর শবে বরাতে লাগানো মেহেদীর অবশেষ থাকবে না। ভাইদের যাহোক তাহোক ওদেরতো আর মেহেদী লাগানো নেই। আমি ঘুরে ঘুরে আব্বাকে বলতে চেষ্টা করছি অন্তত আমার কড়ে আঙ্গুলের নখটা সামান্য একটু লম্বা যায় না! তাহলে ঈদের চাঁদ যখন বারন্দার ঐ নীল অপরাজিতার উপর দিয়ে উঠবে- আমি তাকে চাঁদের মত সরু রেখার ঐ মেহেদীর লাল আভাটুকু দেখাতে পারতাম! না! কোন ফ্যাশন না। রঙ থাকলে থাকবে না হলে নাই। কে তোরে কইছে চান্দরে মেন্দি দেখাইলে সোয়াব অইবো?

আমার দুভাই শিবলি ও শোয়েব অত্যন্ত সুপুরুষ। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি তাদের আগুনের বোন্দার মত রং গায়ের রং। গরমে তপ্ত হলে ভাইয়ার কপালটা জ্বল জ্বল করে আর শোয়ের তিল বসা মিষ্টি গাল। আমি আর বুজান শ্যমলা। তবে বুজান শ্যামাঙ্গী হলেও তার গড়ন ভারি সুন্দর। আমাদের দু’বোনের গায়ের রঙ ফর্সা করার জন্য আমরা খালিপেটে ভোরবেলা কাঁচা হলুদের রসের সঙ্গে কত গুঁড় খেয়েছি। মুখে সর আর কমলার বাকল বাটা লাগিয়েছি! এদিকে আরেক জ্বালা। আব্বার পরিচিত জনের কেউ যখনই আমাকে প্রথমবার দেখে অবাক হয়ে বলে ‘ইতা কিতা! পুরিতো দেকি বা’পর চে’রা পাইছে। এক্কেবারে তরফদার সাব। ফুল স্টপ!’

মৌলভি বাজার মনু নদী পেরিয়ে মুরুজপুর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলে আমাকে দেখে ফুপুরা নাকু চুম্বণ দিতেন। তরফদার বাড়ীর শ্রেষ্ঠ সন্তান তাদের ভাইর মত চেহারা বলে আদর করে করে বলতেন, ‘আল্লাগো এক্কেবারে আমরার বাইর চেরা!’

আমি আর আমর বন্ধু

একবার আমার সুন্দরী স্মার্ট ও উদ্যোমী ছোট খালার কি একটা কর্মকান্ডে দৌড়াদৌড়ি করছিলাম। তখন বড়দের মিটিং সেরে আসা তার এক বান্ধবী নিয়ামত ডাক্তার সাহেবের ভীষন পাওয়ার ফুল চশ্‌মা পরা স্ত্রী খালামনিকে বলেন-তোমার দুলাভাইকে অনুষ্ঠান প্রিসাইড করা গম্ভীর দেখে মনে হল টেবিলের ওপারে ছোট্ট শামীমেরই এক গম্ভীর মুখ দেখছি। আমি ভাবতাম এটা একটা কথা হল? একজন পূর্ণ বয়ষ্ক পুরুষের সঙ্গে একটি ছোট্ট মেয়ের চেহারা কি করে এক হয়। আমি কি তাহলে ছেলেদের মত দেখতে? তার উপর ছেলেরা যা করে তার সবই আম্মা আব্বা আমাকে করতে দেন। তাতেকি আরো ছেলে মার্কা হয়ে যাচ্ছি? কিন্তু আব্বা আমার দুনিয়ার সব চেয়ে প্রিয় মানুষ তাই তার মত হয়েছিতো হয়েছি! তখন আম্মার বান্ধরীরা যে একটা লাইন জুড়ে আমার কিশোরী মনের জন্য উপকার করেছিলেন সেটা হল ‘বাপ’র চেরার পুরি বাগ্য আনে কোল জুড়ি।’ তাই যখনই স্কুলে একটা পুরষ্কার পেতাম বা শরীর খারাপ নিয়েও নাচে সবার চেয়ে ভাল করে ফেলতাম- ভাবতাম বাপের মত চেহারা বলেই আমি ভাগন্তী হয়েছি।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আলো থাকতে থাকতেই আমার পালা এল। আব্বা আমার দু’হাতের নখগুলো যত্ন নিয়ে গল্প বলে বলে কেঁটে মানুষ ফূল গাছ ছাঁটা হলে যেমন তৃপ্তির সঙ্গে তাকায় তেমনই প্রথমে কচি হাত দু’খানা এক করে দেখলেন। তারপর পায়ের পাতাগুলো একত্র করে দাঁড়াতে বললেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম। এবার একটা চুমু দিয়ে পেছনে আম্মার দিকে মুখ বাড়িয়ে বললেন, ‘আনোয়ারা শামীম’র আত আর পাও বড় সুন্দর গো!’ আম্মা বললেন ‘অয় অয়।’ আমার তখন মনে হল। তাতে কি? পা তো আর মুখে ঝোলাতে পারবো না! সেরকম কিছু একটা বলেছিলাম ও। আজ আর মনে নেই কি বলেছিলাম। তখন আব্বা আরো কি কি বলেছিলেন তাও মনে নেই। মনে আছে আমাকে নিয়ে সবাই খুব হেসেছিলেন এবং আমার মনে হয়েছিলো চেহারা তেমন না হলে কি আমিতো আব্বার মত খুব স্মার্ট।

খালা ও মায়ের সঙ্গে আমরা চার ভাইবোন।

নারায়ণগঞ্জে যখন ছিলাম কেশব বাবুর পুকুরের পাশে আমাদের তিনতলা ভাড়া বাড়ি ছিলো । সামনে বেগুনী কচুরিপনায় ভরা ডোবা। স্পানিস মার্কা রেলিং দেয়া দোতলার বারান্দায় দাঁড়ালে চারদিক থেকে এমন হু হু হাওয়া আসতো যে আমার মনে হত আমাদের বাড়িটা একটা দোতলা জাহাজ। আমরা ভাসতে ভাসতে চলেছি। সেই জলে ভাসা জাহাজের খোলে পাটাতনে ইঞ্জিন রুমে জমে উঠতো আড্ডা, মহড়া, গান ও বাদ্য যন্ত্রের মূর্ছনা। শিল্প সংস্কৃতি্র উপ্ত বীজেই আব্বা ও তাঁর বন্ধুরা সারা শহর মাতিয়ে রাখতেন। কোথা থেকে লোকমান হোসেইন ফকির ধরে নিয়ে আসতেন কানাই শীলকে, বাসে করে ঢাকা মুকুলের মহফিল থেকে আসতেন হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ ও মেডিক্যালে পড়ুয়া আমানুদ্দোউল্লাহ। একবার আযান ছবির নৃত্য পরিচালক জাহাংগীর আলম এসে আমাকে ও মাজেদাকে নাচ শিখিয়ে গেছেন। কোরান তেলাওয়াত শিখিয়েছেন আব্বা নিজে।

নারায়নগঞ্জে রাইফেল শুটিং ক্লাব ছিলো। সেখানে আমাদের গুলি ছোড়াও শিখিয়েছেন। মাটিতে শূয়ে ঐ দূরে একটু পাহাড়ের মত ছিলো তাকে চাঁন মারি বলতো সবাই। তো সেদিকে গিয়ে মাটিতে শুয়ে দূরে পোস্টারের মত চৌকো স্থানে ছাপা বৃত্তে শুটিং করতে হতো।কি জ্বালা আমি গুলির শব্দে হাত ছেড়ে দিই। এক চোখ বন্ধ করে তাক করতে পারিনা। তখন আব্বা পকেট থেকে আমার বিলেতে থাকা মামাদের দেয়া উপহার মার্ক্স, এ্যান্ড স্পেন্সার এর ‘টি’ লেখা আদ্যাক্ষরের সাদা রুমালে আমার এক চোখ বেঁধে দিতেন।

তর্ক বাগিশ ছিলাম বলে ভাইবোনদের কথায় আটকে দিলে আব্বার কাছে ঠিকই ধরা পড়তাম। বলতেন, ‘বড় অইয়া ব্যারিস্টার অইবেনিগো মাই?’ আমি তখন ভাইয়ার ছোট হয়ে যাওয়া ট্রাউজার শার্ট এবং লাল চামড়ার জুতোও পড়ছি। কারণ আব্বা বলেছেন, মেয়েরাও এসব পড়তে পারে এবং সেটাই নাকি ফ্যাশন। বাসায় আব্বা আম্মাদের বন্ধুরা এলে চা সিংগাড়া সুজির হালুয়ার পর শুরু হত আমাদের দিয়ে তাদের বিনোদনের সেশন। সবাই একখানা করে করে কেটে পড়লেও আমি সুকুমার রায় আবৃত্তি করে খরবায়ু বয় বেগে চারিদিক ছায় মেঘে গেয়ে নেচে হয়রান হয়ে নাও বাইতেই আবার জাগো নারী জাগো নাচতে শুরু করতাম।যতক্ষন না আমাকে থামানো গেছে। ওভাবেই আব্বা যখন আমাদের চার ভাইবোনের মনে সংস্কৃতি ও শিল্পস্পৃহা জাগিয়েছেন- মনে হয় আমাদের ‘স্মার্ট’ করেছেন।

মা ও খালারা।

আজও ভাবি পুরুষ শাসিত এ সমাজে ঐ স্মার্ট মানুষটার জন্যই আমার মা ও আমাদের দু’বোনের জীবন অনেক অন্যরকম হয়েছিলো। অনেক নিজের ইচ্ছেমত হয়েছে। আর আজও আয়নায় সামনে নিজের প্রতিবিম্বে আব্বাকে দেখতে পাই। একটু ওঠা ঠোঁট- ঠোঁটের দুপাশের রেখা। চওড়া কপাল। বয়স বাড়লে কি নারী কি পুরুষ তাদের মাতা পিতার মত হয়ে যায়। গলার স্বর অসুখ বিসুখ মেজাজ মর্জি। কেউ বেশি কথা বলে। এউ চুপ মেরে যায়। আর শুধু মা বাবার কথা বলে।

মাঝে মাঝেতো বাথরুমে এখন তাঁর সঙ্গে কথাই বলি। চুলটা টেনে পেছনে ব্রাশ করে তাকাই। কানে দুল আর নাকে ঝিলিক দেয়া ফুলটা না থাকলে দেখতে আব্বাই হয়ে আছি । তাকে আর আলাদা করে টেনে আনতে হয় না। আমি তাঁর যে শিল্প-স্বভাবও পেয়েছি। তার উদ্যম ও। মায়ের কথা আরেকদিন বলবো। ৯ ডিসেম্বর আব্বার মৃত্যু দিবস।সেদিন আবার রোকেয়া সাখাওয়াতের জন্মদিনও। ওর কথা কত শুনেছি আব্বা আম্মা দুজনের কাছেই। তবে বাবার কথাই লিখলাম।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com