বইমেলা প্রাণের মেলা, তার প্রাণভোমরা জোর দেখাক খেলা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল হোসেন

বইমেলা প্রাণের মেলা। দীর্ঘ একটা মাস ধরে এমন বইমেলা পৃথিবীর কোথাও হয়না। লেখক-কবি-প্রকাশক-পাঠক সবার জন্য এমন একটা মেলা নিঃসন্দেহে দারুন প্রাণসঞ্চারী ভাব বিনিময়, কৃষ্টির চর্চা এবং প্রসারের এক মহামঞ্চ হবারই কথা। তা হবার জন্য এর চেয়ে বড় কোনো আয়োজন-উৎসব এদেশে নেইও। এক সময় বাঙলা একাডেমীর প্রাঙ্গন জুড়ে বসতো এ সৃজনশীলতার মেলা। গোটা প্রাঙ্গনে বইয়ের স্টল নিয়ে প্রকাশকরা সাজিয়ে তুলতেন নতুন পুরোনো সব প্রকাশনার এক আলোকজ্জ্বল গ্রন্থসমাবেশ। সঙ্গে তারার মেলা নক্ষত্রের আলোকচ্ছটা হয়ে মেলাময় ছড়িয়ে থাকতেন সব কবি লেখকরা। তারুণ্যের ভীড় মেলায় যোগাতো সবুজের সমারোহ প্রাণের দ্যোতনা। মেলার এক কোণায় ছিল খাওয়ার স্টলের সমাহার। মেলায় ঘুরে ঘুরে বিরতি নিতে কিংবা ক্লান্তিতে এখানে বসে খানিক সময় কাটাতেন সমাগত পাঠক জনতা। জমিয়ে আড্ডা পিটাতেন সাধারণ-অসাধারণ সবাই। মণি-মানিক্যের মতোন কোনো কোনো টেবিলের চারপাশ ঘিরে বসে থাকতেন খ্যাতিমান কবি ও লেখকরা। বই বেরুতো শত শত, বিক্রি হতো হাজার হাজার।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনতার, পাঠকের, প্রকাশকের, কবি-লেখকের ব্যাপ্তি সংখ্যায় ক্রমাগত ছাপিয়ে গেছে তার অতীতকে। বাঙলা একাডেমির নিজস্ব প্রাঙ্গন ছাড়িয়ে তা বেরিয়ে এসেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। তাও ৩/৪ বছর পেরুলো। এক সময় টিএসসি থেকে দোয়েল চত্ত্বর পর্যন্ত রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিলো খোলা দোকানের ভীড়। সেখানে বৈশাখী মেলার মতোন নানান খেলনা মুড়ি মুড়কির খোলা দোকান, ফুটপাথ জুড়ে পুরোনো আর পাইরেটেড বইয়ের দোকানের ভীড় জমতো। একুশে মেলা তার দেহ সৌষ্টবে বেড়ে উঠছিল বটে, তবে তার স্বকীয়তা সঙ্গীন হবার শঙ্কায় নিমজ্জিতও হচ্ছিল। ঢোকার মুখে ভীড় জটলায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটা একটা নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পুরো মেলা জুড়ে প্রাণচাঞ্চল্যের প্লাবন বইলেও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাহুটি ছিলো শিথিল। তা বাদে কোথাও তাল লয় কাটবার মতোন বিষয় সেভাবে দৃশ্যমান ছিলনা। নিরাপত্তার জন্য সচেতন তারুণ্যই ছিল যথেষ্ট সজাগ ও ক্রিয়াশীল।

মেলার ব্যাপ্তি ক্রমশ শিথিল করেছে উদ্যোক্তা বাঙলা একাডেমির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে। সেই সঙ্গে এই এলাকায় গত ক’বছরে ঘটে যাওয়া দুঃখজনক ও ন্যাক্কারজনক ঘটনা, হত্যাপ্রচেষ্টা সব মিলিয়ে কেমন একটা গুমোট পরিস্থিতি তৈরী করেছিল। বিষয়টা প্রচ্ছন্ন ভাবে সাধারণের মনে সৃষ্ট কোনো ঝঞ্জাট দৃশ্যমান করে উঠতে না পারলেও তার অস্পষ্ট একটা ছায়া আশপাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল। গত এক বছরের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের দৃশ্যপট একটা অস্বস্তির কাঁটা জাগিয়ে রেখেছিল। সে বিচারে সার্থকভাবেই আয়োজিত এবং সম্পন্ন হয়েছে কুড়ি-সতেরোর বইমেলা।

শ’পাঁচেক স্টল জুড়ে প্রকাশক-পরিবেশকরা সাড়ে তিন হাজারের বেশি নতুন বইয়ের পসার বসিয়েছিলেন এবছর। বিক্রিও কম হয়নি। পঁয়ষট্টি কোটি ছাড়িয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় বিশ কোটি বেশি। প্রতি বছরের মতোন মেলার প্রথম দিকে বইয়ের সমাগম হবার গতি যেমন থাকে ধীর লয়ে তেমনি পাঠকরা মেলায় এসে ঘুরে ফিরেই বেড়িয়েছেন বেশীরভাগ সময়। মেলার দিন যত গড়ায় নতুন বই যেমন বাড়তে থাকে সংখ্যায় তেমনি বিক্রিও বাড়তে থাকে। ক্রেতা বিক্রেতা সবার মুখেই হাসি প্রাণবান হতে থাকে।

তবে মেলার সব সাফল্য জৌলুস শ্রম ও মেধার প্রয়োগের পাশাপাশি কয়েকটা বিষয় আমি নিশ্চিত সকল অংশগ্রহণকারী ও অভ্যাগতের চোখে পড়েছে, সবার কাছেই কম-বেশী অনুভূত হয়েছে। কথাগুলো একে একে উপস্থাপন করছি পাঠক-সাধারণ-উদ্যোক্তা-অংশগ্রহণকারী সবার বিবেচনার জন্যে।

এক। লাখো মানুষের সমাগমের এমন একটা সম্মিলিনীর অঙ্গনে প্রক্ষালনের সংখ্যা ও মান আরো উন্নত হবার প্রয়োজন।

দুই। এমন ধূলি ধূসরিত একটা আঙ্গিনায় ধূলার আগ্রাসন নিয়ন্ত্রণে প্রথম দিকে যা কিছু সচেষ্ট থাকার প্রমাণ মিলেছে পরের দিকে তা ভীষণ ভাবে অনুপস্থিত বলে মনে হয়েছে।

তিন। লাখো মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা হেঁটে বেড়াবে, ঘুরে বেড়াবে। তাদের ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর হবার কথা। তার জন্য খাওয়ার বা অন্তত চা-পানির প্রতুল ব্যবস্থা থাকাটা খুব আবশ্যক ছিল।

চার। বই কিনবার আগে ও পরে কোথাও বসে দু’দণ্ড ভাববার বা পরামর্শ করবার কিংবা সদ্য কেনা বইটা উলটে পালটে দেখবার জন্য কিছু বসবার জায়গার খুব প্রয়োজন ছিল।

পাঁচ। বইমেলাকে যদি সৃষ্টিশীলতার একটা মেলা বলে আমরা ধরিই তবে এখানে নিশ্চিত অনেক অনেক সৃষ্টিশীল মানুষের সমাগম হবার কথা। সারা দেশ থেকে সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনা মানুষদের এখানে আসবার কথা। তাহলে তাদের ভাব বিনিময়ের, দু’দণ্ড কথা বলবার প্রাঙ্গনটি আসলে কোনটুকু। তাদের জন্য কি কিছু বসবার জায়গা করা যেতো না!

ছয়। তড়িঘড়ি মেলায় নানান গুণীজনের নামে বিভিন্ন চত্তরের নামকরণ করা হলো। কিন্তু প্রয়াত বলে কি মলিন সমাধিস্থলের মতোন একটা নিশানা তৈরী করে আদতে কোনো সন্মান তাঁদের প্রতি প্রদর্শিত হয়! তাঁদের কৃতিত্বের স্বীকৃতি নিদর্শন সম্বলিত (সাইটেশান) কিছু একটা তথ্য ও বিম্বের উপস্থাপনা সহ একটা ছাউনি করে সেখানে কবি সাহিত্যিকদের বসবার ব্যবস্থা রাখা যেতো না!

সাত। মেলার কোথায় কোন স্টল সে তথ্যটা স্টলের নাম এবং নম্বর সহ সহজবোধ্যভাবে দেবার দরকার ছিল বেশ কয়েক জায়গায়। অনেক মানুষকেই পরিশ্রান্ত হতে হয়েছে খোঁজাখুঁজির কসরতে।

আট। মেলায় সারিবদ্ধ ভাবে নারী-পুরুষের নির্দিষ্ট প্রবেশপথ এবং তার ব্যবস্থাপনা প্রশংসার দাবী রাখে। আবার সেই বিচারে প্রস্থানের পথটাতে আন্তরিকতা আর নজরের ছাপ মেলেনি।

নয়। বইমেলার ঢুকবার প্রথম তোরণ টিএসসির পাশের গেটে ঢুকবার মুখেই চোখে পড়বে হুইল চেয়ার সহায়তা প্রদানের স্বেচ্ছ্বাসেবী উদ্যোগটি। যা বিপুল প্রশংসার দাবী রাখে। উদ্যোক্তাদের অযুত সাধুবাদ। এই সুন্দর উদ্যোগের তথ্যটা এ সেবা পাওয়ার মতোন মানুষগুলোর কাছে তো পৌঁছাতে হবে যাতে করে তারা তা জেনে এ সুবিধার বদৌলতে মেলায় ঘুরে যাবার সিদ্ধান্তটা নিতে পারেন। বইমেলার আয়োজকদের উচিৎ এ তথ্যটার পর্যাপ্ত প্রচার ঘটানো। তবেই এ সুবিধা নেবার মতোন মানুষ জানবেন, আসবেন।

ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন বা উত্তরণের শেষ নেই, থাকবেও না। যতো দিন যাবে ততো এর ব্যাপ্তি বাড়বে। নতুন নতুন চাহিদা প্রয়োজনীয়তা এসে হাজির হবে আমাদের সামনে। তবে কেউই সম্ভবত উপরে উল্লেখ করা বিষয়গুলোর বিপরীতে মত দেবেন না। অবশ্য সবচেয়ে বেশী গুরুত্বের দাবী আসলে মেলার মূল বিষয়, অর্থাৎ বইকে ঘিরেই আবর্তিত। বিষয়টা দ্রুত এবং জোর মনোযোগের দাবী রাখে বিশেষত প্রকাশকদের পক্ষ থেকে।

অতীতে একটা সময় ছিল যখন পাণ্ডুলিপি নিয়ে লেখক প্রকাশকের কাছে হাজির হতেন, জমা দিতেন। প্রকাশক তা পড়ে দেখে সিদ্ধান্ত নিতেন কোনটা ছাপবেন বা কোনটা ছাপবেন না। এটা প্রকাশকের বানিজ্য এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন, তাই প্রকাশক ভাববেন কোথায় তার পুঁজি লগ্নী করবেন আর কোথায় করবেন না। বিষয়টা খুব স্বাভাবিক। এখানে উল্লেখ করবার মতো বিষয় যা তা হলো এই যে, এই লগ্নী করবার ব্যাপারে কেবল বানিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, প্রকাশকের আবেগ ভালবাসাও ভূমিকা রাখতো। প্রকাশক নিজে লেখক বা সেই মাত্রায় শিক্ষা-প্রজ্ঞার সার্টিফিকেটধারী না হলেও সব বই তার পড়া বা তা সম্পর্কে জানা থাকতো। গোটা ব্যাপারটায় নিষ্ঠা ও ভালবাসা প্রকারান্তরে প্রকাশনার বিষয়বস্তুগত এবং গুণগত মান সমুন্নত রাখবার ব্যাপারে প্রকাশকের জোরালো ভূমিকা নিশ্চিত করতো। বিপরীতে আজ লেখকের টাকায় বই ছেপে বানিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বিপরীতমুখী শকটে তুলে দিয়েছেন প্রকাশকেরা (হয়তো সবাই নয়)। সেই সঙ্গে বিপণন বিষয়টা নিয়ে প্রকাশকদের মাথা ব্যথাটাও এক অর্থে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নতুন বই নতুন লেখকের প্রকাশ বিরোধিতা এখানে প্রস্তাবনা নয়। কথা হলো প্রকাশকের উচিৎ একটা সম্পাদনা পরিষদের ভেতর দিয়ে প্রতিটা পাণ্ডুলিপিকে মুদ্রণের সীমানায় পৌঁছানো। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে লেখন নবীন-পুরাতন, বিখ্যাত-অখ্যাত যেমনই হোক না কেন, প্রতিটা পাণ্ডুলিপিকে প্রকাশকের সম্পাদনা পরিষদের বা সম্পাদকের টেবিল হয়ে যেতেই হবে এবং যথাযথ পরিসংশোধন ও পরিমার্জনের পরই কেবল তা প্রকাশিত হতে পারবে। এ চর্চাটা আমাদের দেশে প্রয়োগ অতি আবশ্যক এবং তা করা উচিৎ যথাশীঘ্র সম্ভব।

প্রকাশনা শিল্প একটা সৃজনশীলতার মঞ্চ বা ক্ষেত্র। নির্দ্বিধায় এটা সত্য। পাশাপাশি এটাও অনস্বীকার্য যে, অর্থনৈতিক বিষয় এখানে দুই দিক থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এর একটা হলো প্রকাশকের অর্থ লগ্নী করবার বিষয়। একটা ভালো বইয়ের বদলে ভালো নয় এমন কোনো বইতে লগ্নী করে ভালো বইকে প্রকাশনার মুখ দেখতে সুযোগ না দিলে তা সৃজনশীলতা, পাঠক তেষ্টা, প্রকাশক-পাঠক উভয়ের মান সব কিছুকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আর অন্যটা হলো পাঠক বা ক্রেতার অর্থনৈতিক প্রসঙ্গটি। প্রতিটি পাঠক বা ক্রেতা একটা বাজেট বৃত্তের ভেতরে অবস্থান করেন। মন যতোই চাক কারো পক্ষেই মেলার সব বই কেনা সম্ভব না, কিনলেও পড়া সম্ভব না। ক্রেতাকে যদি অনুরোধের আসরের বই বা তার চেনা ও নিকটজনদের বই কিনে তার বাজেটের একটা বড় অংশ ব্যয় করতে হয় তবে সেই অংকের ভালো বই পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ হারাচ্ছে। ভাল বইটার প্রকাশ এবং ভালো লেখকের আরো লেখবার বিষয়টা প্রেরণা পাচ্ছে না।

গোটা ব্যাপারটাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবার প্রথম পদক্ষেপ হবে প্রকাশকের সত্যিকারের দায়িত্ব পালনে তার দায় প্রসঙ্গে সচেতন ও ক্রিয়াশীল থাকা। পাশাপাশি উদ্যোক্তারা বইমেলা চলাকালীন সময়টাতে কেবল মাত্র মোড়ক উন্মোচনের আনুষ্ঠানিক আড়ম্বরে বৃত্তাবদ্ধ না থেকে নিয়মিত ভাবে গ্রন্থ আলোচনা বা পাঠের নানান আয়োজন রাখতে পারেন। তাতে সত্যিকারের সাহিত্য-কৃষ্টির পৃষ্ঠপোষকতা করা হবে, লেখক পাঠক সকলের উৎকর্ষ সাধিত হবে। বইমেলা প্রাণের মেলা হয়ে প্রকাশনা শিল্প, গ্রন্থ, রচয়িতা সবার মাঝেই সত্যিকারের প্রাণ সঞ্চার করতে পারবে।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com