ফেরারী স্মৃতির শহরে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

ঢাকা শহরের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের দেয়াল ধরে কিছুটা হাঁটলে ছুরির মতো এদিক-সেদিক ঢুকে গেছে সরু গলি।তাদের অনেক নাম। রিকশায় অথবা পদযুগল ভরসা করে হাঁটতে থাকলেই কিছু মানুষ পাশ দিয়ে উদাস ভঙ্গীতে হেঁটে যাবার সময় বেশ চাপা স্বরে বলে যেতো-ওই কোরবানী, কোরবানী, দিওয়ার, দিওয়ার, মুকাদ্দর কা সিকান্দর অথবা বুলু, বুলু…কান পাতলে শোনা যায় এখন সেইসব কন্ঠস্বর? নাহ, কালের যাত্রায় মুছে গেছে সেই চাপা স্বরের কথা, হারিয়ে গেছে মানুষগুলোও। রয়ে গেছে কেবল স্মৃতি। পুরান ঢাকার  ভিসিআর-এ সিনেমা দেখার সেই সংস্কৃতি।
আশির দশকের একেবারে গোড়ার দিকের কথা। পুরান ঢাকার বেগমবাজারের কাছে লাভা ভিডিও নামে একটি দোকান থেকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে ভিডিও ক্যাসেট আর ভিসিআর সংস্তৃতি। হোসেনী দালান, নাজিমউদ্দিন রোড, বেগম বাজার, রাজার দেউরী, বেচারাম দেউরী, বনগ্রাম, নারিন্দা, চানখাঁর পুল, নিউ পল্টন লাইন, হাজারিবাগ, মনেশ্বর রোডসহ আরও কিছু এলাকার নাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে। কোথাও মুরগির বাজারের ওপরে দোতলা ঘরে, রিকশার গ্যারেজে, কোন পরিত্যাক্ত বাড়িতে, এলাকার ক্লাবে, কমিউনিটি সেন্টারে একটি ভিসিআর মেশিন রেখে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলতে শুরু করলো বিভিন্ন ভারতীয় সিনেমার প্রদর্শনী। টিকেটের দাম ছিলো দশ টাকা। তখন এই শহরে ভিসিআর নামের যন্ত্রটিও বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া খাটতে শুরু করে।
ভিসিআর-এ প্রথম সিনেমা দেখি অমিতাভ বচ্চন, রেখা ও দেবানন্দ অভিনীত ‘মুকাদ্দর কা সিকান্দর’ ছবিটি। কলেজ পালিয়ে দেখা। এক বন্ধুর সঙ্গে জেলখানা গেট পর্যন্ত রিকশায় গিয়ে তারপর পায় হেঁটে অনেক অলিগলি পার হয়ে এক রিকশা গ্যরেজের সামনে উপনীত হওয়া। আমাদের অবশ্য নিয়ে গিয়েছিল এক দালাল। সাদা লুঙ্গি আর শার্ট পরা লোকটি গলির মুখে দাঁড়িয়ে সিনেমার নাম ধরে দর্শক ডাকছিলো। ভেতরে ঢুকতেই অদ্ভূত এক দৃশ্য দেখলাম। এরকম সিনেমা হল আমার জীবনে প্রথম দেখা। বাঁশের বেঁড়া দিয়ে ঘেরা বিশাল ছাউনির ভেতরে এক কোণে রাখা একটি ভিসিআর যন্ত্র। অন্যপাশে সারিবদ্ধ ভাবে রাখা রিকশা। ভিসিআর-এর সামনে রাখা কয়েকটি বেঞ্চ আর সামনে পাতা পাতা চাটাই।দর্শক বসানোর ব্যবস্থা। দশ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে দুই বন্ধু সেই অভিনব প্রেক্ষাগৃহের অন্দরমহলে ঢুকে পড়ি। তারপর মুগ্ধ দৃষ্টিতে  একটি টেলিভিশনের কুড়ি ইঞ্চি পর্দার ফুটে ওঠা অমিতাভ আর রেখা অবলোকন। মনে আছে ছবি শেষ করে বের হয়ে আমরা অনেকক্ষণ পরস্পর কোন কথা বলিনি।তখন পর্যন্ত সিনেমা দেখার বিষয়টা সিনেমা হলের মধ্যেই আবদ্ধ ছিলো। ওরকম গেরিলা কায়দায় একটা সিনেমা দেখে ফেলা ছিল সত্যিই এক অভিনব অভিজ্ঞতা।
এরপর অবশ্য গড়ানো সময়ের হাত ধরে আমার ভিসিআর সংস্কৃতির চর্চার পরিধি বাড়তে থাকলো। কলেজে কয়েকজন বন্ধু ছিল বেগম বাজার আর বেচারাম দেউড়ীর। তাদের কল্যাণে ওই সিনেমা পাড়ায় আমার যাতায়াত প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠলো। একের পর এক দৃষ্টির সামনে বয়ে যেতে থাকলো শোলে, সিলসিলা, রোটি, ডিস্কো ড্যান্সার, ইয়ারানার মতো সিনেমা। তাল মিলিয়ে বাড়তে থাকলো সিনেমা প্রদর্শনীর সময়ের আওতাও। তখন একটা অদ্ভূত ব্যাপার দেখলাম। টানা শো চালানোর জন্য ভিসিআর যন্ত্রটি গরম হয়ে যেত। যন্ত্রকে ঠান্ডা রাখার জন্য ব্যবসায়ীরা ছোট সাইজের ফ্যান আমাদানী করলো। এই ফ্যান একটা করে বসিয়ে দেয়া হলো মেশিনের ওপরে। বাতাসে যন্ত্র ঠান্ডা। এই ভিসিআরের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় উদ্যোক্তারা শুরু করে দিলো এক টিকেটে দুই সিনেমার প্রচলন। দাম বাড়লো টিকেটের। সঙ্গে বেড়ে গেল দর্শক সংখ্যাও।
সেই সময়ে ভিসিআরে আরেক ধরণের সিনেমার অনুপ্রবেশ ঘটলো। অনুপ্রবেশই বললাম, কারণ সেই বিশেষ শ্রেণীর সিনেমাগুলো ছিলো পর্নোগ্রাফী। আমার কৈশোর অথবা যৌবনে পর্নোগ্রাফীর মুখ-চলতি নাম ছিল ব্লু ফিল্ম। বাংলা করলে নীল ছবি। ঢাকা শহরে ভিসিআর-এর দর্শককূলের পছন্দের ব্যারোমিটারের পারদ যেন চড়চড় করে উপরে উঠে গেল। তুলকালাম ঘটে গেল আমাদের মনোবিশ্বে। গোপন তার পর্দা খুলে যেন প্রকাশ্যে এসে দাঁড়ালো। প্রথমবার নীল ছবি দেখেছিলাম অবশ্য আজিমপুরের নিউ পল্টন লাইনে। সে এক অন্ধ গলির গায়ে গলি। কোথা দিয়ে যে কোথায় গিয়েছিলাম তার ভূগোল আজ আর আবিষ্কার করার কোন উপায় নেই। কিন্তু মনে পড়ে গলি বেয়ে বেয়ে একটা বেশ সুপরিসর ঘরের দেখা পেয়েছিলাম। পুলিশের চোখ এড়াতেই ছিল অমন চোর-পুলিশের খেলা। অনেক মানুষ বসেছিল নীল ছবি দেখতে। প্রায় আড়াই ঘন্টা ধরে সেই সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা, সেদিন মনে হয় আমার মনের বয়স বাড়িয়ে দিয়েছিল অনেকটাই। তখন পুরান ঢাকায় এই ব্লু ফিল্মকে সংক্ষেপে বুলু বলা হতো ভুল ইংরেজিতে। পথের পাশে হাঁটতে থাকা দালালরা কানের কাছে মৌমাছির মতো অবিরাম বলে যেতো কথাটা।
আশির দশকে ভিসিআর সংস্কিৃতি এই শহরের জনসাধারণের একটা আলাদা রুচি গড়ে তুলেছিল বোধ হয়।সিনেমা ছেড়ে নির্দোষ ভিসিআর কালচার সমাজের মানসিকতায় ভয়ঙ্কর আগ্রাসন চালিয়েছিল পরবর্তী সময়ে। কিন্তু আমার ওই সময়টার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে ভিসিআরকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিশাল একটি জনগোষ্ঠির নানা ব্যবসা আর বদলে যাওয়া দিনরাত্রির কথা। তখন ওই এলাকাগুলোতে ঢুকলে মতো হতো রুদ্ধিশ্বাস এক নগরীতে প্রবেশ করেছি। সিনেমার পর্দার মতোই নকল এক জীবনের প্রবাহ বয়ে চলেছে। ওই সময়ে পুরান ঢাকার পতিতা পল্লীগুলোতেও ভিসিআরে নীল ছবির বিশেষ প্রদর্শনী চলতো রাতভর। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে এই নীল ছবির জনপ্রিয়তা ওইসব এলাকায় দেশী মদের বাণিজ্যকেও জোরদার করে তুলেছিল।
এই শহরের অনেক হারিয়ে যাওয়া অভ্যাসের মধ্যে এই ভিসিআরও ছিলো অন্যতম।সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া এই শহরে কম্পিউটার আর ইন্টারনেটের দাপটের সামনে হারিয়ে গেছে বেমালুম সেই কালচার। হারিয়ে গেছে সেইসব রিকশার গ্যারেজ, মুর্গির বাজারের ওপরে দোতলা বাড়ি, নিউ পল্টনের অচেনা ভূগোলে অবস্থিত সেই একতলা বাড়ি। পুরান ঢাকার দিকে ওইসব এলাকায় কখনো গেলে আমি মাঝে মাঝে কান পাতি সেই মানুষগুলোর কন্ঠস্বর শোনার জন্য। মন পুরনো সময়ের কতকিছুই তো ফিরে পেতে চায়। ফেরারী স্মৃতির শহরে সব তো আর ফিরে আসে না।
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com