ফেরারী গন্ধের কাছে

  •  
  •  
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইরাজ আহমেদ

সময়টা ১৯৭০ সাল। আমি তখন ছোট । বাবার সঙ্গে বিকেলবেলা কখনো পুরানা পল্টন এলাকার গলির গভীরে একটি পাউরুটির দোকানে যেতাম রুটি কিনতে। দোকানটার নাম ছিলো ‘শিয়েস্তা ব্রেড’। সেইসব বিকেলে সুস্বাদু রুটির ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তো সে গলির বাতাসে। বারবার নাক টেনে গন্ধটা নেয়ার চেষ্টা করতাম।দোকানের পেছনেই সম্ভবত ছিলো কারখানা। বিকেলে রুটি তৈরীর সময় বেকারির কেমন মায়াময় ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তো। গরম রুটির চাইতে সেই গন্ধটাই বোধ হয় আমার বেশী প্রিয় ছিলো। পল্টন এলাকায় গেলে আজো নাক টেনে সেই সুগন্ধ খুঁজি। সেই বেকারিটাই লোপাট হয়ে গেছে।
এক সময় তেজগাঁও এলাকায় নাবিস্কোর বিস্কিট তৈরীর ঘ্রাণ ছিলো বিখ্যাত। গলিতে ঢুকলে পাওয়া যেতো সাবানের গন্ধ। ছোট ছোট কারখানার চিমনি দিয়ে সে গন্ধ বের হয়ে এসে ছড়িয়ে যেতো শহরময়। আজ সেই কারখানা আছে। কিন্তু গন্ধের রাজ্যপাট কেন জানি হারিয়ে গেছে।
এরকম হারানো ঘ্রাণের রেশ আজো গোয়েন্দা গল্পের রহস্যের মতো আমাকে তাড়া করে ফেরে। আমি খুঁজি সেই হারানো ঘ্রাণের রাজ্যপাট।একটা শহরের বেড়ে ওঠার পেছনে এরকম গন্ধের একটা ভূমিকা থাকে। অন্তত আমার তাই মনে হয়। এরকম গন্ধ শহরের এক একটা এলাকা, এক একটা রাস্তাকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। শহরের একান্ত নিজস্ব গন্ধের একটা জগৎ থাকে।
স্কুলে যাবার সময় তখনকার শাহবাগের মোড়ে ঘোড়ার গায়ের গন্ধ পেতাম। রেসের ঘোড়া। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ঢাকার রেসকোর্সে ঘোড়দৌড় হতো। ঘোড়াগুলো থাকতো মাঠের এক পাশে। সকালবেলা জকিরা মাঠ লাগোয়া ফুটপাতে ঘোড়াগেুলোকে দলাই-মলাই করতো। ঘোড়ার গায়ের দমচাপা গন্ধ স্মৃতিতে গেঁথে আছে।
ঢাকায় একদা ফুল বিক্রির প্রধান জায়গা ছিলো হাইকোর্টের সামনে। এই সময়ের মতো ফুলের বেসাতি গোটা শহরে ছড়িযে পড়েনি। বৃষ্টির দিনে ওই এলাকা দিয়ে যাবার সময় গা ছমছম করা বেলি ফুলের ঘ্রাণ, নিঃশ্বাস টানলে আজো ফিরে পাই।পুরনো শহরের নারিন্দা, নবাবগঞ্জ এলাকায় একদা করাত কল ছিলো। এরকম কাঠ চেরাইয়ের দোকান ছিলো গোপীবাগ এলাকাতেও। ভেজা অথবা শুকনো কাঠের গন্ধ, দোকানের সামনে স্তুপ হয়ে পড়ে থাকা কাঠের গুড়োর ঘ্রাণও হারিয়ে গেছে।
এক সময়ে নিউমার্কেটে ঢুকলে নাকে ভেসে আসতো রঙ আর বইয়ের গন্ধ। পশ্চিম দিকের গেট পার হলেও বারান্দায় সারি সারি বই আর স্টেশনারী দোকান। মনে হয় তখন কেউ চোখ বেঁধে ছেড়ে দিলেও বুঝতে পারতাম চলে এসেছি নিউমার্কেটে। শিল্পীদের রঙ, তুলি, ইজেল কেনার বেশ অনেকগুলো দোকান ছিলো। দিনের যে কোন সময়ে বারান্দা ধরে হেঁটে গেলে রঙের গন্ধ আচ্ছন্ন করতো। যেমন আচ্ছন্ন করতো বইয়ের পৃষ্টা থেকে উঠে আসা চিরকালের সুগন্ধ।নিউমার্কেটে এখন সেইসব দোকানই ধীরে ধীরে গুটিয়ে গেছে।

আজকাল কেউ আর প্রেমপত্র লেখে না। বাঘের মতো সেই ভালোবাসার চিঠিকে খেয়ে ফেলেছে ইন্টারনেট আর ফোনে ক্ষুদে বার্তা। আমি জীবনে খুব বেশী প্রেমপত্র পাইনি। তবে ডাকপিওনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছি অনেক বেশী। পাড়ার বড় ভাইদের ভালোবাসার চিঠি যথাস্থানে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব মাঝে মাঝে এসে পড়তো আমার কাঁধে। সেইসব দুরুদুরু কম্পমান চিঠি জামার বুক পকেটে নিয়ে যাবার সময় গন্ধ পেতাম। বেশীরভাগ সময়ই সেটা ট্যালকম পাউডারের।তখন প্রেমের চিঠির মধ্যে এরকম সুগন্ধ পাউডার ছড়িযে দেযার রেওয়াজ ছিলো। তেমন চিঠি তো এখন আর কেউ কাউকে লেখে না।

ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকায় বিক্রি হতো আতর। খোলা জায়গায় আতর আর রুমাল নিযে বসে থাকতো বিক্রেতা। আতরের সেই গন্ধ এখন আর এই ঘ্রাণযন্ত্র খুঁজেই পায় না্। যেমন আর পাওয়া যায় না সিনেমা হলের ভেতরে ঢুকলে সুঘ্রাণ। কেমন মাথা ঝিম ধরানো সুঘ্রাণ ভাসতো হলের ভেতরে। ছবি দেখে বের হয়ে আসার পরেও জামায় গন্ধটা লেগে থাকতো। আবার স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা দেখতে বসে গ্যালারতে অন্যরকম গন্ধ পেতাম। ভীড়ের মধ্যে মানুষের শরীরের গন্ধ।
সেইসব চেনা গন্ধ অচেনা হয়ে গেছে। শহরটাই বেমালুম পাল্টে ফেলেছে নিজেকে। তবু আমি হারানো সময়ের গন্ধ খুঁজে ফিরি এই শহরে। ফেরার ঘ্রাণের হাত ধরে ফিরতে চাই পেছনের সময়ে। কিন্তু কেউ তো কোনদিন আর ফিরতে পারে না।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com