প্রেম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শারমিন শামস্,প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

আমি কখনো বিরহের কথা বলি না। বিরহ একটা বেহুদা বস্তু। বুকের ভিতরে চাপ চাপ ব্যথাবোধ নিয়ে হেঁটে চলে বসা- আমি চাইনে চাইনে চাইনে। তার চেয়ে ভালো কাছে কাছে থাকা। তার চেয়ে ভালো ভালোবাসতে বাসতে কোথায় কোন অচিন সময়ের ভিতরে হুট করে ঢুকে পড়া আর একের পর এক আবিস্কার করে যাওয়া সোলেমানের রত্নভাণ্ডার।তুমি আমার কাছে আসলে আমি বুঝি, আমার ভিতরে জমে আছে কোন্ এক প্রাচীন নদী, যে বইতে না পেরে স্তব্ধ হয়ে ছিল কত কত কাল। তুমি একটা পাথরের মত, যে আঘাত করে ভেঙ্গে দেয় আরেকটা পাথর। তুমি একটা ঝড়ের মত, যেরকম মরুভূমিতে হয়- কিংবা একটা সাই সাই বাতাস, বসন্ত দিনের!

তুমি কেমন করে জানো কত কত যুগ একটা নদীর ভিতরে ঝাঁপ দিয়ে পড়বার তৃষ্ণা নিয়ে আমি বসে ছিলাম সেই পাথরচাপা নদীটার পাশেই। আর শুধু শুধু জল বয়ে যাচ্ছিল। জল মানে সময়। জল মানে আমাদের অনুভবগুলো।

আমি প্রেমের একটা সংজ্ঞা দিয়েছিলাম। অমানবিক অসুখ। একমাত্র চুম্বনে যে অসুখে আরাম হয়, কিন্তু নিরাময় হয় না। কখনো কখনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হয়। আমি প্রেমের একটা ব্যবচ্ছেদ করতে চেয়েছিলাম। তাকে কেটে ভেঙ্গে ছিন্ন করে দেখতে চেয়েছিলাম, কতটা নির্মম আবেগ এসে মস্তিষ্কে বাসা বাঁধলে প্রেমে পড়ে মানুষ। কিন্তু প্রেম এমনি এক জটিলতা, যাকে টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দিলেও তার অতলের সন্ধান পাওয়া যায় না। ঠিক যেমন ঈশ্বর- অবাস্তব, তবু আছে। কেন আছে, তাও কেউ জানে না।

প্রেম কি সৃষ্টি করে? কি জানি! প্রেম কি ধ্বংস করে? জানিনে। পৃথিবীর বাতাসে, মাটিতে, জলজ তৃণমূলে, সমুদ্রের তীর ধরে প্রেম কেন ক্লান্তিহীন ওৎ পেতে থাকে, কেন এত শয়তানীমাখা বুদ্ধি তার গাঁটে গাঁটে- জানা নাই! প্রেম শুধু খুন করে। খুন হয়ে যেতে যেতে মাটিতে প্রাণহীন মুখ থুবড়ে পড়বার শেষ মুহূর্তটাতে প্রেমই আবার টেনে তোলে, তুলে নিয়ে আসে জীবনে।

আমি প্রেমের ভিতরে প্রেমকেই খুঁজতে চেয়েছি শুধু। আর কিছু নয়। আমি অবিরাম জীবনের ভিতরে সাঁতরাতে সাঁতরাতে জীবনকে খুলে খুলে দেখতে চেয়েছি- প্রেমে আর অপ্রেমে। আমি নৈরাশ্যর দিনগুলোতে, আত্মহত্যার রাতগুলোতে নিজের ভিতর থেকে ছেঁকে আনতে চেয়েছি বেঁচে থাকার তাগিদ আর তারপর মুঠো ভরে তুলে এনেছি কড়কড়ে প্রেম। প্রেম তুমি ঝুপ করে নেমে আসো, যেন তুমি সন্ধ্যা।যেন তুমি সন্ধ্যামালতী, তোমার ঘ্রাণের তীব্রতায় নেশা ধরে আসে। আমি তো নেশারু। পথের পাশে ঝিম ধরা বিতাড়িত মানুষ, কেউ চায় না যারে। প্রেম তুমি তাকে চাও। তুমিই তাকে চাও। সেও কি তোমাকে?

নিজের ভিতরে আমি সহস্র বছর রং তুলি পেন্সিলে ইরেজারে তোমাকে এঁকেছি। তুমিও কি একেঁছিলে? যেমন সন্ধ্যার আগে? যেমন রাতের গভীরতায় আমাকে তোমার মনে পড়ে? তুমি কি আমারে চাও? আমি সে জানি।

জীবনযাপনের ভিতরে আমি একলা হেঁটে যাই, যেমন সবাই যায়। মৃত্যুতেও হাঁটি। মৃত্যু তো অমোঘ। জীবন যাপনের অগ্নিদহন পান করে করে আমিও প্রস্তুত হই মহাপ্রস্থানের। যেমন সবাই। আমাদের ঘর গেরস্থালী, আমাদের অন্তহীন কামনা বাসনা, পার্থিব অপার্থিব চাওয়া পাওয়ার সমারোহে আমি যে বিষাদনূরি জমাই গোপনে! কোন এক হরিৎ বিকেলে খুলে দেখি বুকের বাক্স- ভরে গেছে। একদম কানায় কানায়। তুমুল সেই হট্টগোলের ভিড়ে, মানুষের কথায়, কানাঘুষায়, চোরাচাহনিতে আমি বিব্রত, তাও পথ টেনে চলি। বিষাদ বাক্সের গোপন অন্ধকারে আলো ফেলা মানুষ এসেছে কেউ। আমি তাকে চিনতে পারিনা। জানতে পারি না। বুঝতেও পারিনেকো। হায়! সে কি এলো?

প্রেম তুমি তুমুল আঁধার, কোথা থেকে এলে? পৃথিবীর তিনভাগ জল আর একভাগ স্থলের কোথায় তোমার বাস? তুমি কি আগুন? তুমি কি বাষ্প? তুমি কি আলো? তুমি কি বেদনা? তুমি কি আনন্দ? তুমি কি সুখ? তুমিই অসুখ?

আমি চেয়েছি দূরে চলে যাই। আমি চাইতাম, মেঘে মিশে যাই। আমি চেয়েছি, কিছুই নাহি চাই। প্রেম, তুমি চলে যেও।প্রেম তুমি ঘুরে এসো অন্য পৃথিবী থেকে। আমি জরভরৎ, আমি অপ্রতিভ, আমি এলোমেলো, আমি বোকাসোকা। তুমি চলে যাও। ভালোবাসার ভিতরে, তীব্র চুম্বনের ভিতরে, শরীরের ভিতরে তুমি কেন বেড়ে ওঠো? প্রেম, তোমাকে ঘৃণা করি। তোমার বিনাশ হোক। এই অবিনাশী সন্ধ্যার বাতাসে আমি তোমায় অভিশাপ দিলাম!

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com