প্রাণের মানুষ, কাছের মানুষ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আহমেদ শামীম

সঞ্জীব চৌধুরী। প্রাণের মানুষ। কাছের মানুষ। আত্মজ সম্পর্ক। নবকুমার স্কুলে ক্লাশ টু’তে পড়াকালীন সময়ে টিএসসির মধুদার ছেলে অরুণ আমি আর সঞ্জীবদা, বেশ সখ্য ছিল আমাদের মাঝে। বিশেষ করে ছুটির পর অরুণের বাসায় ওর দিদির কাছে মাখন দিয়ে রুটি খাওয়ার লোভে প্রতিদিনই যাওয়া হতো। হেড মাস্টার মান্নান স্যার খুবই পছন্দ করতেন আমাদের কজনাকে। উনার মতে ভালো ছাত্র ছিলাম। মৌলভী ও পিটি স্যারের আন্তরিকতা এখনও স্মৃতির মনিকোঠায় ছুঁয়ে আছে। লালবাগের বেশ কজন শিয়া সহপাঠী ছিল যা কালের বিবর্তনে হারিয়ে ফেলেছি। ক্লাশ সিক্সে ওঠার পর আমাকে আজিমপুর ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলে বাবা ভর্তি করান। ধীরে ধীরে হারাতে থাকি শৈশবের মজার দিনগুলো। হারাই অরুণ আর সঞ্জীবদাকেও। ১৯৯১ইং নিউনেশন পত্রিকার মাহাবুব ভাইয়ের কল্যাণে নাঈম ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা এবং আজকের কাগজ পত্রিকায় যোগদান। এবার কর্ম জীবনের সঙ্গে ফিরে পেলাম ঝাকড়া চুলওয়ালা, ছুটোছুটি করে গুনগুনিয়ে গানের কলির বন্দনায় মেতে থাকা শৈশবের সহপাঠী বন্ধু সঞ্জীবদাকে। রাতের পর রাত আড্ডা এবং কাজের অবসরে ছুটে বেড়িয়েছি জাফর ইকবাল জুয়েল, মিঠু, প্রয়াত ফারুক আহম্মেদ, মুস্তাফিজুর রহমান, বাপ্পা মজুমদার, কাওসার ভাই, রাসেল ও’নিল, সালাউদ্দীন লাভলু,অশোক কর্মকার, আবিদা নাসরীন কলি, দীলরুবা আর প্রজ্ঞা নাসরীন শিল্পীর অতিথি পরায়ণ। যা সবাইকে মুগ্ধকর পরিবেশে আনন্দ আড্ডার সঙ্গে একের পর এক গানের সুরে বিমোহিত করে রাখার প্রেরণা জাগাতো সঞ্জীবদা একাই। আমরা গানের তালে তালে একেকজন হয়তো কাঠে কাঠ ঠুকে বা চামচের সঙ্গে বাটি পিটিয়ে সঞ্জীবের গাওয়া গানটিকে আরো মধুময় ছন্দকে বাড়িয়ে তোলার চেস্টায় উদগ্রীব থাকতাম। সে কি মিলন মেলা। পল্টনে জুয়েল হাউসে তখন ভোরের কাগজ পত্রিকার অপিস। সেখান থেকেই মেলা পাতার সাপ্তাহিক ব্রড শীড বের করার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। মতি ভাই ( বর্তমানে প্রথম আলোর সম্পাদক) দায়িত্ব দিলেন সঞ্জীবদাকে। আনন্দ উচ্ছাসের সঙ্গে একের পর এক মারকাট সংখ্যা বের হচ্ছে। গানের কলি, ছন্দ, কবিতা কোনটাই থেমে থাকেনি। তার প্রতিভাময় হেডিং, ছবির কম্পোজিসন মেকাপ সংখ্যাটিকে সুন্দর সাবলীলভাবে সম্পাদন করা থেকে উত্তোরতর বৃদ্ধি করে গেছেন। তার প্রচুর সহকর্মী এবং শিক্ষাণবীশ সাংবাদিকতাকে পূর্ণ সাংবাদিকে রুপান্তর করার অবদান আজো কেউ ভুলতে পারেনি। ‘মেলা’ শিরোনামে একটি নিয়মিত সাপ্তাহিক বিনোদন পাতা সাড়া পড়ে ব্যাপক। ২০০৫-এ দৈনিক যায়যায়দিন এ চিফ ফিচার এডিটর হিসেবে নিযুক্ত করেন নিজেকে। আবারও কিছুটা দূরত্ব হয়ে যায় আমার সঙ্গে। হঠাৎ কখোনো দেখা হলেও আত্মিক সম্পর্কের রেশ একটুকুও কমেনি। হয়তো রাস্তায় বা অফিসের নীচে দেখা হলো সঙ্গে সঙ্গে বললো ওই চলেন কাম আছে ঘুইরা আসি। সেই ঘোরা পরদিন সকাল বা বিকাল পর্যন্ত হতো। ২০০৭ এর নভেম্বর মাসের ১০ তারিখ শেষ দেখা এবং রাত ১২ টা পর্যন্ত আড্ডা। জমে থাকা অনেক কথা আদান প্রদান। বাসায় নিমণ্ত্রণ। এক ফাঁকে শিল্পিকে ফোন দিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলানো। ১৯ নভেম্বর রাত ১০ টায় খবর পেলাম সঞ্জীবদা অ্যাপলো হাসপাতালে। কাছে ছিলো বন্ধুবর রোকন রহমান আর নাহিদ। ছুটলাম হাসপাতালে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষণ। শুয়ে আছে কোমায়। হাজারো ভক্তের প্রার্থনা। কান্না থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা। হাসপাতালের বাহিরে মাঠের কাছে বেঞ্চিতে বসে থরথর করে কাঁপছি আর চোখের জলে গাল ভেজাচ্ছি। তখনকার অনুভূতি বুকের পাঁজরে আঘাত পাওয়ার ঘন ঘন যন্ত্রণা। ৪৫ বছর বয়সে স্ত্রী নাসরীন শিল্পী আর ৫ বছরের কিংবদন্তীকে এবং আমদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন সঞ্জীব। এত অল্প সময়ে তার চলে যাওয়া মেনে নিতে পারিনি। তারপরও সবাইকে একদিনতো চলে যেতেই হবে। সৃষ্টিকর্তার কাছে আকুল প্রার্থনা সঞ্জীবসহ আর যারা আমাদের ছেড়ে এ ধরনী থেকে চলে গেছে তাদের আত্মাকে তুমি শান্তিতে রেখো। আমিন।

ছবি: সংগ্রহ

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com