প্রতিবিম্ব…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিলা চৌধুরী

আবছা মনে পড়ে, তার আগের ছোট্ট বেলার কোন ঘটনাই আমার মনে পড়ে না।আমাদের ফাউগান বড়বাড়ীতে অনেকগুলো শরিককের একসঙ্গে বসবাস।বাড়ির মাঝখানে সব শরিকদের ব্যবহারের জন্যে একটা উঠোন রয়েছে ।সেখানে প্রত্যেক পরিবারের সদস্যদের বিয়ে হয়ে থাকে ।আধুনিক মানুষ  কমিউনিটি সেন্টার বা হল বলে যেটাকে।শুধু বিয়েই নয় রোজ সকালে সেখানে কীর্তন  দিতেন   নির্মল দার বাবা আমার  জেঠু যাকে কোরামিন ডাক্তার বলতো সবাই ।গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার ছিলেন তো তাই।কোরামিন জেঠুর সঙ্গে আশুদার বাবা জেঠু।ওনারা গত হবার পর সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেছিলেন বরেন্দ্র জেঠু এখন রঞ্জদা আর ফনিদা।

ফাউগান গ্রামের বুড়ো বটগাছ

ফাউগান বাজারের মসজিদের মাইক থেকে আসা আজান শেষ হবার কিছু সময় পরেই কির্তনের শব্দে আমাদের প্রতিদিন সকাল শুরু হতো আর এখানো সেটা যথারীতি হয়ে আসছে।

সেই উঠোন আজও তেমনি রয়েছে আর প্রতিবারের মতো চৈত্র মাসে চড়কধারী সন্যাসীদের দেইল কীর্তন,বৃষ্টির প্রার্থনায় প্যাক কীর্তন নয়তো আল্লাহ মেঘ দে পানি দে গেয়ে বাড়ির ছেলে বুড়ো,বৌ, ঝিদের বালতি ভর্তি জল ছিটিয়ে দেয়া উঠোনের কাদায় গড়াগড়ি,দীপাবলির রাতে প্রদীপের সাজ, কি না হয় সেখানে।মনে পড়ে প্রতি বছর এই উঠোনেই কবি গান, লোক কাহিনীর পালা গান, বেহুলা লক্ষীন্দর,,রহিম রূপবান, লাইলী মজনু  ,বেদেনীর প্রেম. …কত্তো কি আরও ।দূর্গা পূজো, পয়লা বৈশাখ এলেই পারূলী গাংঙ -এ বেদেদের নৌকো এসে ভিড়তো ঘাটে ।আর বেদেনীরা কাচের চুড়ি সহ নানান প্রসাদনী পন্য নিয়ে আমাদের সেই বড় উঠোনে বসতো।লান,নীল, সবুজ কতো রংয়ের চুড়ি থাকতো।সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়তাম কে কার আগে সবচেয়ে ভালো টা নেবার জন্যে।সঙ্গে বাদর খেলা, সাপের খেলা. ….আরো একটা মজার জিনিস ছিল শিঙ্গাওয়ালীর শিঙ্গা লাগানো ।বাতের রোগীর গায়ে একটু চামড়া কেটে একটা শিং লাগিয়ে মুখ দিয়ে শুষে রক্ত বের করতো । এখন এসব অনেক আগেই  বিস্মৃত ।ভাবলে হাসি যেমনি পায় তেমনি একটা মন খারাপ করা চিনচিনে কষ্ট ও হয়। ছোট্ট নতুন দুই চোখে তখন সেটাই অবাক বিস্ময়ের ছিল ।

ছোটবেলায় হারিকেনের আলোই ছিল আমাদের ভরসা।বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয় ছিয়ানব্বই খৃষ্টাব্দে।ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান আমাদের এলাকায় তাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যে প্রকৃতি দেবীর কৃপা যথেষ্ট রয়েছে।গরমের দিনে সেই বড় উঠোনে খেজুর পাতার পাটি পেতে আমরা সবাই বসতাম বিকেল গড়িয়ে পরতেই এমনকি সারারাত সেখানেই খেয়ে ঘুমোতাম।আমার বাবা মধ্যরাত্রি  অবধি সংবাদ নয়তো কোন ম্যাগাজিন বা উপন্যাসে  ডুবে থাকার পাশাপাশি তাল পাখায় হাওয়া করতেন।মাঝে মাঝে একটা গামছা দিয়ে আমাদের ভাইবোনদের গা ঘেমে উঠলে মুছে দিতেন।

আমাদের বাড়ির উঠান

আর মশা তাড়িয়ে দিতেন।আর আমরা নিরাপদ আশ্রয়ে ঘুমের রাজ্যে সবাই ভেসে বেড়াতাম।

আমাদের বাড়িতে খবরের কাগজ আসতো আমার দাদুর সময়কাল থেকে।বাবা মেশিন টুলস ফ্যাক্টরীতে চাকরি করতেন সেখানেই খবরের কাগজ নিতেন প্রতিদিন।তাই সন্ধ্যের আগে আমাদের বাড়িতে খবরের কাগজ এসে পৌঁছাতো না।আর সেই খবরের কাগজ বাবা বাড়ি ফিরলেই একটা জলচৌকিতে বসে দাদু জোরে জোরে পড়তেন।আর পাড়ার অনেকেই সেই দাদুর জোরে জোরে সংবাদ পাঠের শ্রোতা আর সমালোচক ছিলেন।সন্ধের পর সেই খবরের কাগজ বাবা আমাদের কোলের কাছে বসিয়ে পাতার পর পাতা পড়ে যেতেন।একটু বড় হলাম, কথাও ভালো করে বলতে শিখিনি তখনও, বাবা খবরের কাগজের     শিরোনাম দেখে দেখে আমাদের বর্ণমালা শিখিয়েছেন।তারপর বাক্য উচ্চারণ শিখিয়েছেন বিস্তারিত খবর পড়িয়ে পড়িয়ে।সেই সুবাদেই একজন সাংবাদিকের নাম আমার বাক্য উচ্চারণে প্রথম পড়েছিলাম যার নাম হয়তো আমৃত্যু ভুলবোনা।তিনি শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন যাঁকে আমি কোনদিনও দেখিনি, মনে পড়ে উত্তরবঙ্গ সংবাদদাতা ছিলেন তিনি, ব্যাস এতটুকুই আমাকে স্বপ্ন দেখার সাহস দেখিয়েছিল সাংবাদিকতা নিয়ে পড়তে।

গ্রামের সরিষা ক্ষেতে আমি

সেই আমাদের বড় উঠোন আজও তেমনি রয়েছে – আর রয়েছে এখন একলা  বসে স্মৃতি রোমন্থনের জন্যে অমূল্য অতীতের মধুর মুহূর্ত।যা আর কোনদিনও ফিরে পাবার নয়।ফিরে আর কোনদিনই আসবে না বাবা আর  বাবার পাশে উঠোনে শুয়ে রাতের তারা ভরা আকাশে খুঁজে বেড়ানো  সপ্তর্ষিমন্ডলের সাতটি তারারা,নাঙ্গলবন্দ,আকাশ গঙ্গা, চন্দ্রগ্রহনের রাতে অর্ধচন্দ্র দেখা ।মনে পড়ে খুব ছোট বেলায় আকাশে ছিয়াশি বছর পর উদয় হওয়া হ্যালীর ধুমকেতু দেখার সেই না বলা শিহরনের মুহূর্ত।ঘুম থেকে মাঝরাতে আমার ছোট ভাই কল্লোলকে সেই ধুমকেতু দেখাতে ঘুম ভাঙ্গাতে বাবার সেকি কসরত।বিস্কুটের টুকরো কামড়ে বাবার কোলে আবার ঘুম ।ধুমকেতুর লেজখানা উঠোন থেকে ঠিকঠাক দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল না বলে বাবা টর্চ লাইট জ্বালিয়ে বাড়ির বাইরে আম বাগানে নিয়ে গিয়েছিল ।

মনে পড়ে আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন ডাকাতির উৎপাত ছিল খুবই ।রাত জেগে পালা করে পাহারা দিতো প্রতি গ্রামে।কোনও গ্রামে ডাকাত এসেছে খবর হলেই হলো হৈহৈ আওয়াজে চারদিক কাঁপিয়ে হিন্দু মুসলিম সবাই ডাকাত তাড়াতে একজোট হয়ে ঝাপিয়ে পড়তো।বাবা আমাদের বড় বাড়ির সব মেয়ে বৌ দের নিয়ে ধান খেতের আলে কাদা জলে মাটির উপর শুয়ে দিয়ে লাঠি হাতে বসে আগলে রাখতো ।নয়তো বা কোনো ঝোপের আড়ালে ।তারপর কতো সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেছে আমরা সেই একই ভাবে নিরাপদে আগলে থাকতাম হিন্দু মুসলিম সবার একজোট হয়ে পাহারায়। কোনোদিনও দেখিনি আমাদের এলাকার কোনও সংখ্যালঘু অত্যাচারিত হয়ে পূর্ব পুরুষের ভিটে থেকে উৎখাত হয়ে জন্মভূমি ছাড়তে।আমার বাবা জ্যোতিষ দেবনাথ খুব সাধারণ একজন সমাজতান্ত্রিক যোদ্ধা ছিলেন ।মুক্তি যুদ্ধ থেকে শুরু করে সমাজের জাত পাতের ভেদাভেদ ভুলে সবাই একসঙ্গে একজোট হয়ে সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে সবার একসঙ্গে থাকার মধুর পরিনামটা কি সেটা সবাইকে শিখিয়ে গিয়েছিলেন আমার বাবা।আশির দশকের পর নব্বইয়ের দশক একে একে আরো বেশ ক দশক পেরিয়ে গেল। আশির দশকের সেই ডাকাতরা আজ দশকের পর দশক ধরে একই রয়ে গেল ।কখনও সেই ডাকাতরা মূখোশ পাল্টে সন্ত্রাসী, কখনও জংগি,কখনও ধর্ষকামী নামে হাজির ।কিন্তু আমাদের সেই অখ্যাত গাঁয়ের খুব সামান্য একটা যৌথ শরিকদের উঠোন একইভাবে একইরকম রয়েছে আর রয়েছে ফাউগান গ্রামের মানুষের  সাথে লক্ষীপুর,রাজেন্দ্রপুর,ডুমনি, প্রহলাদপুর,আতলরা,বাঁশকোপা, দমদমা,রাজাবাড়ি সহ সব গ্রামের মানুষের সম্পৃতির বন্ধন।

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com