প্যারিস থেকে জুরিখ…পর্ব-৪

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

বাঙালীদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ…

২০১৩ সালে যখন প্রথমবার প্যারিস গিয়েছিলাম তখন মাত্র কয়েক ঘণ্টা ছিলাম। ওইবার বার্লিন থেকে বাস যোগে সকালে প্যারিস শহর পৌঁছে পড়েছিলাম ট্রাফিকের কবলে। তাতেই চলে গিয়েছিল মূল্যবান কিছু সময়। সেই বার মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য সরাসরি উঠছেলিাম শশুড় পক্ষীয় এক আত্মীয়ের বাসায়। আবদুল কাদের ভাই আমাকে বাস টার্মিনাল থেকেই নিয়ে গিয়েছিলেন তার বাসায়। ভাবীর হাতের রান্না করা কয়েক পদের খাবারে সাজানো নাস্তার টেবিল। সঙ্গে আপেল, আঙ্গুরসহ বিভিন্ন রকম ফল। দ্রুত সকালের নাস্তা শেষ করে বেরিয়ে পড়েছিলাম প্যারিস শহরের গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান দেখতে। সঙ্গ দিচ্ছিলেন আমাদের মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার কয়েস মিয়া। তিনিও অনেক বছর ধরে প্যারিস শহরে থাকেন। কিন্তু সেবার বৃষ্টি আর ঠান্ডা জেঁকে বসেছিল। এ কারণে খুব একটা ঘুরে দেখা হয়নি। তার উপর ছিল সময়ের তাড়া। কারণ রাতেই শহর প্যারিস ছেড়ে ইতালির রোমরে উদ্দেশ্যে যাত্রার জন্য আগে থেকেই টিভিজি ট্রেনের টিকেট কাটা ছিল।
প্রথমবার প্যারিস দর্শনে গিয়ে অনেকটা হতাশ হয়ে শিল্প-সাহিত্য আর সংস্কৃতির শহর ছাড়তে হয়েছিল। এবার কিন্তু সেই চাপ ছিল না। সময়ের তাড়া ছিল না। প্যারিস শহরেই দিন পনেরো কাটিয়েছি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে বেড়িয়েছি সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। প্যারিসে বসবাসকারী বাংলাদেশী যারা আগে থেকে পরিচিত ছিলেন তাদের আতিথেয়তা আর সান্নিধ্য আমাদেরকে মুগ্ধ করেছিল।
জলবায়ু সম্মেলনে গত কয়েক বছর ধরে বরাবরই যাচ্ছেন জনকণ্ঠের সিটি এডিটর কাওসার রহমান ভাই। একদিন বিকেলে ঢাকায় রিপোর্ট পাঠানোর কাজ শেষ হলে বললেন, চল আমার সঙ্গ। কোথায় সেই প্রশ্ন করাই অবান্তর। কারণ ঢাকা থেকে যাওয়া সাংবাদিকদের টিমে তিনি সবার সিনিয়র। তাই কোন প্রশ্ন না করেই বললাম চলেন। আমাদের সঙ্গী রবিউল ইসলাম। সম্মেলন কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আমরা সোজা লা বুর্জ রেল স্টেশনে পৌছে সেখান থেকে চলে গেলাম গার্দ দো নর্দ-এ। সেখান থেকে মেট্রো পরিবর্তন করে ১৩ নম্বর মেট্রোতে। গন্তব্য সেনডিনি ইউনিকা। কঠিন গাদাগাদি অবস্থা। পিক আওয়ার। হাজার হাজার মানুষ চড়ছে মেট্রোতে।
আমরা ভীড় ঠেলে সেনডিনি ইউনিকায় নামতেই সামনে হাজির এক ভদ্রলোক। কাওসার ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন, উনার নাম কামরুল ইসলাম বকুল। আমার আত্নীয়। আমরা এখন উনার বাসায় যাব। রাতে সেখানেই ডিনার। তারপর বকুল ভাইকে অনুসরণ তরে আমরা হাঁটতে থাকলাম। কিছুদূর হাঁটার পর একটি সিটি বাসে উঠলাম। নামলাম ক্লোস আরনোতে। সেখানকারই একটা এলাকা স্টেইন্স। ফরাসী ভাষায় বলা হয় স্তা। বকুল ভাইয়ের বাসা এখানেই।
বাসায় উঠে শুরু হল নানা গল্প। কামরুল ইসলাম বকুল গাজীপুরের কাপাসিয়ার বাসিন্ধা। এলাকায় থাকতে রাজনীতি করতেন। কাপাসিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। দীর্ঘদিন ছিলেন ফ্রান্স আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি। বর্তমানে আছেন উপদেষ্টা পরিষদে। জীবন জীবকিার তাগিদে সেই ১৯৮৫ সালে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে। এখনও আছেন। বঙ্গবন্ধুর ভক্ত বকুল ভাইয়ের বাসার চার দেয়াল জুড়েই আছে সেই চিহ্ন। দেশ দেশের রাজনীতিসহ নানান গল্পের ফাঁকে পরিচয় হল ভাবী সাথে। শাহনাজ বেগম শিউলী অত্যন্ত মিষ্টভাষী ও অতিথিপরায়ণ। রান্নাবান্নার ফাঁকে ফাঁকেই আমাদের সঙ্গে গল্পে যোগ দিচ্ছিলেন।
এই ভদ্র মহিলা সেই রাতে আমাদের জন্য মাছ-মাংস মিলিয়ে অন্তত আট-দশ পদের খাবার তৈরি করেছিলেন। খাবার টেবিলে নিজ হাতে পরিবেশন করেছেন। রান্না এতোটাই সুস্বাদু যে প্রশংসা না করলে অবিচার করা হবে। আমি বরাবরই স্বল্প ভোগ মানুষ। কিন্তু সেদিন রাতে জোর করেই সবগুলো খাবার একটু একটু করে খেতে হয়েছিল স্বাদ নেয়ার জন্য।
ওই রাতের আড্ডা শেষে তীব্র শীতের মধ্যে যখন আমরা নিজেদের ডেরার উদ্দেশ্যে ফিলছিলাম। বাস স্টপেজ ক্লোস আরনো’তে দাঁড়িয়ে কাওসার ভাই, আমি ও রবিউল যখন অপেক্ষা করছিলাম তখনই চোখে পড়লো দু’জন লোক এসে আশপাশের দেয়ালে পোস্টার সাঁটাচ্ছে। ওই সময় ফ্রান্সে নির্বাচনী প্রচারণা চলছিল। আমাদেরকে গাড়িতে উঠিয়ে দিতে বাস স্টপেজ পর্যন্ত আসা বকুল ভাই বললেন, আমাদের দেশের মত এখানে নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে মাতামাতি নেই। সব কিছু হয় নিরবে। পাবলিকের ডিস্ট্রার্ব হয় এমন কাজ রাজনৈতিক দলগুলো করে না।
এরই মধ্যে নির্ধারিত বাস এসে গেল। আমি এবং রবিউল একই পথের যাত্রী। আর কাওসার ভাই অন্য দিকের। তাই আমরা দু’জন বাসে চড়লাম। শেষ স্টপেজ পোর্ট দো ক্লিনকোর্টে নামলাম। তখনই কিছুটা ভয় আমাদের মধ্যে জেঁকে বসেছিল। মেট্রোর শেষ স্টপেজে লোকজন নেই বললেই চলে। হাতে গোণা কয়েকজন । আমরা ভয়ে ভয়ে নেমে গেলাম সাবওয়েতে। সেখানে যাত্রীর সংখ্যা নগন্য। এমনকি গার্দ দো নর্দ গামী নির্ধারিত মেট্রোতে আমরা মাত্র কয়েকজন। রাত প্রায় সাড়ে ১২টা। ট্রেন ছাড়ার পর দুই তিন স্টেশন অতিক্রম করতেই দেখলাম ধীরে ধীরে ভরে উঠছে লোকজনে। ভয় কিছুটা দূর হল। আমরাও চলে আসলাম গন্তব্যে।
শুধু ওই রাতই নয়, প্যারিসে থাকাকালীন সময়ে প্রায় প্রতি রাতেই আমাদেরকে কোন না কোন বাঙালি পরিবারের আতিথেয়তা গ্রহণ করতে হয়েছে। একদিন সন্ধ্যায় গার্দ দো নর্দ স্টেশনে নেমে সাবওয়ে থেকে মূল শহরে উঠতেই একটি বারে দেখা মিলল মোল্লা আমজাদ হোসেন ভাইয়ের। তিনিই দূর থেকে আমাকে ডেকে নিয়ে বসালেন। তারপর পানীয় গ্লাসে চুমুক আর আড্ডা। সেখানে অনেক বাঙালী। ঘণ্টা দেড়েক পর সেই আড্ডা ছেড়ে ছুট দিলাম পূর্ব নির্ধারিত একটি নিমন্ত্রণে। আমি আর তৌফিক মারুফ , সঙ্গে রবিউল ইসলাম। আমাদের ডেরা পন্টাস দো ক্লিসিতে গিয়ে দেখলাম আমাদের নিমন্ত্রণ জানানো রিয়াজুল কবীর সুহেল অপেক্ষা করছেন। তার সঙ্গে বারবেস হোসহোসে মেট্রো স্টেশন থেকে রওয়ানা হলাম তার বাসা গাত্তো দে রো’র উদ্দেশ্যে।
সুহেল রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন ফ্রান্সে। থাকেন ভগ্নিপতি বেলায়েত হোসেনের সাথে। সপ্তাহের ছয় দিন থাকেন কাজে। তার বন্ধু আমার সহকর্মী আলী রিয়াজের মাধ্যমেই তার সঙ্গে পরিচয়। সোহেলের বাসায় যাওয়ার পর আয়োজন দেখেই ভড়কে গেলাম। গলদা চিংড়ি, নানান পদের মাছ, গরু, ও মুরগীর মাংস, ডিম, সব্জি, পোলাও সাদা ভাত কি নেই। ভারী খাবারের পর ডেজার্ট তো আছেই। তবে এতো এতো পদের খাবার থাকলেও তৌফিক মারুফ বরাবরই নিরামিষ ভোজ। সব রেখে সব্জি আর ডিমই খেতে পছন্দ করলেন তিনি। সোহেলে আতিথেয়তায় আমরা মুগ্ধ। গভীর রাতে তার ডেরা থেকে বের হয়ে আমরা চলে গেলাম নিজেদের অস্থায়ী ডেরায়।
আরেক জনের কথা এই ভ্রমণ গল্পে না বললেই নয়। দেবেশ বড়–য়া। অত্যন্ত বিনীয় এই ভদ্রলোক স্বপরিবারে থাকেন প্যারিসে। নিজে ছোট একটা ব্যবসা খুলেছেন। ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকেই কাজ করেন ঢাকার একটি বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলে। প্যারিস যাবার পর তিনি সুযোগ পেলেই আমাদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দিতেন। একদিন রাতে তার দোকানেই বসলো আড্ডা। আমি আর তৌফিক হাঁটতে হাঁটতে প্যারিস গেইট আর সেইন্ট নদী ঘুরে দেখে এক সময় ঢুকে পড়লাম দেবেশের দোকানে। এরপর যুক্ত হলেন নুরুল ওয়াহিদ। শুরু হয়ে গেল আড্ডা। চললো অনেক রাত পর্যন্ত। সেই রাতে লক্ষ্য করলাম খারাপ মানুষও আছে প্যারিস শহরে।
দেবেশের দোকানের সামনেই এক বৃদ্ধাকে একা পেয়ে দুই চোকরা তার সর্বস্ব কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু বদ্ধাও কম যান না। দুই চোকরাকেই একহাত নিয়ে ছাড়লেন। আর আমরা দোকানে বসে বসে সেই তামশা দেখছিলাম। দেবেশ জানালেন, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসীরাই মূলত প্যারিস শহরে নানা অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িত। রাত গভীর হলে এক সময় আমাদের আড্ডা থেমে যায়। যার যার মত করে বেড়িয়ে পড়ি নিজেদের গন্তব্যে।
ছবি:লেখক (চলবে)

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com