প্যারিস থেকে জুরিখ… পর্ব-৩

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

ল্যুভ মিউজিয়াম এবং লিওনার্দো’র বিখ্যাত মোনালিসা’কে দেখলাম দু’নয়ন ভরে…

প্যারিসের গল্প লিখে শেষ করা যাবে না। একইভাবে অল্প দিনের সফরে প্যারিস শহর ঘুরে দেখাও কঠিন ব্যাপার। তার উপর যদি পেশাগত দায়িত্ব থাকে ঘাড়ের উপর। তারপরও কাজের ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু সম্ভব দেখার চেষ্টা করেছি শিল্প-সাহিত্য আর সংস্কৃতির শহরকে। পেশাগত কাজ আর প্যারিসে বসবাসরত বাঙালিদের সঙ্গে আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে শহরের গুরুত্ত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘুরে দেখার চেষ্টা করেছি স্বল্প দিনের প্যারিস সফরের সময়। সঙ্গে তো বোনাস হিসেবে ছিল কখনও তীব্র শীত আবার কখনও বৃষ্টি।
আলো ঝলমল প্যারিস শহরে দেশি-বিদেশী পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে ’ল্যুভ’ মিউজিয়াম। প্যারিস ঘুরতে যাবেন আর ‘ল্যুভ মিউজিয়াম’ এ ঢু মারবেন না, তাহলে তো প্যারিস ভ্রমণই বৃথা। আবার লুভ মিউজিয়াম এ যাবেন অথচ লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির বিখ্যাত আবিস্কার ‘মোনালিসা’কে দেখবেন না তা কি করে হয়। অর্থাৎ ল্যুভ মিউজিয়াম দেখার লোভ সামালানো কারো পক্ষেই সহজ কাজ নয়।
এবারের প্যারিস ভ্রমণে, ভ্রমণ না বলে বলা ভালো পেশাগত কাজে প্যারিস যাওয়া, পুরোটা সময় একসঙ্গে ছিলাম আমি আর তৌফিক মারুফ। জলবায়ু সম্মেলন কাভার করতে একসঙ্গেই ঢাকা থেকে যাত্রা করেছিলাম। প্যারিসের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী বাংলাদেশী এনায়েত উল¬াহ ইনু ভাইয়ের আতিথেয়তায় তার ডেরায় এক সঙ্গে রাত যাপন। খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা, এবং ঘুরাঘুরি সবই হয়েছে এক সঙ্গে। প্যারিসে জলবায়ু সম্মেলন প্রায় ১৪/১৫ দিন হওয়ার কারণে আমরা দুটো রোববার পেয়েছিলাম। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সম্মেলনও বন্ধ। এক রোববার আমরা বেড়িয়ে পড়লাম প্যারিস শহর ঘুরে দেখতে। সময় থাকলে হয়তো পরিকল্পনা করে একটা ছকের মধ্যে সবকিছু ঘুরে দেখা যেতো। কিন্তু আমাদের ঘাড়ের উপর কাজের চাপ প্রতিনিয় নি:শ্বাস ছাড়ছিল। তাই সময় স্বল্পতার কারণে কোন পরিকল্পনা ছাড়াই আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি। ওই রোববারও ছিল একেবারেই পরিকল্পনাহীন।
ডিসম্বের মাসের প্রথম রোববার। সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্যাফে দো লোনা’য় সকালের নাস্তা। নাস্তা বলতে দুটি বিস্কুট, একটি বান রুটি, জেলি। সঙ্গে তাজা ফলের জুস আর গরম কফি। নাস্তা শেষ করেই বেড়িয়ে পড়লাম শহর পরিভ্রমণে। প্ল¬াস দো ক্লিসি’র যেখানটায় আমাদের ঠিকানা ছিল সেখান থেকে একটু সামনে এগোলেই মৌলি রোজ। তার সামনে থেকে সহজেই দোতলা ট্যুরিস্ট বাস পাওয়া যায়। দু’জন উঠে পড়লাম একটি বাসে। টিকেটের জন্য গুণতে হল জনপ্রতি ১০ ইউরো করে। বলে রাখা ভালো, আমরা যেখান থেকে উঠেছিলাম সেখানে শহর পরিভ্রমণের জন্য দু’টি ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠানের ট্যুরিস্ট বাস পাওয়া যায়। একটি লাল রং এর। অন্যটি খুব সম্ভবত গ্রীণ। আমরা উঠেছিলাম লাল রং এর বাসটিতে।
বাসে কোন গাইড নেই। শুধুই চালক। তবে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের জন্য গাইড বলতে বাসের প্রতিটি আসনের সঙ্গে থাকা হেডফোন। কানে দিলেই শহরের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার নানা তথ্য ভেসে আসে কানের মধ্যে। ইংলিশ ও স্প্যানিশ ভাষায় ধারাবাহিকভাবে চমৎকার উচ্চারণে বর্ণনা পাওয়া যায়। একেকটি স্থাপনায় পৌঁছার পর পর্যটকরা চাইলে সেখানে নেমে ভালো করে সেই স্থাপনার ইতিহাস-ঐতিহ্য জেনে নিতে পারেন। ঘুরে ঘুরে দেখতে পারেন। সেক্ষেত্রে পর্যটকদের হাতে থাকা টিকেটের একাংশ দিয়ে পরবর্তি বাস আসলে সেটি উঠে অন্য স্থানে যেতে পারবেন। তবে লাল রং বাসের টিকেট দিয়ে অন্য বাসে চড়া যাবে না।
যাক আমরা বাসের দোতলায় বসে রোদ বহিনি প্যারিস শহরের নানা স্থাপনা দেখছিলাম। আর ভাবছিলাম ৪০০ বছরের পুরনো আমাদের ঢাকা শহরে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা আছে, যেগুলো দেখার জন্য বছর জুড়েই পর্যটকরা বাংলাদেশে ঘুরতে আসেন। কিন্তু ইউরোপের দেশগুলোতে যেভাবে পর্যটকদের শহর পরিভ্রমণ করে ঘুরে দেখানো হয় ট্যুরিস্ট বাসে চড়িয়ে সেভাবে ঢাকায় কোন ব্যবস্থা নেই দেশি-বিদেশী পর্যটকদের জন্য।
ঘুরতে ঘুরতে এক সময় আমরা পৌঁছলাম প্যারিস শহরের গণতন্ত্রের প্রতীক ‘রিপাবলিক স্কোয়ার’-এ। সেখানে ফটোসেশন করে পাশেই বাসের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে একটি কাউন্টারে অপেক্ষা করছিলাম। তখনই পরিচয় একটি স্প্যানিশ দম্পতির সঙ্গ।ে মধ্য বয়সী মার্গারেট ও তার স্বামী, সঙ্গে তাদের তিন সন্তান। তারাও বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। পরিচয় পর্ব শেষে তাদের সঙ্গে অনেক কথা হল। মার্গারেট জানালেন, তারা প্রতি বছর সন্তানদের নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। বাংলাদেশের কথা তারা শুনেছেন জানিয়ে মার্গারেট বললেন, দেশটি সবুজে ভরা। তবে কখনও যাওয়া হয়নি। সময় সুযোগ হলে একবার তারা সবুজ বাংলাদেশও ঘুরে দেখতে আসবেন।
মিনিট কয়েক গল্পের মধ্যেই চলে আসলো আমাদের বাস। উঠে পড়লাম। এবার আমরা গিয়ে নামলাম একেবারে পৃথিবী বিখ্যাত ‘ল্যুভ’ মিউজিয়ামের সামনে। সেখানে পা রাখতেই মনে পড়ে গেল ২০০৭ সালের কথা। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে যখন ফখরুদ্দিন আহমেদ সরকারের শাসন। তখন বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর থেকে রাতের আঁধারে গুরুত্ত্বপূর্ণ বেশ কিছু প্রতœতত্ব বাক্সবন্দি করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্যারিসে। এ নিয়ে সেই সময় দেশজুড়ে তুমুল প্রতিবাদ হয় এবং বিষয়টি আলোচনার ঝড় তুলে।
‘ল্যুভ’ মিউজিয়ামের প্রধান ফটক ছেড়ে সামনের দিকে এগুতেই চোখে পড়ল পর্যটকদের দীর্ঘ লাইন। বিশাল কিউ এর মধ্যে ঢুকে পড়লাম। প্রথম মনে হয়েছিল পর্যটকদের দীর্ঘ এই লাইন ল্যুভ মিউজিয়ামের ভিতরে প্রবেশের টিকেট সংগ্রহের জন্য। কিন্তু কাছাকাছি যেতে লক্ষ্য করলাম টিকেট নয়, পর্যটকরা নিরাপত্তাকর্মীদের তল্লাশির পর সরাসরি মিউজিয়মের ভিতরেই প্রবেশ করছেন। লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেলো, টিকেট সংগ্রহ করতে হবে না। কারণ প্রতি মাসের প্রথম রোববার লুভ মিউজিয়াম দর্শনার্থী পর্যটকদের জন্য বিনামূল্যে দর্শনের সুযোগ করে দেয়া হয়। এ কারণে আমাদেরকেও টিকেট কাটতে হয়নি। ল্যুভ মিউজিয়ামে প্রবেশ করতে হলে জনপ্রতি ১২ ইউরো ব্যয় করে টিকেট সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু আমাদেরকে সেই টিকেট ক্রয় করতে হয়নি। আমরা আরেকটু কাছাকাছি যেতেই দেখা হয়ে জলবায়ু সম্মেলন কাভার করতে যাওয়া বাংলাদেশী সাংবাদিক সিদ্দিক আবু’র সাথে। তিনি মিউজিয়াম ঘুরে বের হয়ে আসছেন।
আমরা যখন মিউজিযামের ভিতরে ঢুকি তখন একেবারেই পড়ন্ত বিকেল। মিউজিয়াম বন্ধ হতে আর বেশিক্ষণ বাকি নেই। সঙ্গত কারণে আমরা অন্যসব কিছু দেখা বাদ দিয়ে দ্রুত ‘মোনালিসা’র চিত্রকর্ম দেখতে মোনালিসা’র গ্যালারির দিকে হাঁটতে থাকলাম। লক্ষ্য করলাম, শুধু আমরা নয়, শত শত পর্যটক একই পথে হাঁটছেন দ্রুত পায়ে। সবার গন্তব্য ‘মোনালিসা’। নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেখা গেল শুধু নারী-পুরুষের দীর্ঘ জটলা। দেয়ালে সাঁটানো চমৎকার ফ্রেমে গ্লাসবন্দি বিখ্যাত শিল্পী লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘মোনালিসা’র পোট্রেট। সেই চিত্রকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে পর্যটকদের ক্যামেরায় শুধুই ক্লিক ক্লিক শব্দ…। সঙ্গে হালের সেলফি তোলার হিড়িক। মানুষে মানুষে কিলবিল করছে পুরো গ্যালরি, তবুও সেই ভিড়ে কিছু সময় দাঁড়িয়ে দুই নয়ন ভরে মোনালিসা’কে দেখার অদম্য বাসনা পর্যটকদের। আমরাও ক্যামেরা চালালাম দ্রুত বেগে।
মোনালিসা দর্শন শেষে বের হয়ে আসার পথেই একটি কক্ষে মোনালিসা’র চিত্রকর্ম সম্বলিত নানার রকমের স্যুভেনি’র বিক্রি হচ্ছে। সেখান থেকে স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে কেউবা কিনছেন মগ, কেউ চাবির রিং, কেউ স্কেল, কিংবা পেন্সিল, কেউ কলম, কেউবা কিনছেন টি-শার্ট, অথবা অন্য কোন কিছু। এক মোনালিসাকে নিয়েই প্রতিদিন শত হাজার ইউরো-ডলারের স্যুভেনি’র বিক্রি হচ্ছে ল্যুভ মিউজিয়ামের ভিতরেই।
মোনালিসা দর্শন হতে না হতেই সময় চলে যাচ্ছিল দ্রুত। মিউজিয়াম বন্ধ হওয়ার ঘোষনাও যেন বাজতে শুরু করে। আমরা দ্রুত পায়ে বাহির পথে হাঁটতে হাঁটতেই চোখের সামনে যেসব শিল্পকর্ম পড়ছিল সেগুলো এক নজর পরখ করে দেখার চেষ্টা করছিলাম। একই সঙ্গে ক্যামেরার ক্লিকবাজিও চলছিল সমানে। মিউজিয়ামের দেয়ালে দেয়ালে টানানো নানান দৃষ্টি নন্দন পৃথিবী বিখ্যাত সব শিল্পীদের শিল্পকর্ম, বিখ্যাতদের আবক্ষ মূর্তী, ভাস্কর্য, নানা প্রতœতত্ত্ব সম্পদ দেখতে দেখতেই আর সবশেষে কনফুসিয়াস দর্শন করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম ল্যুভ মিউজিয়াম থেকে। কিন্তু মন ভরে দেখা হয়নি। ভালো করে জানাও হয়নি বিখ্যাত সব শিল্পকর্ম সম্পর্কে। শুধু এটুকুই বুঝতে পেরেছি যে, ল্যুভ মিউজিয়ামের মত পৃথিবী বিখ্যাত একটি মিউজিয়াম মাত্র কয়েকঘণ্টা তো দূরে থাক, এক-দুই দিন বা সপ্তাহে ভালো করে দর্শন সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন বিস্তর সময়। তাহলেই মন ভরে দেখা, বুঝা এবং জানা সম্ভব মিউজিয়ামে রক্ষিত শিল্পকর্ম সম্পর্কে। তবে মন্দের ভালো যে, ছোটবেলা থেকে যে মোনালিসা’র সম্পর্কে শুনে আসছিলাম, সেই শিল্পকর্মটি দেখতে পেরেছি অতি কাছ থেকে। সুযোগ হলে আমি বার বার যাওয়ার চেষ্টা করবো শিল্পের শহর প্যারিসে… ল্যুভ মিউজিয়ামে…।

 ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com