প্যারিস থেকে জুরিখ…পর্ব-দুই

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

ইউরোপের বৃষ্টি আর প্রেমিকার মন একই…

ঢাকা থেকে দুবাই। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার জার্নি। দুবাইয়ে ছয় ঘণ্টারও বেশি ট্রানজিট সময় পার করে প্যারিসের পথে আরো প্রায় ছয় সাত ঘণ্টার জার্নি। সঙ্গত কারণেই জেট ল্যাগ কাটেনি। তাই ক্যাফে দো লুনা’য় প্রথম রাতের আড্ডা যখন শেষ হল তখন রাত অনেক গড়িয়েছে। চোখে ঘুমের কোন লক্ষণ নেই। ক্লান্তিও উবে গেছে। আড্ডার টেবিল ছেড়ে যখন অস্থায়ী ডেরার দিকে ফিরছি, বাংলাদেশে তখন ভোরের সূর্য উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছিল পূর্ব গগণে। ঘুম উধাও হয়ে যাওয়া দু’চোখের পাতা অনেকটা জোর করে বন্ধ রেখে শুয়ে পড়লাম। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতেই কেটে গেল কয়েক ঘণ্টা।

আইফেল টাওয়ারের আশেপাশে এমনি অনেক ভাস্কর্য আছে

ঘড়ির কাঁটায় স্থানীয় সময় সকাল ন’টা। বিছানা ছেড়ে দ্রুত তৈরি হলাম আমি আর তৌফিক মারুফ। কিন্তু রুম থেকে বের হয়ে কোথায় সূর্যের দেখা পাবো, তা না মিলে দেখা মিললো চাঁদ মামার। বাইরে কনকনে শীত। বইছে ঠান্ডা বাতাস। ওভারকোটও যেন ঠান্ডার তীব্রতাকে সামাল দিতে পারছে না। এই শীতের মধ্যে লোকজন ব্যস্ত যার যার মত। তবে কোথাও জটলা নেই।

জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নিতে আমরা লা বুর্জ’র এর পথে রওয়ানা হলাম। দুই দফা মেট্রো বদল করে আরেকবার বাসে উঠলেই চলে যাওয়া যায় সম্মেলন কেন্দ্রে। সাত সকালে বের হয়ে আমরা মৌলী রোজ এর পাশের অ্যানভার্স স্টেশন থেকে মেট্রোতে চড়লাম। তবে আমাদেরকে কোন টিকেট কাটতে হয়নি। কিংবা ইউরোও গুনতে হয়নি। কারণ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিদেশী অতিথিদের জন্য একটি কার্ড দেয়া হয়েছিল। যাতে শহরের ম্যাপও যুক্ত ছিল। যা প্রথম দিনেই আমরা সংগ্রহ করেছিলাম। তবে মজার তথ্য হচ্ছে, প্যারিস শহরেও বিনা পয়সায় ট্রেন বা মেট্রো চড়ার লোকের অভাব নেই। প্রথম চার-পাঁচ দিন প্যারিস শহরের সমস্ত মেট্রো স্টেশনের গেইট ওপেন করে দেয়া হয়েছিল বিদেশী অতিথিদের জন্য। সেই সুযোগটিই নিয়েছেন প্যরিসে অবস্থানকারী বিভিন্ন দেশের অবৈধ অভিবাসীরা। যারা বিনা পয়সায় ওই কয়েকদিন দিব্যি মেট্রোতে চড়েছেন।
প্যারিস শহরে এক খন্ড বাংলাদেশ হচ্ছে গার্দে নর্দ। এটি প্যারিসের অন্যতম রেল স্টেশন। এখান থেকেই প্যারিস শহরের

আইফেল টাওয়ারের আশেপাশে এমনি অনেক ভাস্কর্য আছে

একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়া যায় দ্রুততম সময়ে। তেমনি ইউরোপের অনকে দেশেই ছুটে যাওয়া দ্রুত গতির ট্রেনে চড়ে। গার্দে নর্দ স্টেশন থেকে বের হয়ে শহরে পা রাখলেই দেখা মিলবে অসংখ্য বাংলাদেশীর। জীবীকার সন্ধানে যারা এখন দিনরাত শ্রম বিক্রি করেন প্যারিস শহরে। মিলবে বাংলাদেশীদের পরিচালনায় অসংখ্য হোটেল রেস্তোরাঁর। তাদের আতিথেয়তা আপনাকে মুগ্ধ করবে।
তবে গার্দ নর্দ সাবওয়ে থেকে শহরে উঠতেই সিঁড়ির মুখে দেখা মিলবে ভিনদেশীদের। এদের বেশির ভাগই আফ্রিকান অথবা ইউরোপের অন্য কোন দেশের। যারা আশ্রয় নিয়েছে প্যারিস শহরে। আপনার হাতে যদি সিগারেট থাকে তাহলে নিশ্চিত ওই ভিন দেশীরা আপনার পিছু নেবে এক শলকা সিগারেটের জন্য। যদি আপনি দয়াপ্রবণ হয়ে সিগারেট দেন তাহলেই মরেছেন। পিছু নেবে আরো অনেকজন। তখন আপনার হাতের সিগারেটের প্যাকেট নিমিষেই শূণ্য হয়ে যাবে। তাই সাবধান…।
সম্মেলন কেন্দ্র থেকে বের হয়েই যোগাযোগ করেছিলাম শিমুলের সঙ্গে। সম্পর্কে সে ভাতিজা। ফোন পেয়েই সে দ্রুত গার্দে নর্দ এসে অপেক্ষা করছিল। রক্তের কোন সম্পর্ক নয়। কিন্তু তার আতিথেয়তা ছিল তার চেয়েও ঢের বেশি। আমার ঢাকার বন্ধু-বড় ভাই এক সময়ের সাংবাদিক ওয়ালিদ শিকদার রবিন ভাইয়ের ভাতিজা। সেই সূত্রে শিমুল আমাকেও কাকা বলে ডাকে। সে মাস কয়েক হলো প্যারিস গিয়েছে। তখনও তার বৈধতা নিশ্চিত হয়নি। তবে চেষ্টা করে যাচ্ছিল। শিমুলের সঙ্গে দেখা হতেই সে নিয়ে গেল আরো কয়েকজনের কাছে।

আইফেল টাওয়ারের আশেপাশে এমনি অনেক ভাস্কর্য আছে

সবাই গার্দে নর্দের একটি বাসায় থাকে। সেখান থেকে আমরা গল্প করতে করতে চলে গেলাম ফ্রান্সের গণতন্ত্রের প্রতীক ভাস্কর্য ‘রিপাবলিক’ চত্বরে। মোমবাতির আলো আর ফুলে ফুলে সয়লাব রিপাবলিক-এর গোল চত্বর। ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর রিপাবলিক চত্বরের পাশেই বাতাক্ল ডান্স ক্লাবে সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। ওই হামলার ঘটনায় বেশ কয়েকজন নিহত হন। তাদের স্মরণেই রিপাবলিক চত্বরে শত শত নারী-পুরুষ, শিশু দল বেঁধে কিংবা একা একা ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। কেউবা মোমবাতি জ্বালিয়ে স্মরণ করছে নিহতদের। কেউ প্রার্থনারত। সবার চোখে জল টলটল করছে। অনেক রাত পর্যন্ত সেখানে সময় কাটিয়ে শিমুলের বন্ধুদের সঙ্গে তাদের বাসায় বাকী রাত আড্ডা, নানা গল্প। নিজেদের সুখ-দুঃখের গল্প। প্যারিসে বাঙালিদের ভালো থাকা-না থাকার গল্প। সঙ্গে গরুর মাংস আর পানীয়।
২০১৩ সালের ডিসেম্বরে প্রথম গিয়েছিলাম শিল্পের শহর প্যারিস। কিন্তু বৃষ্টি সেবার কঠিনভাবে বাগড়া দিয়েছিল ক্ষণিকের প্যারিস ভ্রমণে। সেবার আমার এলাকা মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার বাসন্দিা কয়েছ মিয়া সব কাজ ফেলে আমাকে সঙ্গ দিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের স্বল্পতা আর বৃষ্টির জন্য খুব একটা ঘুরে দেখতে পারিনি। এমনকি প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারের নিচে গিয়েও বৃষ্টি আর দর্শনার্থীর দীর্ঘ লাইনের কারণে টাওয়ার চূড়ায় পর্যন্ত উঠতে পারিনি। মনে একটা আক্ষেপ থেকে গিয়েছিল প্যারিস ঘুরে দেখতে না পারার।

রিপাবলিক চত্বরন এভাবেই শ্রদ্ধা জানান দেশী-বিদেশিরা

এবার সেই আক্ষেপ ঘুচাতে একদিন পেশাগত কাজ দ্রুত শেষ করে বেরিয়ে পড়লাম আইফেল টাওয়ার দর্শনে। এবারও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ছিল। এই বৃষ্টির মধ্যে ২০১৩ সালে একবার বার্লিনে ঘুরতে গিয়ে দেখা হয়েছিল নির্বাসিত কবি ও সাহিত্যিক দাউদ হায়দারের সঙ্গ। আমার অতিপ্রিয় একজন মানুষ। বার্লিনে গিয়েছি আর তার সঙ্গে দেখা না করে ফিরবো সেটা কল্পনাও করতে পারিনি। তাই জার্মান প্রবাসী সাংবাদিক স্নেহভাজন মারুফ মল্লিকের কাছ থেকে দাউদ হায়দারের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে যোগযোগ করি প্রিয় কবি’র সঙ্গ। সেদিন বার্লিনেও বৃষ্টি খেলা করছিল। অনেকটা আমাদের শ্রাবণের বৃষ্টির মত। এই আসে-এই যায়। দেখা হতেই বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে দাউদ হায়দার বলছিলেন, ইউরোপের বৃষ্টি আর প্রেমিকার মন এর মধ্যে কোন তফাৎ নেই। এই দুই কখন যে অভিমান করে বুঝে ওঠা অসম্ভব। ইউরোপের বৃষ্টি এই আসে এই যায়।
যাক, দর্শনার্থীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে টিকেট সংগ্রহের পর দ্বিতীয় দফায় আরেকবার লাইনে দাঁড়ানো লিফটের অপেক্ষায়। অত:পর বিশাল এক লিফটে চড়ে আমরা উঠে গেলাম আইফেল টাওয়ারের চূড়ায়। হিমেল বাতাসের মধ্যেই আমরা মন ভরে দেখছিলাম পুরো প্যারিস শহরকে। অন্যরকম এক দৃশ্য। চোখ ধাঁধিয়ে যায়। আলোর ঝলকানিতে রঙিন এক শহর। উপর থেকে ক্যামেরা বন্দি করলাম শিল্প-সাহিত্য আর সংস্কৃতির সেই শহরের অপূর্ব সব দৃশ্য।
আইফেল টাওয়ারের একেবারে চূড়ায় এক হাজার ৫০ ফুট উপরের একটি কক্ষে সংরক্ষণ করা হয়েছে এই টাওয়ারের নির্মাতা গুস্তাভো ইফেলের প্রতিকৃতি।
সন্ধ্যার আগে যখন আইফেল টাওয়ারের নিচে ও পাশের সেন নদীর তীর ধরে ঘুরছিলাম তখনও নানান ভাস্কর্যে দিকে নজর পড়তেই চোখ আটকে গিয়েছিল। শিল্পীর সুনিপূণ কারুকার্যে গড়ে তোলা হয়েছে এসব ভাস্কর্য। নানান অর্থ বহন করা এসব ভাস্কর্য না দেখলে অনেক কিছুই হয়তো অজানা থেকে যেত।
আইফেল টাওয়ার দর্শন শেষে প্যারিস গেইট হয়ে ধীরে ধীরে আমরা ফিরে এলাম প্লাস দো ক্লিসি’তে। আমাদের ডেরায়।

(চলবে)

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com