প্যারিস থেকে জুরিখ…পর্ব-ছয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

রোম শহর : পিক পকেট সাবধান…

২০১৩ সাল। নভেম্বর মাস। কঠিন ঠান্ডা তার সঙ্গে বৃষ্টি। এই দুইকে সঙ্গী করে প্যারিস থেকে রাতের ট্রেনে রওয়ানা হয়েছি ইতালির রোম শহরের উদ্দেশ্যে। স্থানীয় সময় রাত ১০টায় গার্দ দে নর্দ থেকে ট্রেন ছেড়েছে। দুই দেশের সময়ের ব্যবধানের কারণে পরদিন স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে পৌঁছার কথা রোম রেল স্টেশনে। ট্রেনে উঠে দেখলাম সে কি এলাহী কান্ড। প্যারিস থেকে বহু লোক রোমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন ট্রেনে। ইউরোপে ট্রেন জার্নি বেশ মজার এবং আরামদায়ক। কোন ঝক্কি ঝামেলা নেই। নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করা যায়। শুধু প্রয়োজনী কাগজপত্র অর্থাৎ পাসপোর্ট আর টিকেট সঙ্গে থাকলেই হল। ট্রেনের টিকেট কেটেছিলাম যাত্রার দিন সকাল বেলা। যার ফলে ৫০ কিংবা ৬০ ইউরো দিয়ে যে টিকেট পাওয়ার কথা সেটি কিনতে হয়েছিল ১১০ ইউরো দিয়ে। অর্থাৎ দিগুণ দামে। না, কালোবাজারি থেকে নয়। একেবারে কাউন্টার থেকে। ইউরোপে ট্রেন কিংবা বাস যে মাধ্যমেই যাত্রা করেন না কেন- টিকেট আগে কাটলে দাম অনেক কম পড়ে। আর যাত্রার আগ মুহুর্তে কাটলে সেটি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অনেকটা বিমানের টিকেটের মতই। ইউরোপে বিমান টিকেটও সস্তা। যদি আগে কেটে রাখা যায়।

ট্রেনের সময়ের বেশ আগেই আবদুল কাদের ভাইয়ের বাসা থেকে রওয়ানা হয়েছিলাম। সঙ্গে কয়েস মিয়া। কাদের ভাই নিজেই ড্রাইভ করছিলেন তার ট্যাক্সি। কিন্তু বিধিবাম, রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম! কাদের ভাই বার বার ঘড়ি দেখছেন আর আল্লহকে ডাকছেন। যদি কোন কারণে সময়মত পৌঁছা না যায় তাহলে ট্রেন মিস। শুধু মিস না, রোম থেকে আমার ঢাকা ফেরার ফ্লাইট একদিন পড়েই। সঙ্গত কারণেই টেনশন কাজ করছিল তারমধ্যে। তার আর কয়েস মিয়ার অস্থিরতা দেখে আমার বার বার মনে পড়ছিল, ঢাকা থেকে ট্রেনে করে সিলেট যাওয়ার উদ্দ্যেশে লালমাটিয়ার বাসা থেকে বের হয়ে কতদিন জ্যামে পড়ে এই আমি চরম অস্থির হয়ে উঠতাম ট্রেন মিসের টেনশনে। কাদের ভাই জ্যাম এড়িয়ে সময়মত রেলস্টেশনে পৌঁছতে নানা অলিগলি দিয়ে গাড়ি চালালেন। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মাত্র মিনিট কয়েক আগে স্টেশনে পৌঁছে লাগেজ নিয়ে অনেকটা দৌড়ের উপর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছলাম। সঙ্গে কয়েস মিয়াও দৌড়ালেন। যেহেতু আমি কিছুই চিনি না, সে কারণে তিনি যেদিকে নিয়ে গেলেন সেদিকেই গেলাম। প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে দেখি ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। যাত্রীরা সবাই প্রায় উঠে গেছেন। আমার মত যারা শেষ সময়ে দৌড়ে এসেছেন তারা দ্রুত ট্রেনে উঠলেন। আমিও উঠলাম। কয়েস মিয়া ট্রেনে উঠে আমাকে নির্ধারিত কেবিনে ঢুকিয়ে নেমে পড়লেন। তার মিনিট পাঁচেক এর মধ্যেই ট্রেন ছাড়লো গার্দ দে নর্দ। বিদায় জানালাম প্যারিস শহরকে। রাতের ট্রেন জার্নি। তাই ইচ্ছা থাকলেও প্যারিস শহর অতিক্রম করার সময় দুই পাশের কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। প্যারিস থেকে রোম পর্যন্ত প্রায় ৫৭৫ কিলোমিটার দূরত্বের পথ পাড়ি দিতে ইলেকট্টিক ট্রেন চলছে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার বেগে। ট্রেনের যে কেবিনে আমার বসার স্থান হয়েছিল সেটি ছিল তিন টায়ারের কেবিন। বড় কেবিন হওয়ায় দুই পাশ মিলিয়ে ছয় টায়ার।

আমার স্থান হল সবার উপরের টায়ারে। নিচেই ছিলেন এক আফ্রিকান। সুঠাম, দীর্ঘদেহী এই আফ্রিকানের নামটা এখন মনে পড়ছে না। তবে তার হাসিটা বেশ সুন্দর। দাঁতগুলো ছিলো তার চেয়েও সুন্দর। আমার সঙ্গে নানান গল্প জুড়ে দিল। তারও যেমন ইংরেজীতে খুব ভালো দখল নেই, তেমনি আমিও। তবে দু’জনে মোটামুটি চালিয়ে গেলাম। অনেকে কথা হল। সে একজন ব্যবসায়ী। বাংলাদেশ থেকে গেছি শুনে সে খুব উত্তেজিত। তার কথায় বাংলাদেশ অনেক সুন্দর দেশ। সে কখনও আসেনি, তবে বাংলাদেশের গল্প শুনেছে। সময় সুযোগ পেলে সে বাংলাদেশে ঘুরতে আসার আগ্রহ প্রকাশ করলো। রাত একটু গভীর হতেই কেবিনের লাইট অফ করে সবাই ঘুমিয়ে পড়লো। কিন্তু আমার কেন জানি ঘুম আসছে না। ভিতরে ভিতরে একটু ভয় কাজ করছে। চিনি না জানি না, এমন অপরিচিত ভিন দেশী লোকজনের সঙ্গে একটা কেবিনে রাত পার করতে হবে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। রাস্তায় কোন বিপদে পড়লে উদ্ধার পাবার সুযোগ আছে কি না তাও জানি না। এসব ভাবতে ভাবতেই কেটে গেল রাত। দেখলাম ট্রেনের জানালা দিয়ে ভোরের আলো ভেসে আসছে। ভয়, টেনশন কিছুটা দূর হলো। সকাল ৯টার দিকে যখন রোম রেল স্টেশনে পৌঁছি তখন দেখলাম বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। আমার জন্য আগে থেকে অপেক্ষমান মোহায়মেন খান মাসুম। রোম প্রবাসী এই ভদ্রলোকের সঙ্গে আগে থেকে কোন পরিচয় ছিল না। কিন্তু তার আতিথেয়তা-ই রোমের পথে পা বাড়িয়ে ছিলাম আমি। মাসুম হচ্ছেন চট্টগ্রামে লেখাপড়া করা। যে স্কুলে তিনি পড়তেন সেই একই স্কুলের ছাত্রী ছিলেন আমার স্ত্রী মাহফুজা খান কনক। সেই সূত্রেই আমার সঙ্গে পরিচয়। মূলতঃ স্ত্রী-ই মাসুমের সঙ্গে যোগাযোগ করে দিয়েছেন। যাক স্টেশনে নামতেই এগিয়ে আসলেন। ফেসবুকের কল্যাণে আগে থেকেই দুই জনের ছবির সঙ্গে পরিচয় ছিল বিধায় প্রথম সাক্ষাতে চিনতে অসুবিধা হয়নি। স্টেশন থেকে বের হয়ে প্রথমে একটা মেট্রোতে উঠে পড়লাম আমরা। মিনিট কয়েক পরে মেট্রো থেকে নেমে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বের হয়ে সড়কে উঠলাম। এরপর পরই মাসুমের বাসায়। একটু বিশ্রাম নিয়ে ও সকালের নাস্তা শেষে বেড়িয়ে পড়লাম রোম শহর দেখতে। ঠিক রোম শহর দেখতে নয়, নির্দিষ্ট দু’একটি স্থান এবং ভ্যাটিকান সিটি দেখার জন্য। কারণ বিশাল রোম শহর ঘুরে দেখতে এবং এই শহরের নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে হলে হাতে প্রচুর সময় থাকতে হবে। কিন্তু আমার হাতে একেবারেই সেই সময় নেই। তাই টার্গেটকৃত দু’টি স্পটে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাসা থেকে বের হয়েই আমরা চলে গেলাম মাসুমের বোনের ফোন, ফ্যাক্স ও মানিএকচেঞ্জের শপ্ এ। সেখানে অনেকের সাথে পরিচয় হল। যাদের কেউ কেউ রোমে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। দোকানের পাশেই একটি কফি বার। মাসুম নিয়ে গেলেন সেখানে। মাসুম ও আমিসহ আমরা চার-পাঁচ জন আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে কফির পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছি, তখনই গাড়ির হর্ণ বাজার বিকট শব্ধ! আমরা দ্রুত বের হয়ে দেখলাম এক লোক তার গাড়ি পার্কিং এলাকা থেকে বের করতে পারছে না। কারণ পিছনে আরেকটি গাড়ি রাখা। সেই গাড়ির চালককে খুঁজে না পেয়েই তিনি হর্ণ বাজাচ্ছেন। হর্ণ এর এই প্রসঙ্গটি সঙ্গত কারণেই চলে আসল। দুই দফায় ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ঘুরে দেখার সময় একটা বিষয় ভীষণভাবে নজরে এসেছে। রাস্তায় শত শত গাড়ি থাকলেও বিনা প্রয়োজনে কেউই হর্ণ বাজাচ্ছে না। অথচ আমাদের দেশে রাস্তায় বের হলেই গাড়ির হর্ণ এর শব্দে কানের পর্দা হাঁসফাঁস করতে শুরু করে। এই এক শব্দ দূষণেই জীবন তেনা তেনা হয়ে যায়।

রোম শহরে পা রাখার পর থেকে যে কয় ঘণ্টা ওই শহরে ছিলাম বৃষ্টি সঙ্গী হয়েছিল। সেই বৃষ্টি আর তীব্র শীতকে সঙ্গী করে চেষ্টা করলাম কাংখিত দুটো জায়গা ঘুরে দেখার। মাসুম, আমি ও মাসুমের রুমমেট শিখন আহমেদ চলে গেলাম ভ্যাটিকান সিটিতে। এটি পোপের রাজ্য। ইতালীর রোম শহরের ভিতরে আরেক ছোট রাজ্য। মেট্রোতে করে ভ্যাটিকান সিটিতে যাওয়ার পথেই মাসুম বললেন, ভাই পিক পকেট সাবধান! তাহলে এই রোম শহরেও পকেটমাররা তৎপর। আমি তো ভেবেছিলাম শুধু ঢাকা শহরেই বোধ হয় এদের তৎপরতা সীমাবদ্ধ। মাসুম জানালেন, রোম শহরে যারা নানা অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িত তাদের বেশিরভাগই পাশের রাষ্ট্র রোমানিয়া থেকে আসা। এর বাইরে আফ্রিকান বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসীরাও আছে। তিনি এমন তথ্যও দিলেন যে, এখানে পকেট কাটা পড়লে কোন বিচারও পাওয়া যাবে না। ভ্যাটিকান সিটি মেট্রো স্টেশনে নেমে দেখা মিললো একাধিক বাংলাদেশীর। যাদের বেশিরভাগের বাড়ি ঢাকার নবাবগঞ্জ, দোহার, ধামরাই কিংবা কুমিল্লার চান্দিনা, বড়–রা উপজেলায়। এদের কেউ কেউ ফুটপাতে ছাতা বিক্রি করছেন, কিংবা খেলনা জাতীয় বিভিন্ন সামগ্রি! এদের অনেকেই দেশে জমিজমা বিক্রি করে ভাগ্য বদলের জন্য পাড়ি জমিয়েছিলেন স্বপ্নের রোম শহরে। কিন্তু ভাগ্য তাদের সাথে প্রতারণাই করেছে। বাঙালীদের এমন করুণ দশা দেখে এবং কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে আমরা দ্রুত পায়ে দ্রুত পায়ে ছুটে গেলাম ভ্যাটিকান সিটির দিকে। সেখানে যেতেই দেখলাম হাজার হাজার ধর্মভীরু মানুষ প্রার্থনারত। কিছুক্ষণ ঘুরে দেখার পাশাপাশি ভ্যাটিকান সিটির নানা দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করার চেষ্টা করলাম। এরপর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই আমরা হাঁটা শুরু করলাম ঐতিহাসিক ‘ক্লোসিও’র দিকে। ভ্যাটিকান সিটি থেকে পায়ে হাঁটা প্রায় ১৫-২০ মিনিটের পথ। ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতেই আমরা পৌঁছে গেলাম ক্লোসিও’তে। বৃষ্টির কারণে ভালো করে ঘুরে দেখার সুযোগটা মাটি হয়ে গেল। বৃষ্টির মধ্যেই ভ্যাটিকান সিটি আর ক্লোসিও ঘুরে দেখে আমরা বাসায় ফিরলাম। কিন্তু ভালো করে ঘুরে দেখার স্বাদ অপূর্ণ রেখেই কয়েক ঘণ্টার ঝটিকা সফর শেষে বিদায় জানাতে হল থেকে রোম শহরকে।(চলবে)

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com