প্যারিস থেকে জুরিখ…পর্ব-এক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

রাত গভীর হয়, আড্ডা যেন শেষ হয় না

২০১৫ সাল। ডিসেম্বর মাস। গিয়েছিলাম ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। উপলক্ষ সেই জলবায়ু সম্মেলন। কিন্তু সম্মেলনে গিয়ে জীবন সফে দিলে তো আর হবে না। কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে ঘুরাঘুরিটাও করতে হয়। ঢাকা থেকে প্ল্যান করে গেলেও সত্যি কথা বলতে কাজ বাদ দিয়ে সেই ঘুরে বেড়ানোটা মনের মত হয় না। তারপরও সময় সুযোগ করে এদিক ওদিক ছুটে বেড়াই। কখনও আইফেল টাওয়ার, কখনও বা বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম,যেখানে দেয়ালের গায়ে সেঁটে আছেন বিখ্যাত শিল্পী লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির শ্রেষ্ট আবিস্কার মোনালিসা। আবার কখনও ছুটে চলা প্যারিস ছেড়ে দূরের বেলজিয়াম, কিংবা সাদা বরফের শহর জুরিক। ঘুরে বেড়াই আল্পস পর্বতের সাদা বরফের মধ্যে।

প্যারিস সম্মেলনে দেখা মিলেছিল এই সাদা পরীদের

প্যারিস সম্মেলন কাভার করতে ঢাকা থেকে গিয়েছিলেন অনেকেই। কারণ সবার দৃষ্টি ছিল প্যারিস সম্মেলনের দিকে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ১৫৭ টি রাষ্ট্রের চোখ ছিল প্যারিসের দিকে। কানকুন সম্মেলনের সূত্র ধরে এখান থেকে চূড়ান্ত একটা সিদ্ধান্ত আসবে। তাই সবার মনযোগ ছিল প্যারিসের দিকেই। এ কারণে প্যারিসে সম্মেলনে আগতদের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। এমনিতেই প্যারিসে বছর জুড়েই পর্যটকদের উপস্থিতি থাকে। তার উপর এই সম্মেলনের কারণে পর্যটকের সংখ্যা ওই সময়টায় বেড়ে গিয়েছিল কয়েকগুণ।ঢাকা থেকে ২৯ নভেম্বর রাতে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের বিমান যোগে রওয়ানা হয়েছিলাম। মধ্যে দুবাইয়ে যাত্রা বিরতি দিয়ে ৩০ ডিসেম্বর দুপুরের দিকে গিয়ে পৌঁছলাম প্যারিস। আমরা এক সঙ্গে ছিলাম চার-পাঁচ জন। আমি, তৌফিক মারুফ, আশরাফ আলী, মাসউদুল হক, ইফতেখার মাহমুদ সহ আরো কয়েকজন। প্যারিসে নেমেই টের পেলাম শীতের তীব্রতা। হাড় কাঁপানো শীত যাকে বলে। ইমিগ্রেশন শেষ করে বেল্ট থেকে লাগেজ নিয়ে দ্রুত শীত বস্ত্র বরে করলাম। বিশেষ করে ওভারকোট গায়ে দিয়ে শীতকে আপাতত দূরে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলাম। এরই মধ্যে লক্ষ্য করলাম বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অনেক সাংবাদিক ও বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে জড়িত লোকজনদের বিমানবন্দর থেকে রিসিভ করতে প্যারিসে থাকা বাঙালিরা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছেন। এদের মধ্যেই একজন স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা আতিকুর রহমান আমাদের সঙ্গে থাকা আশরাফ আলীকে রিসিভ করলেন। ইফতেখার চলে গেলেন নিজেদের মত করে। আর আমি ও তৌফিক মারুফ অপক্ষো করছি আমাদেরকে যিনি রিসিভ করবেন বা যার আতিথেয়তা আমরা গ্রহণ করবো সেই লোকের জন্য।
কিন্তু ফোন দিয়ে যোগাযোগ করার পর তিনি একটা স্থানের নাম বলে বললেন, আপনারা মেট্রোতে করে অমুখ স্টেশনে চলে আসুন। কিন্তু আমরা বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। তখন আতিক ভাই বললেন,আমার সঙ্গে চলেন আমি আপনাদের লোক যে স্টেশনে আছে সেখানে পৌঁছে দেই। অগত্যা কি আর করা সওয়ার হলাম আতিক ভাইয়ের সঙ্গইে।
গাড়িতে উঠেই আতিক ভাই নানা গল্প শোনালেন। বিমানবন্দর ছেড়ে গন্তব্যে যাবার পথে দেখালেন, বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের ভেন্যু লা বুর্জ। বললেন, আপানার যেখানে থাকবেন সেখান থেকে এই লা বুর্জে আসতে খুব একটা সময় লাগবে না। শুধু একাধিকবার মেট্রো পরিবর্তন করতে হবে। এসব গল্পের ফাঁকে ফাঁকে তিনিসহ বাঙালিরা প্যারিসে কি অবস্থায় আছে তারও একটা বর্ণনা দিলেন। বললেন, যারা ব্যবসা বাণিজ্য করছেন তারা ভালই আছেন। অন্যদের অবস্থাও খারাপ না। তবে ব্যবসা বাণিজ্যে যারা ভাল করেছে তারা প্যারিস শহরে দাঁড়িয়ে গেছেন। কমিউিনিটির মধ্যে তাদের একটা প্রভাব প্রতিপত্তিও তৈরি হয়েছে।

প্লাস দো ক্লিসিওর ঝক্ ঝক্ এ সড়ক

একদিকে চালকের আসনে বসা আতিক ভাই নানা বিষয়ে গল্প করছেন, অন্যদিকে গাড়ি ছুটে চলছে দ্রুত গতিতে। এরই মধ্যে একটা স্থানে এসে গাড়ি থামিয়ে আতিক ভাই বললেন, আপনাদের লোকজন এখানেই আসবে। এ কথা বলেই আতিক ভাই তাকে ফোন দিলেন। ওপ্রান্ত থকেে আমাদের স্থানীয় গাইড
ওয়াহিদ বললেন, ভাই মিনিট পাঁচেকর মধ্যেই আমি চলে আসবো। একটু অপেক্ষা করুন। আমি আর তৌফিক মারুফ গাড়ি থেকে নামতেই আমাদের তীব্রভাবে চেপে ধরলো ঠান্ডা। সঙ্গে হিমেল বাতাস। ঠান্ডার কারণে রাস্তায় লোকজন তেমন নেই। আমরা গা গরম করার জন্য একটু ধূমপানের চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঠান্ডা থেকে রক্ষা পাচ্ছি না।
সিগারেটের ধোাঁয়া শেষ হতে না হতেই সামনে হাজির হলেন নুরুল ওয়াহিদ। আমাকে দেখেই চিনে ফেললেন। বললেন, আরে বিপুল ভাই আপনি আসবেন সেটা তো জানতাম না। গতকালই জেনেছি আপনার কথা। নুরুল ওয়াহেদ হচ্ছে আমাদের এলাকার মানুষ। বাড়ি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায়। মফস্বলে সাংবাদিকতা করার কারণে পূর্ব থেকেই তার সঙ্গে পরিচয়। আমরা কুশল বিনিময় শেষে গাড়ি থেকে লাগেজ নামিয়ে আতিক ভাই ও আশরাফ ভাইকে বিদায় দিলাম। আমরা নেমে পড়লাম আন্ডারগ্রাউন্ডে একটি রেল স্টেশনে। মেট্রো ধরে চলে গেলাম আমাদের গন্তব্য প্লাস দো ক্লিসি’তে। এখানেই ক্যাফে লুনা’র দ্বিতীয় তলায় একটি গেষ্টা রুমে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন নুরুল ওয়াহেদ। ঢাকা থেকে রওয়ানা হওয়ার আগেই তার সঙ্গে কথা বলে প্যারিসে অবস্থানকালীন সময়ে তার সাথে যোগাযোগ করে থাকার এই আয়োজন করেন তৌফিক মারুফ। ক্যাফে লুনা হচ্ছে প্যারিসে দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে বসবাসরত স্থানীয় ব্যবসায়ী বাংলাদেশী নাগরিক এনায়েত উল¬াহ ইনু’র। তিনি ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ অর্গানাইজেশনের সভাপতি এবং অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ এ্েসাসিয়েশনের মহাসচিব।
ইনু ভাই ঢাকার বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ীর বাসিন্ধা। ক্যাফে লুনা’র অবস্থান চমৎকার একটি স্থানে। প¬াস দো ক্লিসি চৌরাস্তার একেবারে মোড়ে। আমরা রুমে উঠে জানতে পারলাম সেখানে আরও দুই জন সাংবাদিক উঠেছেন। একজন ইতিমধ্যে উঠেছেন। তার নাম ইমরুল কায়েস, কাজ করেন বাংলা ভিশনে। তার সঙ্গে একদিন পরই যুক্ত হবেন একই টেলিভিশন চ্যানেলের তার সহকর্মী জিয়াউল হক সবুজ।

মৌলিন রোজ

দুই কক্ষের ওই গেস্ট রুমরে একটি কক্ষে তারা দুই জন আর অপরটিতে আমি ও তৌফিক মারুফ। ১ ডিসেম্বর যেহেতু সম্মেলনে উদ্বোধন হবে সে কারণে রেজিষ্ট্রেশন করার লক্ষ্যে আমরা হোটেল রুমে লাগেজ রেখে দ্রুতই বেরিয়ে পড়লাম সম্মেলন কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে। সঙ্গী নুরুল ওয়াহেদ। তিনি প্যারিস থেকে কাজ করেন ঢাকার বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল একাত্তর টিভিতে। একসঙ্গে তিনজন মিলে রওয়ানা হলাম লা বুর্জের উদ্দেশ্যে। প্লাস দো ক্লিসি’র কাছেই একটি স্টেশন থেকে আমরা মেট্রোতে চড়লাম। পথিমধ্যে একটি স্টেশনে নামতে হলো। সেখানে নুরুল ওয়াহেদের বাসা। তিনি আমাদেরকে স্টেশনে রেখে বাসায় গেলেন তার প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র নিয়ে আসার জন্য। আমাদেরকে যে স্টেশনে রেখে গিয়েছিলেন সেই স্টেশনের পাশেই ফ্রান্সের ন্যাশনাল স্টেডিয়াম স্টেড দ্যা ফ্রান্স এ সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল আমরা প্যারিস যাবার দিন পনেরো আগে। ফ্রান্স ওজার্মানীর মধ্যে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ চলার সময় এই হামলা হয়। হতাহতের ঘটনাও ঘটেছিল। যা খুবই দুঃখজনক ও মর্মান্তকি। আধাঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষার পর নুরুল আসার পর আমরা আবারো মেট্রোতে করে রওয়ানা হলাম লা বুর্জ’র পথে।
লা-শাফিল স্টেশনে গিয়ে আমরা নেমে দ্রুত গততিে হাঁটতে শুরু করলাম। প্রায় এক দেড় কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড রাস্তা আমরা তীব্র বেগে হাঁটছি। শুধু আমরাই নয়, অন্য যারা লা শাফিল স্টেশন থেকে বের হয়েছে বা যারা লা-শাফিলে যাবে তারা প্রত্যেকেই তুমুল বেগে হাঁটছেন। প্রায় মিনিট দশেক হাঁটার পর আবিস্কার করলাম আমরা আরেকটি বৃহৎ রেল স্টেশনে পৌঁছেছি। এটির নাম গার্দো নর্দ। এখান থেকেই পৃথক একটি ট্রেনে করে আমরা যাব লা বুর্জ। এই সময়েই প্রথম দিনের ব্যস্ত প্যারিস শহরের আন্ডারগ্রাউন্ড সড়কে দেখা পেলাম ভিক্ষুকের। শুধু যে আমাদের দেশেই ভিক্ষুক আছে তা কিন্তু নয়। বুঝা গেল উন্নত বিশ্বের বড় শহরগুলোতেও ভিক্ষুক থাকে রাস্তা ঘাটে নানা বেশভুশ এ। একবার অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় গিয়ে দেখেছিলাম, সেখানকার ভিক্ষুকরা রাস্তায় বেহালা কিংবা গিটার বাজিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিটা করছেন একটু ভিন্ন কৌশলে।

ক্যাফে দো লুনা। এখানেই আড্ডা চলতো রাতভর।

মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই মেট্রোতে করে দ্রুততম সময়ে আমরা পৌঁছে গেলাম লা বুর্জ স্টেশনে। সেখান থেকে বাসে করে মূল ভেন্যুতে। রেজিস্ট্রেশন শেষে সন্ধ্যার পর আবারো ফিরে আসলাম আমাদের অস্থায়ী ডেরায়। কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে রাতে ঠান্ডার মধ্যেই বের হলাম। ক্যাফে লুনা’য় বসে তখন আড্ডা দিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার এনায়েত উল¬াহ ইনু ভাই, নূরুল ওয়াহেদ, ইমরুল কায়েসহ আরও কয়েকজন। আমি আর তৌফিক মারুফ পরিচিত হলাম ইনু ভাইয়ের সাথে। দারুণ এক আড্ডাবাজ মানুষ। খাবারের অর্ডার করার সাথে সাথে পানীয় কার কি পছন্দ সেই অর্ডারও দিলেন। খাবারের সঙ্গে সঙ্গে চলে তুমুল আড্ডা। রাত গভীর হয়, কিন্তু আড্ডা যেন শেষ হয় না। (চলবে)

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com