প্যারিস থেকে জুরিখ…নয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

বৃষ্টিস্নাত বার্লিনে ঝটিকা সফর আর কবি দাউদ হায়দারের সান্নিধ্য

ঢাকায় প্যোল্যান্ডের দূতাবাস নেই। সঙ্গত কারণে ভিসা দেয়া হয় ঢাকাস্থ সুইডেন দূতাবাস থেকে। ২০১৩ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে একদিন প্যোলান্ডের ভিসার জন্য হাজির হলাম আমরা বেশ কয়েকজন। জীবনের প্রথম ইউরোপ যাবার স্বপ্ন হাতছানি দিচ্ছে চোখের সামনে। যদি ভিসা পাওয়া যায় তাহলে যাওয়া যাবে প্যোল্যান্ডের ওয়ারশ। যোগ দেয়া যাবে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে। আর যদি সেনজান ভিসা পাওয়া যায় তাহলে তো ঘুরে দেখার সুযোগ হবে আশপাশের কয়েকটি দেশ। ভিসার জন্য আবেদন করতে গিয়ে নিজের তো বটে, চৌদ্দ গোষ্ঠির বৃত্তান্ত দিতে হল। পূরণ করতে হলো দূতাবাসের ভিসা সেন্টারের নির্ধারিত বিশাল এক ফরম।

পাসপোর্ট জমা দেয়ার সময় ভিসা সেন্টারে দায়িত্বরত বাঙালি ভদ্র মহিলা নানা প্রশ্ন করলেন। জানতে চাইলেন কেন যাচ্ছি? যদি ভিসা দেয়া হয় তাহলে ফিরে আসবো কি না? বিভিন্ন প্রশ্নের মধ্যে তার এই প্রশ্নে আমি বিরক্ত হয়েছিলাম। জবাবে বলেছিলাম, আমার তো বিদেশ থাকার শখ নেই। এরপর আর প্রশ্ন না করে পাসপোর্ট রেখে দিয়ে তিনি এক সপ্তাহ পর সেটি নেয়ার তারিখ দিলেন।

ভিসার আবেদন জমার দিনে আমরা গ্রুপে একসঙ্গে গিয়েছিলাম আট জন। যাদের মধ্যে আমি ছাড়াও ছিলেন জনকণ্ঠের কাওসার রহমান ভাই, ভোরের কাগজের (বর্তমানে জার্মান প্রবাসী) মাহমুদ মনি, ইউএনবি’র মাসউদ উল হক, করতোয়ার (এখন দৈনিক বর্তমানে কর্মরত) মোতাহার হোসেন, ইত্তেফাকের (বর্তমানে চ্যানেল আইএ কর্মরত) রফিকুল বাসার, একাত্তর টিভির চট্টগ্রাম প্রতিনিধি আজাদ তালুকদার, সিলেটের আমিনুল ইসলাম রুকন। সবাইকে একই দিনে পাসপোর্ট ফেরত দেয়ার তারিখ দেয়া হল।

নির্ধারিত তারিখে গুলশানের সুইডিশ এ্যাম্বেসিতে গিয়ে সুখবরই পেলাম। পাসপোর্ট হাতে দেয়ার আগে ভদ্র মহিলা একটি ফরমে স্বাক্ষর নিলেন। যাতে লেখা ছিল যথা সময়ে দেশে ফিরে এসে তাদের কাছে রিপোর্ট করতে হবে। স্বাক্ষর নেয়ার সময় একটি ফরমও হাতে ধরিয়ে দেয়া হল। পাসপোর্ট ফেরত পেয়ে দেখলাম সেনজান ভিসাই দিয়েছে। ১৩ দিনের জন্য। অর্থাৎ ১৩ দিনের বেশি ইউরোপে থাকা যাবে না। যাক মন্দ না, প্রথম বারেই ইউরোপের ভিসা তো পাওয়া গেলো, তাও আবার সেনজান। ভিসা হাতে প্রথমেই আম্মাকে ফোনে জানালাম। শুনে ভীষণ খুশী হয়েছেন। তারপর আমার সকল কাজের প্রেরণা জীবনসঙ্গীকে। একে একে ভাই-বোনদের। সবাই বেশ উৎফুল্ল। আমি নিজেও।

বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কাভার করতে প্রথমবারের মত ইউরোপ যাত্রার সুযোগ হল। পরিকল্পনা নিয়ে রাখলাম ওয়ারশ সম্মেলন কাভার করার পাশাপাশি আশপাশের দেশগুলো যতোটাসম্ভব পারা যায় ঘুরে দেখবো। আগেই মানচিত্র দেখে পরিকল্পনা নিয়েছিলাম প্যোল্যান্ডের পাশের রাষ্ট্র হিটলারের দেশ জার্মানী ঘুরে দেখবো। কিন্তু জার্মানী তো আর ছোট দেশ না যে, চাইলেই স্বল্প সময়ে ঘুরে দেখা যাবে। তাই পরিকল্পনার মধ্যে বার্লিনকেই রাখলাম।

ওয়ারশ থেকে হাই স্পিড ট্রেনে করে বার্লিন যেতে সময় লাগে মাত্র ছয় ঘণ্টা। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় যাওয়ার জন্য যেদিন ট্রেনের টিকেট কাটলাম ওই দিনই কনফার্ম করলাম বার্লিনের ট্রেনের টিকেট। ৮ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ওয়ারশ’র প্রধান রেল স্টেশন থেকে বার্লিনের পথে যাত্রা করলাম। যথা সময়ে ট্রেন এসে হাজির। নির্ধারিত আসনে বসেই বুঝতে পারলাম ঝড়ের বেগে ছুটছে দ্রুতগতির ট্রেন।

এক সময় আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বের হয়ে ট্রেন ছুটছে সমান্তরাল রেল লাইন ধরে। রেল লাইনের দুই পাশে ওয়ারশ শহরের নানা স্থাপনা চোখে পড়ছে। ট্রেনের গতি শহরকে পিছনে ফেলে ছুটে চললো দ্রুত গতিতে। কখনও বিস্তৃীর্ণ মাঠের মাঝ দিয়ে, আবার কখনও ছোট ছোট টিলার ভিতর দিয়ে। রেল লাইনের পাশ দিয়েই কোথাও কোথাও দেখা মিলল মসৃণ সড়ক পথ। ইউরোপের সড়কপথ খুবই মসৃণ। সড়ক পথে বার্লিন থেকে প্যারিস, কিংবা প্যারিস থেকে ব্রাসেলস যেতে গিয়ে এমন চমৎকার রাস্তার অস্তিত্ব টের পেয়েছি। গাড়িতে চড়ে শত শত মাইল সড়ক পথ পাড়ি দিলেও এক বিন্দু টের পাইনি আমরা যে বাসে চড়ে অতিক্রম করছি শত শত মাইল সড়ক। যাক সেই গল্প আগামী পর্বে আরো বিস্তারিত করার সুযোগ হবে।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রেনের ভিতর থেকে জানালার কাচ ভেদ করে দেখার চেষ্টা করছি বাইরের প্রকৃতিকে। দুই পাশের নির্মল পরিবেশ, রেল লাইনের দুই পাশে অনেক দূরের ছোট ছোট গ্রাম, সবুজ ফসলের মাঠ, সবুজ গাছপালা,একাধিক নদী, আবার কোথাও দেখা মিলছে পরিপাটি করে সাজানো ছোট ছোট শহর। বাইরের নীল আকাশ। ট্রেনের গতির কাছে এসবকিছুই্ দ্রুত চোখের আড়াল হয়ে যাচ্ছে। এই আড়াল হওয়ার ফাঁকে ফাঁকেই চেষ্টা করেছি কিছু দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করার। ওয়ারশ থেকে বার্লিন ওসতবানহফ রেল স্টেশন পর্যন্ত প্রায় ছয় ঘণ্টা বিরতীহীন জার্নি। যদিও মধ্যে একবার তল্লাশির জন্য বিরতি। টানা জার্নির এই সময়টায় এক মুহুর্তের জন্য চোখের পলক পড়েনি। দুই চোখ খুলে মন ভরে ট্রেনের ভেতর থেকেই উপভোগ করছিলাম ইউরোপের সৌন্দর্য্য।

বার্লিন যেতে যেতে সমান্তরাল রেললাইনের পাশে অনেক সুন্দর ও চমৎকার রেল স্টেশনেরও দেখা মিলেছে। একটা সময় ট্রেন থামলো ফ্রাংকফোর্ট অর্ডার (ফ্রাংকফোর্ট বর্ডার) স্টেশনে। এখানেই জার্মান-প্যোল্যান্ড সীমান্ত। জার্মানী ঢোকার মুখে প্রত্যেক ট্রেন এখানে থামিয়ে তল্লাশি চালায় জার্মান পুলিশ। কোন অবৈধ অভিবাসী, কিংবা কোন সন্ত্রাসী-অপরাধী ট্রেনে করে জার্মানীতে ঢুকছে কি না- তা নিশ্চিত হতেই তল্লাশি চালানো হয় ট্রেনে।

ট্রেন থামতেই প্রতিটি কামরায় ঢুকে পড়লেন জার্মান পুলিশের সদস্যরা। দ্রুত তল্লাশি চালালেন। আমি যে কেবিনে বসে আছি সেখানে ঢুকেই পুলিশের এক সদস্য জার্মান ভাষায় প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। কিন্তু আমি রাম-শাম-যদু-মধু কচু কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এই অবস্থায় দীর্ঘদেহী সুদর্শন পুলিশ সদস্যকে ইংরেজিতে কথা বলতে অনুরোধ করলাম। কিন্তু তাতে কোন কাজ হল না। এক পর্যায়ে আমি জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেয়া আইডি কার্ডটি দেখিয়ে বললাম, আমি ওয়ারশতে সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছি। পেশায় জার্নলিস্ট। এখন তোদের দেশে (জার্মানী) বেড়াতে যাচ্ছি। আমি টুরি‌স্ট। অনেক চেষ্টার পর তাকে বুঝাতে পেরে স্বস্তি পেলাম। সে আমার পাসপোর্ট দেখলো। ইতিমধ্যে তার উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ডাক দিতেই তড়িগড়ি করে বেরিয়ে পড়লো। আমিও যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

এরই মধ্যে দেখলাম এক যুবককে  ট্রেন থেকে নামিয়ে পিছ মোড়া করে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। মনে হলো হয়তো অবৈধভাবে জার্মানীতে ঢুকার চেষ্টা করার কারণে পুলিশ তাকে আটক করেছে। তল্লাশি শেষ হলে প্রায় ২০ মিনিট পর ট্রেন আবারও যাত্রা শুরু করলো বার্লিনের উদ্দ্যেশে। ঢুকে পড়লাম জার্মানিতে। অপোক্ষা শুধু বার্লিন স্টেশনের। কখন আসবে সেই গন্তব্য সেই অপোক্ষায় থাকলাম।

প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পর প্রথমে জার্মান এবং পরে ইংরেজী ভাষায় ট্রেন থেকে ঘোষণা আসতে শুরু করলো, আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই বার্লিন ওসতবানহফ রেল স্টেশন পৌঁছবো। এ ঘোষণা শুনেই ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। বার্লিনে যখন ট্রেন পৌঁছেছে তখন স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে চারটা কি পাঁচটা। মনে হলো যেন সন্ধ্যা নেমে গেছে। বেশ ঠান্ডা আবহাওয়া। বার্লিন ওসতবানহফ রেল স্টেশনে নেমে প্রথমেই ফোন করলাম রউফ ভাইকে। যিনি বার্লিনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে কর্মরত।

ওয়ারশ থেকেই যোগযোগ করেছিলাম বার্লিনের বাংলাদেশ হাইকমিশনে নিযুক্ত আবদুর রউফ ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি ওই সময়ে সম্ভবত বার্লিনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ফাস্ট সেত্রক্রেটারি। ওয়ারশ থেকে যাবার আগেই তাকে ফোন করে সহযোগিতা চেয়েছিলাম। তিনিও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বার্লিন নেমে তাকে ফোন করতেই একটি এসএমএস বার্তায় দূতাবাসের ঠিকানা পাঠালেন। একই সঙ্গে জানিয়ে দিলেন ট্যাক্সি নিয়ে সরাসরি যেন দূতাবাসে চলে আসি। তিনি সেখানে অপেক্ষায় থাকবেন।

স্টেশন থেকে বের হয়ে একটি ট্যাক্সি ডাকলাম। ঠিকানা দেখাতেই গাড়িতে উঠতে অনুরোধ জানিয়ে হাতে থাকা লাগেজ নিজেই গাড়িতে উঠালেন। অচেনা-অজানা শহরে ট্যাক্সি এই রাস্তা, ওই রাস্তা পেরিয়ে ছুটে চললো বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্দেশ্যে। সন্ধ্যার দিকে পৌঁছে গেলাম দূতাবাসে। কিন্তু রউফ ভাই নেই। অন্যান্য কর্মকর্তারাও বাসায় যাবার প্রস্তুতি সেরেছেন। একজন বললেন, স্যার নেই। বাইরে গেছেন জরুরি কাজে। কখন আসবেন বলতে পারি না। নাও আসতে পারেন। কর্মর্তাদের একজনকে বললাম, রঊফ ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। একটু যোগাযোগ করলেই হবে। তখন একটি গেস্ট রুমে আমাকে বসিয়ে চা-নাস্তা দেয়া হল। এরই ফাঁকে রঊফ ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে এক কর্মকর্তা জানালেন, স্যার আসতেছেন। আপনি বসে চা খান।

চা পর্ব শেষ হতে না হতেই রঊফ বাই সামনে হাজির। ডেকে নিলেন নিজের রুমে। তারপর নানা গল্প। দেশের গল্প, এলাকার গল্প। রঊফ ভাইয়ের বাড়ি আমাদের মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। পরিচয় শেষে নানা গল্পের ফাঁকে ফাঁকে আরেকবার কফি ও নাস্তা হয়ে গেল। এরপর পরই তিনি আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন হাইকমিশনের দপ্তর থেকে। নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করেন। বিএমডব্লিউ সিডান কার। পাশে বসিয়ে গল্প করতে করতেই বললেন, আপনার যেহেতু সময় কম সে কারণে আমরা এখন কিছু ঘুরে দেখতে পারি। আমি সায় দিতেই রওয়ানা হয়ে গেলেন। কিন্তু বৃষ্টি কিছুটা বাধার সৃস্টি করলো। রউফ ভাই জানালেন, বার্লিনে গত দুই দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। আগামী দুই-তিন দিনও একই অবস্থা থাকবে।

বৃষ্টির মধ্যে প্রথমেই নিয়ে গেলেন বার্লিন গেট। তারপর ঐতিহাসিক বার্লিন প্রাচীর। যা কি না পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানীকে আলাদা করে রেখেছিল যুগের পর যুগ। ১৯৯০ সালেই এই প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলে দুই জার্মানি একিভূত হয়। ঐতিহাসিক বিবেচনায় সেই প্রাচীরের কিছু অংশ সংরক্ষণ করা হয়। আমাকে সেগুলো দেখালেন রউফ ভাই। হাতে থাকা ক্যামেরায় বন্দি করলাম কিছু স্মৃতি। সেখান থেকে বের হয়ে নিয়ে গেলেন আরও কয়েকটি দর্শনীয় স্থানে। যেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জার্মান পার্লামেন্ট। কিন্তু রাত হয়ে যাওয়ায় পার্লামেন্ট ভবনে ঢোকার সুযোগ হল না। রউফ ভাই জানালেন, পার্লামেন্ট ভবনের উপরের অংশ দর্শনার্থীদের জন্য উম্মুক্ত। এই ভবনে টপ ফোর থেকে বার্লিন শহরের সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়। তাই দর্শনার্থীদের জন্য ফোরটি উম্মুক্ত।

রাতে ঘুরাঘুরি শেষ করে রউফ ভাই আমাকে নিয়ে গেলেন তার নিজের ডেরায়। চমৎকার ডুপ্লেক্স বাড়ি। দু’তলার একটিতে আমার থাকার ব্যবস্থা করা হল। এরই মধ্যে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হতেই খাবারের ডাক। খাবার টেবিলে বসেই দেখলাম নানা পদের আয়োজন। ভাবী নিজ হাতে রান্না করেছেন। মাছ, মাংস, সব্জি, পোলাও কি নেই…। পরম যত্নে রান্না করা খাবারের সব পদের স্বাদ নিলাম। তারপর ঘুমে রাজ্যে। দিনভর জার্নি, ঘোরাঘুরি শেষে রাতে নির্ভেজাল ঘুম।

সকালে উঠে নাস্তা শেষ করে রউফ ভাইয়ের সঙ্গেই বের হয়ে গেলাম। প্রথমে হাইকমিশনে গেলাম। সেখান থেকে বের হয়ে জার্মানীতে নির্বাসিত কবি দাউদ হায়দারের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ কবিতার লেখক বাংলাদেশের এই কবি বহু বছর ধরে বার্লিনেই জীবন কাটাচ্ছেন।তার সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ আমার দীর্ঘ দিনের।  বার্লিনে গিয়ে সেই সুযোগটাকে কাজে লাগালাম।

তাই ওয়ারশতে থাকতেই তার ফোন নম্বর সংগ্রহ করেছিলাম জার্মান প্রবাসী সাংবাদিক সহকর্মী ছোট ভাই মারুফ মল্লিক এর কাছ থেকে। মারুফ দৈনিক মানবজমিনে আমার সহকর্মী ছিলেন। অত্যন্ত বিনয়ী, ভদ্র মারুফ লেখাপড়ার সূত্রে জামার্নীর বনে বসবাস করছেন কয়েক বছর হলো। ওয়ারশ’র জলবায়ু সম্মেলনে তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর দাউদ হায়দারের সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করলে আমাকে কবির মোবাইল নম্বর দিয়ে হেল্প করা এবং কবিকে আমার কথা বলে দিয়েছিলেন।

দাউদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে  নিজের পরিচয় দিয়ে তাকে ফোন করার পরই একটা ঠিকানা দিয়ে বললেন, আপনি চলে আসেন। দেখা হওয়ার পর প্রায় তিন ঘণ্টা এক সঙ্গে কাটিয়েছিলাম। নানান গল্প আর আড্ডায়।  উঠে এসেছিল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জঙ্গিবাদের উত্থান,দেশের নানা সংকটের কথা, উঠে এসেছিল তার দেশে না ফেরার কথাও। দুঃখ করে বললেন, বিভিন্ন সময়েও প্রতিশ্রুতি দিয়েও সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা কথা রাখেননি। দেশের প্রতি কঠিন মমত্ববোধ থাকা এই দেশের মাটির গন্ধ শুকতে একবার কলকাতায় এসে সীমান্ত পর্যন্ত এসেছিলেন। কফির পেয়ালায় চুমুক আর সিগারেট টানতে টানতে নির্বাসিত কবি দাউদ হায়দার কথার রাজ্যে ডুবে গিয়েছিলনে। বলছিলেন, তার শরীর বার্লিনে পড়ে থকলেও মন পড়ে আছে সব সময় দেশে। এক সময় আমাদের গল্প, আড্ডা শেষ হলে তাকে নিয়েই একটি ক্যামেরার মার্কেটে ঢু মেরেছিলাম। তার সহযোগিতায় সেখান থেকেই একটি ডিএসএলআর ক্যামেরা ক্রয় করে আরেক দফা কফি পান শেষে বিদায় নিলাম কবির কাছ থেকে। বৃষ্টি মধ্যে বিদায় জানাতে গিয়ে কবি বলছিলেন, ইউরোপের বৃষ্টি আর প্রেমিকার মন একই। এই দুই-ই যে কখন বিগড়ে যায় তা বোঝা মুশকিল।

কবির কাছ থেকে বিদায় নেয়ার মধ্য দিয়েই বার্লিনে বৃষ্টিস্নাত এক রাত আর এক দিনের ঝটিকা সফরের ইতি টেনে বাই বাই টা টা জানালাম হিটলারের দেশকে।

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com