প্যারিস থেকে জুরিখ…আট

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

একদিনের ভিয়েনা দর্শন…
ওয়ারশ থেকে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার দূরত্ত্ব এক রাতের ট্রেন জার্নি। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম এক দিনের জন্য আমরা চলে যাবো ভিয়েনা। দিনভর ঘুরে আবার রাতেই রওয়ানা হবো ওয়ারশোর উদ্দেশ্যে। যেমন সিদ্ধান্ত তেমন কাজ। ডা. ইকবাল কবীর ভাইয়ের নেতৃত্বে আমি, মাহমুদ মনি, আজাদ তালুকদার ট্রেনের টিকেট কাটলাম। খুব সম্ভবত জনপ্রতি ১১০ ইউরো করে টিভিজি ট্রেনের টিকেট কাটলাম যাত্রার একদিন আগে। প্রথমে আমরা চেষ্টা করেছিলাম বিমানে যাবার। কিন্তু আগে থেকে টিকেট না কাটলে ১৫-২০ ইউরোর বিমান ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে ১০০ ইউরোর উপরে চলে যায়। সঙ্গত কারণেই আমাদেরকে ট্রেনে করেই ভিয়েনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হয়েছে। যদিও ট্রেনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তাৎক্ষণিক টিকেট কাটলে দাম বেড়ে যায়। ট্রেন, বাস কিংবা বিমানের টিকেটের ক্ষেত্রে ইউরোপের সব দেশেই একই অবস্থা।
বিশ্ব জলবাযু সম্মেলন কাভার করতে গিয়ে শখের তালে ঘুরে বেড়ানোটা বেশ কঠিন কাজ। আমরা কাজের ফাঁকে ফাঁকে সেই কঠিন কাজটাই সহজ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ভিয়েনা গেলেও একদিনে বা মাত্র কয়েক ঘণ্টায় যে সব দেখা যাবে, বা ভিয়েনা জয় করে আসা যাবে তেমনটা আমরা ভাবিনি। আমাদের ভাবনায় ছিল শুধু ভিয়েনাতে পা রেখে যতটুকু উপভোগ করা যায়।
দিনের কাজ শেষ করে, বিশেষ করে জলবায়ু সম্মেলনের সর্বশেষ রিপোর্ট ঢাকায় পাঠিয়ে বিকেলেই আমরা বের হয়ে পড়লাম সম্মেলনকেন্দ্র থেকে। সোজা চলে গেলাম আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে। দুপুরের খাবার বিকেলে সাবাড় করে একটু বিশ্রাম, অতপর: ট্রেনের সময়সূচী মাথায় রেখে বের হলাম ওয়ারশোর প্রধান রেল স্টেশন সেন্ট্রালানা’র উদ্দেশ্যে। বাসার কাছেই মেট্রো স্টেশন। সেখান থেকে মেট্রোতে চড়ে কয়েক মিনিটেই পৌঁছে গেলাম প্রধান রেলস্টেশনে।
স্টেশন থেকে কিছু শুকনো খাবার সঙ্গে নিয়ে আমরা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেলাম। যে প¬্যাটর্ফমে ট্রেন এসে দাঁড়াবে সেখানেই দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করছি। মিনিট কয়েকের মধ্যেই একেবারে ঘড়ির কাঁটা ধরে নির্দিষ্ট সময়ে হাজির টিভিজি’র দ্রুত গতির ট্রেন। আমরা চার জন উঠে গেলাম ট্রেনের নির্দিষ্ট কামড়ায়। আমদের তিনজনের টিকেট এক কেবিনে এবং একজনেরটা অন্য কেবিনে। একটি কেবিনে ঢুকে আমি, মনি ও ডা. ইকবাল ভাই অনেকটা বোকা বনে গেলাম। এক টায়ারের কেবিন। মাত্র তিনটি আসন। রাতের জার্নি, ভীষণ কষ্ট হবে, কারণ বসে কাটাতে হবে পুরো ১০-১২ ঘণ্টা। এই নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছি। আর আজাদ তালুকদার চলে গেলেন ভিন্ন কেবিনে। তিনি ভালো আসন পেয়েছেন। তার কেবিনটি টু-টায়ারের। আমাদের পাশেই তার কেবিন। তিনি সেখান থেকে এসে আমাদের অবস্থা দেখে বেশ মজাই পেলেন। কারণ তাকে এই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। তিনি দিব্যি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যেতে পারবেন।
এই অবস্থায় আমরা যখন নাকাল, ঠিক তখনই ডা. ইকবাল ভাই আমাদের আসনের নিচে ট্রের মতো দেখতে একটি কাভার টান দিতেই বের হয়ে আসলো পুরো আসন। তিনি বললেন, ঘুমানোর ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এই আসন তো এভাবে করতে হবে। তারপর আমরাও আমাদের আসনের নিচের অংশ টান দিতেই পুরোটা খাটের মত হয়ে গেলো। অবশেষে আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে যাওয়ার একটা ব্যবস্থা হল। তারপর পরই আমরা সবাই মিলে তুমুল আড্ডায় মেতে উঠলাম। ট্রেন চলছে ক্ষিপ্র গতিতে আর আমরা মেতে উঠেছি আড্ডায়। ঘণ্টা দুই আড্ডার পর কিছুটা ঘুমিয়ে নিলাম সবাই। কারণ ভিয়েনা নেমেই দিনভর কাটাতে হবে ঘোরাঘুরির মধ্যে।
খুব ভোরে আমরা পৌঁছে গেলাম ভিয়েনার প্রধান রেল স্টেশনে। তখনও অন্ধকার। শীতের মধ্যে আমরা প্রথমে স্টেশনের একটি ফাস্টফুডের দোকানে বসে নাস্তা করলাম। সেখানেই দেখা এক বাঙালি তরুনীর সঙ্গে। তিনি স্টুডেন্ট। পড়ার ফাঁকে পার্টটাইম কাজ করেন রেল স্টেশনেই একটি ফাস্টফুডের দোকানে। বাড়ি চট্টগ্রামে। পরিচয় জানার পর আজাদ তালুকদার তার সঙ্গে বেশ গল্প জুড়ে দিলেন। আমরা নাস্তার করার পর বেশ কিছু সময় ওই ফাস্টফুডের দোকানেই বসে ছিলাম। এরই মধ্যে ভিয়েনা পুলিশের এক সদস্য এসে হাজির আমাদের সামনে। আমরা কারা? কি জন্য বসে আছি? কোথায় থেকে এসেছি? কেন এসেছি? এরকম অসংখ্য প্রশ্ন। অবশ্য এ নিয়ে তেমন কোন সমস্যা হয়নি। আমরা তাকে আশ্বস্ত করলাম যে, আমরা ওয়ারশো থেকে ভিয়েনা ঘুরতে এসেছি। আমাদের সবার সঙ্গেই জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেয়া আইডি কার্ড ছিলো। তাই এ যাত্রায় কোন সমস্যা হয়নি।
এরই মধ্যে আমরা রেল স্টেশনের এক দোকানির কাছ থেকে তথ্য নিয়ে বের হয়ে গেলাম শহরের দিকে। স্টেশন থেকেই মেট্রোতে করে সোজা চলে গেলাম ভিয়েনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে। যেখানটায় পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে। মেট্রো স্টেশন থেকে বের হয়ে শহরে উঠতেই প্রথমে দেখা বেশ কয়েকজন বাঙালির সঙ্গ।ে যারা ওই শহরের মেট্রো’র মুখে পত্রিকা স্ট্যান্ডে ম্যাগাজিন ও স্থানীয় পত্রিকা বিক্রি করছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে আমরা নিজেদের মত করে ঘুরতে শুরু করলাম। একই সঙ্গে হাতে থাকা ক্যামেরাও সক্রিয়।
ভিয়েনা শহরের প্রাণকেন্দ্রেই রয়েছে একাধিক ট্যুর প্রতিষ্ঠান। যারা ট্যুরিস্ট বাসে করে শহরের পর্যটন স্পটগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখায়। আমরা একটি ট্যুর কোম্পানির গাড়িতে করে শহর আর দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে উঠে পড়লাম তাদের দোতলা ট্যুরিস্ট বাসে। আমাদের হাতে যেহেতু সময় স্বল্পতা তাই এর চেয়ে ভালো আর কোন পথ খোলা ছিল না। ভিয়েনা শহরটি ‘দানউব’ নদীর তীরে অবস্থিত। অপূর্ব সুন্দর এক শহর। সাজানো-গোছানো। দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। কোন রকম যানজট নেই। নেই কোন রকম শব্দ দূষণ। গাড়ির হর্ণ শোনা যাবে না সাধনা করেও।
শহর জুড়ে আছে নানান স্থাপত্যশৈলী। আছে বেশ কিছু মিউজিয়াম। ট্যুরিস্ট বাসে করে ঘুরতে গিয়েই দেখা মিলে এসব মিউজিয়ামের। বাস থেকে নেমে ছবি তোলা কিংবা মিউজিয়াম ঘুরে দেখা শেষে আবারো সেই কোম্পানির অন্য বাসে করে ভিন্ন জায়গায় যাওয়া। আমাদের হাতে যেহেতু সময় কম, তাই আমরা মিউজিয়ামের ভিতে ঢুকে ভিয়েনার ইতিহাস, ঐতিহ্য দেখার বা জানার সুযোগ হয়নি। তবে মিউজিয়ামের সামনে ছবি তুলতে কোন রকম কার্পণ্য ছিলো না আমাদের।
সবেচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে শহরের বুক চিরে যাওয়া দানউব নদী। শহরকে দুই ভাগ করেছে। নদীর দুই পাশ দেখে যে কেউ মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। আমাদের বুড়িগঙ্গা দখলে-দূষণে নিঃশেষ হলেও ভিয়েনার এই দানউব নদীটি যেন শহরের প্রাণ। এই নদীতে থাকা ছোট ছোট জাহাজ, স্পিডবোট পর্যটকদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। সুন্দর মনোরম আর মন ভালো করে দেওয়ার মত এক নির্মল পরিবেশ পুরো শহর জুড়ে।
শেষ বিকেলে আমরা ট্যুরিস্ট বাস ছেড়ে শহরের প্রাণকেন্দ্রে আসতেই আগে থেকে অপেক্ষামনা সঙ্গী মাহমুদ মনির বান্ধবী মিলিকা। সার্বিয়ার নাগরিক। ভিয়েনা শহরেই তার বাস। তিনি আমাদেরকে নিয়ে শহরের বেশ কয়েকটি মিউজিয়াম ঘুরে দেখালেন। সবগুলো মিউজিয়ামই একটির গায়ের সঙ্গে আরেকটি লাগানো। ফলে ঘণ্টা দুইয়ের মধ্যেই আমরা মিউজিয়ামগুলোর বাইরের সৌন্দর্য্য উপভোগ করলাম। একটি মিউজিয়ামের সামনে যাওয়ার পর তো একেবারেই মুগ্ধ আমরা। অপূর্ব সুন্দর ফুলের বাগান। নানান প্রজাতির ফুলের গাছে সয়লাব পুরো বাগান।
মিজিয়াম দর্শন শেষে আমরা শহরের প্রধান সড়কে কাটিয়েছি সুর আর সঙ্গীতের সঙ্গ। পর্যটকদের নানাভাবে আকৃষ্ট করে এই শহরের সড়কের মাঝ বরাবর থাকা বেঞ্চ গুলোতে বসে স্প্যানিশ বা জার্মান ভাষায় গীটারের তালে তালে গান শুনাচ্ছেন কত শিল্পী। অবশ্য এটা তাদের ব্যবসা। গান শুনে কেউ যদি তাদেরকে দু’চার ইউরো দেয়।
আমাদের ফেরার ট্রেনের সময় তখনও ঢের বাকি। মাত্র সন্ধ্যে পাঁচটা। হাতে এখনো প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময়। রাত সাড়ে ১০টায় ওয়ারশো ফেরার ট্রেন। তাই এই সময়টাকে নষ্ট না করে আমরা ঢুকে পড়লাম শহরের একটি ক্যাসিনোতে। যেখানে মুহুর্তের মধ্যেই হাজার হাজার ইউরো হাওয়ায় উড়ে যায়। আমাদের কারোরই ক্যাসিনোতে খেলার অভিজ্ঞতা নেই। তারপরও চারজন মিলে টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকে খেলা শুরু করলাম। কেউ না পারলেও বাজি মাত করলেন আজাদ তালুকদার। তিনি জিতলেন একটি খেলায়। তারপর আমরা বেড়িয়ে পড়লাম।

এবারে স্টেশনের পথে মেট্রো ধরলাম। আমরা সকালে যে টিকেট কেটেছিলাম সেই টিকেটেই মেট্রোতে চড়লাম। স্টেশনে এসে মাথায় ঢুকলো ‘ট্যাঙ্গো নৃত্য’ দেখার বিষয়টি। কিন্তু উপায় নাই। আমাদের কেউ তো আর এই শহর চিনি না। তাই এই আগ্রহটাকে কিছুটা চাপা দিয়েই স্টেশনে আড্ডা মারছিলাম ট্রেনের অপেক্ষায়। এরই মধ্যে আমাদের আড্ডার টেবিলের পাশেই এক ভদ্রমহিলা এসে বসলেন। ইকবাল ভাই তার সঙ্গে কথা বললেন, আমাদের আগ্রহের কথা জানালেন। সঙ্গে সঙ্গেই ওই ভদ্রমহিলা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। জানালেন, তিনি নিজে একজন নৃত্য শিল্পী। অধ্যাপনার সঙ্গে জড়িত। বললেন, আমার সঙ্গে আসুন। আমরা তাকে অনুসরণ করলাম। মিনিট দশেকের মধ্যে তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন স্টেশনের বাইরে একটি হলে। সেখানে গিয়ে আমরা একেবারে মুগ্ধ। তিনি আমাদের সবাইকে তার অতিথি পরিচয় দিয়ে হলের ভিতর ঢুকালেন, আতিথেয়তা করলেন ককটেল অর্ডারের মধ্য দিয়ে। তারপর ককটেল পানের সঙ্গে সঙ্গে চললো আমাদের ‘ট্যাঙ্গো নৃত্য’ দর্শন। পূর্ণ হলো আমাদের আশা। এরই মধ্যে আমাদের ট্রেনের সময় হয়ে যাওয়ায় আমরা বিদায় নিলাম ভদ্রমহিলার কাছ থেকে। শেষ হল আমাদের ভিয়েনা দর্শন।

ছবি:লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন amar@pranerbangla.com